দর্শনা সীমান্তে শক্তিশালী সিন্ডিকেট: সোনা যায় মাদক আসে

হুসাইন মালিক
হুসাইন মালিক হুসাইন মালিক চুয়াডাঙ্গা
প্রকাশিত: ০১:২৫ পিএম, ০৯ মে ২০২৬
চোরাচালান সিন্ডিকেট নেটওয়ার্কের অন্যতম সমন্বয়ক হিসেবে বারবার উঠে আসছে সামাদের নাম। ফাইল ছবি
  • নেটওয়ার্কের সমন্বয়ক হিসেবে এসেছে সামাদের নাম
  • রাত হলেই সীমান্তে রমরমা হয় চোরাচালান
  • বাহক আটক হলেও অধরা সিন্ডিকেট প্রধান

চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সীমান্ত। সোনা ও মাদক চোরাচালানের যেন এক নিরাপদ স্থান। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান ও নজরদারির মধ্যেও কৌশল পাল্টে বরাবরই সক্রিয় চোরাচালান সিন্ডিকেট। স্থানীয়দের দাবি এপার থেকে সোনা যায় ভারতে, আর বিপরীতে আসে মাদক। প্রতিটি চালানে মোটা অঙ্কের কমিশন পাচ্ছে সিন্ডিকেট সদস্যরা। ফলে কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না এ চক্রকে।

স্থানীয় সূত্র ও বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তে অভিযোগ উঠেছে, এই নেটওয়ার্কের অন্যতম সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করছেন সামাদ (৩৫) নামের এক ব্যক্তি। তবে এখনো তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধরাছোঁয়ার বাইরে।

আরও পড়ুন-
চোরাকারবারির সঙ্গে এসআইয়ের দর কষাকষির অডিও ভাইরাল
বেনাপোল কাস্টমসে শুল্ক ফাঁকি: ৪ সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট লাইসেন্স স্থগিত
কাঁটাতার ও সড়কের অভাবে সীমান্তে বেপরোয়া চোরাচালানিরা

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দর্শনা উপজেলার পারকৃষ্ণপুর-মদনা ইউনিয়নের কামারপাড়া গ্রামের কিতাব আলীর ছেলে সামাদ দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তপথে সোনা পাচার ও হুন্ডি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। তার নেতৃত্বাধীন চক্রের বিরুদ্ধে ভারত থেকে ফেনসিডিল, ইয়াবা ও হেরোইনসহ বিভিন্ন মাদক দেশে আনার অভিযোগও রয়েছে।

‘চোরাকারবারিরা প্রতিনিয়ত নতুন কৌশল ব্যবহার করছে। তবে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’

বিভিন্ন মাধ্যম ছড়িয়ে পড়া অডিও এবং ভিডিও রেকর্ডিংয়ে সামাদকে সোনা পাচারের বিষয়ে কথা বলতে শোনা গেছে। কয়েকটি রেকর্ডিংয়ে তিনি সীমান্ত দিয়ে অবৈধ যাতায়াত, সিন্ডিকেট পরিচালনা এবং আটক হওয়া কিছু সোনা চালানের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত দিয়েছেন বলেও দাবি করা হচ্ছে। একটি অডিওতে তার কাছে অস্ত্র থাকার বিষয়ও উঠে এসেছে।

এছাড়া একটি ভিডিওতে রাতের আঁধারে সীমান্তের কাঁটাতারের ওপারে অবস্থান করে ভিডিও ধারণের দৃশ্য দেখা যায়। সেখানে ভারতীয় সীমান্ত এলাকা দেখানোর কথাও শোনা যায়। অন্য একটি ভিডিওতে তাকে ধারালো দেশীয় অস্ত্র প্রদর্শন করতে দেখা গেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে দর্শনা সীমান্তে একাধিক অভিযানে সোনাসহ কয়েকজন আটক হলেও অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা সামাদকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।

আরও পড়ুন-
ভৈরবে পুলিশ-চোরাকারবারি মাসোহারায় খালাস হয় অবৈধ ভারতীয় পণ্য
মেয়ের বিয়ের জন্য আনা প্রবাসীর ৮ ভরি স্বর্ণালংকার পথেই ছিনতাই
লক্ষ্মীপুরে স্মার্টকার্ড পেলেন সোনা ব্যবসায়ীরা
সকালে পতন সন্ধ্যায় উত্থান, দিন শেষে কত হলো সোনার দাম

২০২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর কামারপাড়া সীমান্তে তিনটি সোনার বারসহ এক নারী আটক হন। চলতি বছরের ১১ এপ্রিল হৈবতপুর এলাকায় চারটি বারসহ এক ব্যক্তি গ্রেফতার হন। একই বছরের ১৩ এপ্রিল দর্শনা পুরাতন রেলস্টেশন এলাকা থেকে ১০টি বারসহ আরও একজনকে আটক করা হয়। সংশ্লিষ্ট অডিও-ভিডিও বার্তায় এসব চালানের সঙ্গে নিজের সংশ্লিষ্টতার দাবি করেছেন সামাদ।

‘সামাদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে অডিও ও ভিডিওসহ কিছু তথ্য আমাদের হাতে এসেছে। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত শেষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, দর্শনা সীমান্ত এখন সোনা পাচারের গুরুত্বপূর্ণ রুটে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে সোনা ভারতে পাচার করা হয়, আর বিপরীতে দেশে প্রবেশ করে মাদক। প্রতিটি চালানে মোটা অঙ্কের কমিশন পাচ্ছে সিন্ডিকেট সদস্যরা। নগদ অর্থের পরিবর্তে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন হওয়ায় তাদের শনাক্ত করা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।

দর্শনা সীমান্তে শক্তিশালী সিন্ডিকেট: সোনা যায় মাদক আসে

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন জানান, কামারপাড়া এলাকায় রাত হলেই অপরিচিত ব্যক্তিদের চলাচল বেড়ে যায়। মাদকের বিস্তারে কিশোর ও তরুণদের মধ্যে উদ্বেগজনক প্রভাব পড়ছে। তবে আতঙ্কের কারণে অনেকে প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না।

গত ৭ মে চুয়াডাঙ্গায় মাদকদ্রব্য ধ্বংস কার্যক্রম চলাকালে চুয়াডাঙ্গা ৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নাজমুল হাসান জানান, সীমান্তে নিয়মিত অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক ও স্বর্ণ জব্দ করা হয়েছে। এদিন প্রায় ৩ কোটি ১৮ লাখ টাকার মাদক ধ্বংস করা হয়। গত এক বছরে ৩৪ কোটির বেশি টাকার চোরাচালান পণ্য জব্দের তথ্যও দিয়েছে বিজিবি। এছাড়া ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় ১৮ কোটি ৯১ লাখ টাকার সোনা এবং ৯ কোটি ৭০ লাখ টাকার মাদক উদ্ধার করা হয়েছে।

বিজিবির কর্মকর্তারা বলছেন, চোরাকারবারিরা প্রতিনিয়ত নতুন কৌশল ব্যবহার করছে। তবে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

চুয়াডাঙ্গার স্থানীয় একজন আইনজীবী নাম প্রকাশ না করে বলেন, শুধু বাহক পর্যায়ের সদস্যদের আটক করে চোরাচালান বন্ধ করা সম্ভব নয়। মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনতে না পারলে সিন্ডিকেট ভাঙা কঠিন হবে। এছাড়া অভিযুক্ত সামাদকে জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনা গেলে পুরো নেটওয়ার্ক সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।

স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, দর্শনা সীমান্তে সোনা ও মাদক পাচার এখন অর্থনৈতিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে। তাই দ্রুত জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ ও সীমান্ত নজরদারি আরও জোরদারের দাবি জানিয়েছেন তারা।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সামাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

চুয়াডাঙ্গা-৬ বিজিবির অন্তর্গত দর্শনা এলাকার বাড়াদি বিজিবি ক্যাম্প কর্তৃপক্ষ বলছে, অভিযুক্ত চোরাকারবারি সামাদ কামারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা হিসেবে পরিচিত। তবে তার চোরাচালানের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই।

দর্শনা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. হিমেল রানা বলেন, সামাদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে অডিও ও ভিডিওসহ কিছু তথ্য আমাদের হাতে এসেছে। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত শেষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এফএ/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।