জুনে আসছে হাঁড়িভাঙ্গা আম, ২০০ কোটি টাকারও বেশি বাণিজ্যের হাতছানি

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক রংপুর
প্রকাশিত: ০৯:২৮ পিএম, ০৪ মে ২০২৬

রংপুরের ঐতিহ্য আর আভিজাত্যের প্রতীক হাঁড়িভাঙ্গা আম। যার সুনাম ছড়িয়েছে বিদেশেও। স্বাদ-গন্ধে অতুলনীয় এই আমের জন্য অপেক্ষা আর মাত্র দেড়মাস।

আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি মৌসুমে এই আমকে কেন্দ্র করে রংপুর অঞ্চলে ২০০ কোটি টাকার বেশি বাণিজ্যের সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর জেলায় দুই হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে হাঁড়িভাঙ্গা আমের চাষ হয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহের বৃষ্টি আম বড় হতে ও রসালো হতে সাহায্য করেছে। যদিও মাঝখানে কিছু এলাকায় শিলাবৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ায় সামান্য ক্ষতি হয়েছে, তবে সার্বিকভাবে ফলন গত বছরের চেয়ে ভালো হওয়ার আশা করা হচ্ছে।

কৃষি বিভাগ ও আমচাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাধারণত জুন মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে পরিপক্ব হাঁড়িভাঙা আম বাজারে মিলবে। এর আগে বাজারে হাঁড়িভাঙা আম পাওয়া গেলেও তা অপরিপক্ব থাকে। একটু বেশি দামের আশায় একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী নিয়ম ভঙ্গ করে বাজারে অপরিপক্ব হাঁড়িভাঙা আম বিক্রি করেন।

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাঁড়িভাঙা আম এক বছর কম ফলন দেয়, পরের বছর আবার ভালো ফলন দেয়। যে বছর কম ফলন হয়, সেই বছরকে বলা হয় অফ ইয়ার। যে বছর ভালো ফলন দেয়, সেই বছরকে কৃষিবিদদের ভাষায় বলা হয়ে থাকে অন ইয়ার। এবার হাঁড়িভাঙা আমের অন ইয়ার। এবার গাছে প্রচুর আম ধরেছে, যা গত বছরের চেয়ে অনেক বেশি।

কৃষি অফিসের তথ্য মতে, এবার ডিসেম্বরের প্রথম দিক থেকেই গাছে আমের মুকুল আসতে শুরু করে। জুনের মাঝামাঝি সময়ে গাছ থেকে আম পাড়া হয়। কৃষি বিভাগ আশা করছে, এবার ঠিক সময়ে গাছ থেকে আম পাড়া শুরু হবে।

রংপুর জেলায় এবার আম আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে ২০০০ হেক্টরের বেশি জমিতে হাঁড়িভাঙ্গা আমের চাষ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে হাড়িভাঙ্গা প্রায় ১০-১২ মেট্রিক টন ফলন হয়। যার মূল্য ২০০ কোটি টাকার বেশি।

মিঠাপুকুরের পদাগঞ্জ এলাকার আমচাষি নাজমুল ইসলাম বলেন, ঝড়ো হাওয়ার কারণে আমের কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। সামনে আরও ঝড় হলে লোকসান গুনতে হবে।

জুনে আসছে হাঁড়িভাঙ্গা আম, ২০০ কোটির বেশি বাণিজ্যের হাতছানি

রংপুরের হাঁড়িভাঙা আমের প্রধান বাজার মিঠাপুকুরের খোড়াগাছ ইউনিয়নের পদাগঞ্জ হাট। এটি পাইকারি বাজার।

পদাগঞ্জের তরুণ উদ্যোক্তা ও আমচাষি নাজমুল ইসলাম জাগো নিউজকে জানান, তিনি ১২ একরের বেশি জমিতে আমের চাষ করেছেন। গত কয়েকদিন আগে শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ে বাগানের কিছু ক্ষতি হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার ফলন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

স্থানীয় পাইকারি ব্যবসায়ী আব্দুল মালেক বলেন, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অনেক বড় বড় পার্টি ইতোমধ্যেই যোগাযোগ শুরু করেছেন। আশা করছি, এবার আমের দাম ও চাহিদা দুটোই সন্তোষজনক হবে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক- সুজন’র রংপুর জেলার সভাপতি অধ্যক্ষ ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, হাঁড়িভাঙ্গা আম এখন আর কেবল দেশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। মালয়েশিয়া , সিঙ্গাপুরসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এই আম রপ্তানি করা হয়। দেশের ভেতরে ফেসবুক ও ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সরাসরি বাগান থেকে আম সরবরাহের হার গত কয়েক বছরে কয়েক গুণ বেড়েছে। ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকে এই আমের ব্র্যান্ড ভ্যালুও বেড়েছে, যা ভালো দাম নিশ্চিতে ভূমিকা রাখছে।

বেঞ্জু আরও বলেন, বিশাল এই বাণিজ্যের সম্ভাবনা থাকলেও হিমাগার বা আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাব নিয়ে চাষিদের কিছুটা দুশ্চিন্তা রয়েছে। হাঁড়িভাঙ্গা আম দ্রুত পচনশীল হওয়ায় এটি পরিবহনে বিশেষ ট্রেন বা দ্রুতগামী যানবাহনের ব্যবস্থা করা উচিত।

রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, এবার আমের অন ইয়ার। প্রচুর আম ধরেছে। কৃষি বিভাগ থেকে চাষিদের পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করা হচ্ছে।

হাঁড়িভাঙা আমের বৈশিষ্ট্য হলো এটি আঁশবিহীন, মিষ্টি ও সুস্বাদু। এই আমের আঁটিও খুব ছোট। ছাল পাতলা। প্রতিটি আমের ওজন হয় ২০০-৩০০ গ্রাম।

২০২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি হাঁড়িভাঙা আম রংপুরের ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে।

জিতু কবীর/এমএন/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।