যে উপজেলায় এখনও পৌঁছায়নি চার চাকার যান
চারপাশে অথৈ জলরাশি, মাঝখানে জেগে থাকা জনপদ যেন এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। প্রশাসনিকভাবে উপজেলা সদরের মর্যাদা পেলেও আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার মাপকাঠিতে নেত্রকোনার খালিয়াজুরি আজও পিছিয়ে। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও ধনু নদের রসুলপুর ঘাটে একটি সেতুর অভাবে থমকে আছে এ অঞ্চলের ১ লাখ ২১ হাজার মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন।
জানা গেছে, জেলা শহর থেকে মাত্র ৫৫ কিলোমিটার দূরত্বের এই জনপদে আজও পৌঁছায়নি চার চাকার যানবাহন। নাগরিক জীবনের ন্যূনতম সুবিধা—শিক্ষা, স্বাস্থ্য কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্য; সবকিছুই এখন আটকে আছে ধনু নদের খেয়া নৌকায়।

সেতুর অভাবে খালিয়াজুরীতে লাখো মানুষের দুর্ভোগ/ ছবি: জাগো নিউজ
স্থানীয়রা জানান, ধনু নদের ওপর একটি সেতু নির্মাণ হলে উপজেলার অর্থনৈতিক চিত্র বদলে যাবে। পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য খাতেও লাগবে উন্নয়নের ছোঁয়া।
‘স্বাধীনতার পর দেশে এত উন্নয়ন হলেও এই হাওর এলাকার মানুষের ভাগ্য তেমন পরিবর্তন হলো না। এই নদের ওপরে একটি সেতু হলে সব কিছুই সহজ হবে’
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ১৮৯৬ সালে খালিয়াজুরি পুলিশ ফাঁড়িটি ১৯০৬ সালে থানায় রূপান্তর করা হয়। পরে ১৯৮৩ সালে ২৮ ডিসেম্বর উপজেলায় উন্নীত করা হয়। বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার। ২৯৭ দশমিক ৬৪ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের ওই উপজেলায় সরাসরি যোগাযোগের এখন পর্যন্ত কোনো পাকা বা কাঁচা সড়ক নেই। তবে কিছু কিছু স্থানে হাওরের মধ্য দিয়ে প্রায় ৫২ কিলোমিটারের মতো ডুবন্ত পাকা সড়ক রয়েছে।
আরও পড়ুন:
এক সময়ের খরস্রোতা নদী এখন সরু নালা
এবারও কি কপাল পুড়বে হাওরের কৃষকের?
কালনী-কুশিয়ারার পেটে যাচ্ছে শত বছরের জনপদ
তাঁত শিল্পে ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ বিদ্যুৎ বিভ্রাট
নেত্রকোনা সদর থেকে খালিয়াজুরি সদরের দূরত্ব প্রায় ৫৫ কিলোমিটার। উপজেলাটি ছয়টি ইউনিয়ন, ৬৮টি গ্রাম, ৭৪টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, চারটি ব্যাংক, ছয়টি বড় বাজার, স্কুল-কলেজ-মাদরাসাসহ ৭৩ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। শিক্ষার হার ৩৪ দশমিক ৫০। জেলায় ছোট বড় ১৩৪টি হাওরের মধ্যে খালিয়াজুরিতে ৮৯টি হাওর রয়েছে। তাই বছরের প্রায় ছয় মাস পানিতে নিমজ্জিত থাকে উপজেলাটি। আর বাকি ছয় মাস চলতে হয় সড়কপথে। জেলা শহর থেকে মদন উপজেলা পাড়ি দিয়ে যেতে হয় সেখানে।
এছাড়া মদনের উচিতপুর থেকে খালিয়াজুরি সদর পর্যন্ত ১৭ কিলোমিটার সাবমারসিবল (ডুবন্ত) সড়ক আছে। শুষ্ক মৌসুমে এ সড়ক দিয়ে সব ধরনের যানবাহনে যাতায়াত করা যায়। কিন্তু খালিয়াজুরি উপজেলা পরিষদ থেকে তিন কিলোমিটার আগে রসুলপুর এলাকায় ধনু নদে কোন সেতু না থাকায় তা পাড়ি দিতে হয় খেয়ানৌকা দিয়ে। আর এ-কারণে খালিয়াজুরি সদরে যানবাহন পৌঁছায় না। এই আধুনিক যুগেও উপজেলা সদরে এখন পর্যন্ত চার চাকার কোনো গাড়ি চলাচল করা সম্ভব হয়নি। শুধু একটি সেতুর অভাবে জেলা সদরের সঙ্গে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে উপজেলাটি। আর অনেকটা প্রশস্ত ধনু নদে খেয়া পাড়ি দিতে গিয়ে যাত্রীদের ব্যয় করতে হচ্ছে দীর্ঘ সময়।
‘ধনু নদের রসুলপুর ঘাটে সেতু না থাকায় শুকনো মৌসুমেও গাড়ি নিয়ে উপজেলা সদরে প্রবেশ করা যায় না। সেতুর জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রস্তাব দেওয়া আছে। এটি হলে এ অঞ্চলে পর্যটন শিল্পেরও বিকাশ ঘটবে’
সরেজমিনে দেখা গেছে, রসুলপুর ঘাটের দুই দিকের ডুবন্ত সড়ক পাকা করা। জেলা পরিষদের তত্ত্বাবধানে ইজারাদারের ব্যবস্থাপনায় চালু খেয়া নৌকাও বেশ ছোট। সবসময় ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী ও মালামাল পরিবহন করা হয়। ফলে নিতে হয় জীবনের ঝুঁকি। এছাড়া খেয়া পাড়ি দিয়ে নদ পাড়ে উঠতে গিয়ে বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়।
স্থানীয়রা জানান, বর্ষায় এই দুর্ভোগ আরও বাড়ে। এখানকার কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য ও ব্যবসায়ীদের নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী আনা-নেওয়ার জন্য সময় ও অর্থ দুটোই বেশি লাগে।
আরও পড়ুন:
বজ্রপাতে মৃত্যু বাড়ছেই, আলোর মুখ দেখে না প্রতিরোধে নেওয়া উদ্যোগ
বৃষ্টি-কৃষকের চোখের জলে একাকার হাওরের ধানের জমি
ধান হারিয়ে হাওরজুড়ে কৃষকের বোবাকান্না
জগন্নাথপুর গ্রামের ৮৭ বছরের বৃদ্ধ জলিল মিয়া বলেন, স্বাধীনতার পর দেশে এত উন্নয়ন হলেও এই এলাকার মানুষের ভাগ্য তেমন পরিবর্তন হলো না। এই নদের ওপরে একটি সেতু হলে সব কিছুই সহজ হবে।
জগন্নাথপুরের রোমন মিয়া, ওয়াসিম মিয়া ও রসুলপুরের হাসেম আলীসহ কয়েকজন বাসিন্দা জানান, নদের ওপর একটি সেতুর জন্য বিভিন্ন সময় আবেদন নিবেদন করা হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও সেতু হয়নি।

নেত্রকোনার ধনু নদ/ ছবি: জাগো নিউজ
খালিয়াজুরি সদরের পুরানহাটি এলাকার শামসুল হক ও মহসিন মিয়া বলেন, উপজেলা সদরে কোন যানবাহন না আসায় আমরা সব দিক থেকে পিছিয়ে আছি। ইউনিয়নগুলো থেকে কেউ চাইলেই রাতে উপজেলা সদরে আসতে পারে না। মুমূর্ষু রোগীদের পরিবহনের কোনো ব্যবস্থা নেই। দূরের শিক্ষার্থীরা সদরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এসে নিয়মিত ক্লাস করতে পারে না। কৃষিপণ্য ছাড়াও ব্যবসা-বাণিজ্যের বিভিন্ন মালামাল বহন করতে হয় শ্রমিক দিয়ে।
নেত্রকোনা সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদ আল নূর সালেহীন বলেন, ‘ধনু নদ বেশ প্রশস্ত। রসুলপুর ঘাটে সেতু করতে হলে ৪০০ মিটার দৈর্ঘ্য প্রয়োজন হবে। উচ্চতাও অনেকটা লাগবে কারণ নদে সারা বছর বাল্কহেড, লঞ্চ, স্টিমারসহ বড় নৌকা চলাচল করে। সেতু নির্মাণে জন্য আমরা হাইড্রোমারফলজি জরিপসহ প্রাথমিক পর্যায়ের কিছু কাজও করছি।
নেত্রকোনার জেলা প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা (জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের উপসচিব) মো. আরিফুল ইসলাম সর্দার বলেন, ধনু নদের রসুলপুর ঘাটে সেতু না থাকায় শুকনো মৌসুমেও প্রশাসনিক কার্যক্রমের জন্য গাড়ি নিয়ে উপজেলা সদরে প্রবেশ করা যায় না। সেতুটির জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রস্তাব দেওয়া আছে। এটি হলে এ অঞ্চলে পর্যটন শিল্পেরও বিকাশ ঘটবে।
এনএইচআর/এএইচ/জেআইএম