গায়ে ছিল একই ট্যাটু, ছিলেন সহকর্মী- তবু জানতেন না তারা বোন
জুলিয়া টিনেট্টি ও ক্যাসান্ড্রা ম্যাডিসনের মধ্যে অনেক ছিল মিল। একই বারে কাজ করতে গিয়ে পরিচয়ের পর অল্প সময়ের মধ্যেই তারা ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে ওঠেন। কিন্তু তখন তারা কেউই জানতেন না, আসলে দুজনে কতটা কাছের মানুষ।
টিনেট্টি ও ম্যাডিসন দুজনেই যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাটে ১৯৯০–এর দশকে বড় হয়েছেন। ছোটবেলায় একে অপরকে না চিনলেও তারা মাত্র ১৫ মিনিটের দূরত্বে থাকতেন, আর দুজনই ছিলেন দত্তক নেওয়া সন্তান।
শৈশবে ম্যাডিসন প্রায়ই তার জন্মদাত্রী মাকে নিয়ে ভাবতেন এবং একদিন তার সঙ্গে দেখা করার আকাঙ্ক্ষা বোধ করতেন। তিনি ভাবতেন, হয়তো তার হাসি বা চোখ তিনি মায়ের কাছ থেকেই পেয়েছেন কি না।
তিনি জানতেন, তাকে জন্ম দেওয়া পরিবারটি ক্যারিবীয় অঞ্চলের ডোমিনিকান রিপাবলিক থেকে এসেছিল। ‘তারা আমাকে দত্তক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কারণ তারা খুব, খুব, খুবই গরিব ছিলেন এবং আমাকে বড় করার সামর্থ্য তাদের ছিল না,’ বলেন ম্যাডিসন।
তরুণ বয়সে ম্যাডিসন তার জৈবিক পরিবারকে খুঁজে বের করার চেষ্টা শুরু করেন। কিন্তু তার কাছে কোনো জন্মসনদ ছিল না, আর তার সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
ম্যাডিসন ১৯ বছর বয়সে তার বাহুতে ডোমিনিকান রিপাবলিকের পতাকার ট্যাটু করান, তার শিকড়ের কথা মনে রাখার জন্য। ‘ডোমিনিকান হওয়া আমার জন্য গর্বের বিষয়,’ বলেন তিনি।
পাঁচ বছর পর ম্যাডিসন একটি বারে ওয়েট্রেস হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেখানেই তিনি সহকর্মী টিনেট্টির সঙ্গে পরিচিত হন, যিনি ম্যাডিসনের বাহুতে আঁকা পতাকার ট্যাটুটি লক্ষ্য করেন।
কৌতূহল তৈরি হয়, কারণ টিনেট্টির শরীরেও ডোমিনিকান রিপাবলিকের পতাকার একটি ট্যাটু ছিল, তবে সেটি ছিল তার পিঠে। তিনি ২২ বছর বয়সে সেই ট্যাটু করিয়েছিলেন, যেখানে তিনি জন্মেছিলেন সেই জায়গার কথা মনে করে।
খুব শিগগির টিনেট্টি ও ম্যাডিসন বুঝতে পারেন, দুজনকেই দত্তক নেওয়া হয়েছিল। ‘আমি বলেছিলাম- হ্যাঁ, আমিও ওখান থেকেই দত্তক নেওয়া,’ বলেন টিনেট্টি। ‘‘আর (সে) বলল, ‘একটু দাঁড়াও, আমাকেও তো সেখান থেকেই দত্তক নেওয়া হয়েছিল।’ তখন আমি একেবারে থমকে গেলাম।’’
তারা লোকজনকে জিজ্ঞেস করতে শুরু করেন, আপনাদের কি মনে হয় আমরা দেখতে একরকম? টিনেট্টির ভাষায়, ‘ওরা বলত- হ্যাঁ, তোমরা দুজন দেখতে একরকম।’
অল্প সময়ের মধ্যেই তারা ঠাট্টা করে লোকজনকে বলতে শুরু করেন যে, তারা বোন। এমনকি ম্যাডিসন প্রস্তাবও দেন, তারা মিলিয়ে একরকম জামাকাপড় পরবেন, যাতে আরও সাদৃশ্য দেখা যায়।
সবকিছুই ছিল মজা করে বলা কথা। কিন্তু একসময় তাদের মনে সত্যিই প্রশ্ন জাগে, আদৌ কি তারা আত্মীয় হতে পারেন?
তারা দত্তক নেওয়ার কাগজপত্র মিলিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু সেখানে এমন কিছুই পাওয়া যায়নি যা থেকে বোঝা যেতে পারে যে তারা বোন। কাগজে লেখা ছিল তারা ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় জন্মেছেন এবং তাদের জন্মদাত্রী মায়েদের পদবিও আলাদা।
কিছু সময় পর তারা দুজনই নতুন চাকরি পান এবং আলাদা জায়গায় চলে যান। টিনেট্টি কানেকটিকাটেই থাকেন, আর ম্যাডিসন অন্য রাজ্য ভার্জিনিয়ায় চলে যান।
তারা যোগাযোগ রাখলেও দূরত্বের কারণে আগের মতো ঘনিষ্ঠ থাকা সম্ভব হয়নি।
এর কয়েক বছর পর, বড়দিনের উপহার হিসেবে ম্যাডিসন একটি জেনেটিক টেস্টিং কিট পান। সেই পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি এক দূরসম্পর্কের চাচাতো ভাইকে খুঁজে পান, যিনি তাকে জানান যে তার জন্মদাত্রী মা ২০১৫ সালে মারা গেছেন। এই খবর ছিল হৃদয়বিদারক।
তবে সেই চাচাতো ভাই তাকে পরিবারের আরও অনেক সদস্যের সন্ধান পেতে সাহায্য করেন, যার মধ্যে ছিলেন তার জন্মদাতা বাবাও।
ম্যাডিসনের চাচাতো ভাই তাকে জানান, শিশু বয়সে তার বাবা–মার সময়টা ছিল খুবই কঠিন। তিনি ম্যাডিসনের সঙ্গে তার জন্মদাতা বাবা আদ্রিয়ানো লুনা কোল্লাদোর ফোনে কথা বলার ব্যবস্থা করেন।
দত্তক দেওয়ার সময় কী ঘটেছিল, তার কিছুটা ব্যাখ্যা দেন কোল্লাদো। তিনি বলেন, তাদের পরিবারটি এত গরিব ছিল যে তারা মাটির মেঝেতে ঘুমাতেন।
ম্যাডিসনের মা যখন অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন, তখন তার বড় ছেলে সন্তান গুরুতর অসুস্থ ছিল। তখন পরিবারের টিকে থাকার একমাত্র উপায় হিসেবে ম্যাডিসনকে দত্তক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তার বাবা।
শিগগির ম্যাডিসন ডোমিনিকান রিপাবলিকে যাওয়ার পরিকল্পনা করতে শুরু করেন। বিমানবন্দরে পুরো পরিবার তার জন্য অপেক্ষা করছিল, সবাই তার মুখের ছবি ছাপানো শার্ট পরে ছিল। ম্যাডিসন তার বাবার বুকে জড়িয়ে ধরেন এবং দুজনেই কাঁদতে শুরু করেন।

বিমানবন্দরে পুনর্মিলনের মুহূর্তটি ছিল অত্যন্ত আবেগঘন/ ছবি: জুলিয়া
যাত্রাটি ছিল অসাধারণ। তবে বাড়ি ফেরার পর গল্পে আসে নতুন মোড়।
মলি নামে একজন নারী ম্যাডিসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ছোটবেলায় তিনি ছিলেন টিনেট্টির সবচেয়ে ভালো বন্ধু। তাদের বাবা–মা একসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডোমিনিকান রিপাবলিকে গিয়েছিলেন সন্তান দত্তক নিতে।
মলির ধারণা ছিল, তিনি ম্যাডিসনের জৈবিক বোন। কারণ তার জন্মসনদে ম্যাডিসনের জন্মদাত্রী মায়ের নামই লেখা ছিল। কিন্তু ডিএনএ পরীক্ষায় দেখা যায়, তারা বোন নন — কেবল দূর সম্পর্কের আত্মীয়; আর জন্মসনদে লেখা নামটিও ছিল ভুল।
তবে মলির কাছে ম্যাডিসনের জৈবিক মায়ের একটি ছবি ছিল, যা তার মতে দেখতে একেবারে টিনেট্টির মতো। সে কারণেই তিনি জোর দিয়ে বলেন, আসলে ম্যাডিসন ও টিনেট্টিই বোন।
ম্যাডিসন ভিডিও কলে তার জন্মদাতা বাবাকে জিজ্ঞেস করেন, তারা কি আর কোনো সন্তানকে দত্তক দিয়েছিলেন। ‘তিনি এমনভাবে তাকালেন, যেন হঠাৎ সব শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন,’ বলেন ম্যাডিসন।
‘‘তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, দিয়েছিলাম’। আর আমি বললাম, ‘হে ঈশ্বর! আপনি তো কখনো আমাকে বলেননি।’’
এই নতুন তথ্য জানার পর ম্যাডিসনের মনে হলো, সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তিনি আরেকটি জেনেটিক টেস্টিং কিট সংগ্রহ করেন এবং তুষারঝড়ের মধ্যে আট ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে টিনেট্টির কাছে যান।
পরীক্ষার ফল আসতে লাগে আড়াই সপ্তাহ। অপেক্ষার সময়টি ছিল দুজনের জন্যই যন্ত্রণাদায়ক, তারা কেউই কাজে মন দিতে পারছিলেন না।
শেষমেশ ফল এলে টিনেট্টি বার্তাটি খোলেন। সেখানে স্পষ্ট লেখা ছিল, তিনি এবং ম্যাডিসন বোন।
‘সত্যি বলতে, এটি পাগলামি,’ বলেন টিনেট্টি। ‘এতদিন ধরে আমরা বোন, অথচ আমরা নিজেরাই জানতাম না।’
ফল শুনে ম্যাডিসন কেঁদে ফেলেন। তিনি তাদের বাবাকে খবর দেন, যিনি দারুণ আনন্দিত এবং যত দ্রুত সম্ভব টিনেট্টির সঙ্গে দেখা করতে চান।
এরপর দুই বোন একসঙ্গে ডোমিনিকান রিপাবলিকে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। সেখানে পৌঁছানোর সময় আবারও পুরো পরিবার তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল— এবার সবার গায়ে দুই বোনের মুখ ছাপানো শার্ট।
তাদের বাবা এগিয়ে এসে টিনেট্টিকে বিশাল এক আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরেন এবং বলেন, ‘মি হিহা’, স্প্যানিশ ভাষায় যার মানে ‘আমার মেয়ে’।
বোন হিসেবে একসঙ্গে করা সেই প্রথম সফর ছিল আনন্দ, গান আর নাচে ভরা। আদ্রিয়ানো লুনা কোল্লাদো বলেন, কন্যাদের সঙ্গে পুনর্মিলন তার জীবনে ঈশ্বরের দেওয়া সবচেয়ে বড় উপহার।
‘আমি খুব সুখী, সত্যিই সুখী। তারা যতবার আমাকে দেখতে আসে, আমার হৃদয় আনন্দে ভরে যায়। আমরা তাদের ভালোবাসা ও স্নেহ দিয়ে গ্রহণ করি, যেমন সব পরিবারেরই করা উচিত,’ বলেন তিনি। ‘এটি এক অসাধারণ গল্প। এমন গল্প সবাই বলতে পারে না।’
সূত্র: বিবিসি বাংলা
কেএএ/