ধর্ষণে অন্তঃসত্ত্বা শিশু
ডাক্তারের প্রশ্ন—তোমার সঙ্গে এ কাজ কে করেছে? মেয়েটি বলে ‘হুজুর হুজুর’
নেত্রকোনায় এক শিশু শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে মাদরাসাশিক্ষকের বিরুদ্ধে। বর্তমানে শিশুটি সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। এ ঘটনায় ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা করেছে ভুক্তভোগীর পরিবার।
চিকিৎসক জানিয়েছেন, বর্তমানে শিশুটির শারীরিক অবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ। তার শারীরিক অবস্থা নরমাল ডেলিভারির উপযুক্ত নয়। সিজারিয়ান অপারেশনও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) ভুক্তভোগীর পরিবার ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে মদন থানায় মামলা করে। ঘটনা জানাজানির পর থেকে অভিযুক্ত মাদরাসাশিক্ষক পলাতক।
মামলার এজাহার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জেলার মদন উপজেলার মহিলা কওমি মাদরাসার পরিচালক ও শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগর ২০২২ সালে ওই এলাকায় মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি মাদরাসায় শিক্ষকতার পাশাপাশি মসজিদে ইমামতিও করেন। তার স্ত্রী মাদরাসাটির প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত।
ভুক্তভোগী শিশুটি একই এলাকার বাসিন্দা ও স্বামী পরিত্যক্তা নারীর একমাত্র সন্তান। জীবিকার তাগিদে শিশুটির মা সিলেটে গৃহপরিচারিকার কাজ করেন। শিশুটি তার নানির কাছে থেকে ওই মাদরাসায় লেখাপড়া করতো।
গত নভেম্বরে কয়েক দফা শিশুটিকে ধর্ষণ করেন অভিযুক্ত সাগর। ঘটনা কাউকে জানালে প্রাণনাশের ভয় দেখান। পরে শিশুটির শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটলে তার মা সিলেট থেকে এসে ধর্ষণের বিষয়টি জানতে পারেন। পরে স্থানীয় একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা করে অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হন।
শিশুটির স্বাস্থ্যগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন ডা. সায়মা আক্তার। তিনি বলেন, ‘শিশুটি মায়ের সঙ্গে ক্লিনিকে আসে। জানায়, তার পেট ভার ভার লাগে। কী যেন হঠাৎ করে নড়াচড়া করে। পরে পরীক্ষা করে দেখতে পাই, বাচ্চাটি প্রায় সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। শিশুটিকে যখন বারবার জিজ্ঞাসা করি, ‘মা, তোমার সঙ্গে এ কাজ কে করেছে?’ তখন তার চোখেমুখে ভয়ের ছাপ। শুধু বলে, ‘হুজুর, হুজুর এই কাজ করেছে’।
ওই চিকিৎসক জানান, ১১ বছর বয়সী মেয়েটির উচ্চতা সাড়ে চার ফুটের কম। ওজন মাত্র ২৯ কেজি। গর্ভস্থ ভ্রূণের বাইপ্যারাইটাল ডায়ামিটার (মাথার আকার) ৭৪ মিলিমিটার, যা শিশুটির পেলভিসের তুলনায় অনেক বড়। অর্থাৎ শিশুটির সরু কোমরের তুলনায় গর্ভস্থ বাচ্চার মাথার মাপ অনেক বেশি। এটি বড় ধরনের শারীরিক ঝুঁকি তৈরি করে।
তিনি আরও বলেন, ‘রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা মাত্র ৮ দশমিক ২। সরু পেলভিসের ভেতর দিয়ে বড় মাথার বাচ্চা প্রসব করা স্বাভাবিকভাবে সম্ভব নয়, যা মা ও বাচ্চা উভয়ের জন্যই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এই ছোট বাচ্চার শরীরে সিজারিয়ান সেকশনের জন্য প্রয়োজনীয় অ্যানেসথেসিয়া বা ওষুধের ডোজ নির্ধারণ করা চিকিৎসকদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।’
সোমবার (৪ মে) দুপুরে শিশুটির মা জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাকে আমার স্বামী ছেড়ে চলে গেছে। ছোট তিন ছেলে ও এক মেয়ে লইয়া খুব কষ্ট করি। জীবিকার তাগিদে সিলেটে মানুষের বাসায় কাম করি। মেয়েডারে আমার বাপের বাড়িতে রাইখ্যা কষ্ট কইরা মাদরাসায় লেখাপড়া করাতে দিছিলাম। কিন্তু হুজুর আমার এই শিশু বাচ্চাটার সঙ্গে এমন পিশাচের মতো কাজ করতে পারলো! আমি কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবছিলাম না। এই ঘটনায় আমি তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
এ বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত শিক্ষকের মোবাইলফোনে একাধিকবার কল করা হলে সংযোগ বন্ধ পাওয়া যায়। বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৮ এপ্রিল ঘটনা প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে আমান উল্লাহ স্ত্রী-সন্তানসহ বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন।
ওই মাদরাসার প্রতিষ্ঠাকালীন উদ্যোক্তা ও শিক্ষক ছোটন মিয়া বলেন, ‘ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পর থেকে অভিযুক্ত স্ত্রী-সন্তান পলাতক। এমনকি আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগও করছেন না।
এ বিষয়ে মদন থানার ওসি তরিকুল ইসলাম বলেন, একমাত্র আসামি আমান উল্লাহ সাগরকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। শিশুটির খোঁজখবর রাখা হচ্ছে।
এইচ এম কামাল/এসআর