আয়ের পাল্লা হালকা, ব্যয়ের ভারে ন্যুব্জ শ্রমজীবী
‘আগে যা আয় করতাম, তাতে কষ্ট করে হলেও সংসার চলত। এখন বাজারে গেলে হিসাব মেলে না। অনেক সময় ধারদেনা করতে হয়। ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোও কঠিন হয়ে গেছে। দিন খুব কঠিন যাচ্ছে।’
এভাবেই নিজের নাভিশ্বাসের কথা জানাচ্ছিলেন চাঁদপুর সদর উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের খেরুদিয়া গ্রামের দিনমজুর নান্নু মিয়া। এমন চিত্র বলতে গেলে শ্রমজীবী প্রায় সবারই। বর্তমান আয় দিয়ে সংসার চালাতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। যখন আয়ে টান পড়ে, তখন ধারদেনায় জড়াতে হয়।
শ্রমজীবীরা বলছেন, বাজারে প্রতিদিনই বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। চাল, ডাল, তেল, সবজি থেকে শুরু করে প্রায় সব খাদ্যপণ্যের মূল্য এখন তাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। অথচ সেই অনুপাতে বাড়ছে না তাদের আয়। সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত গ্রামীণ জনগোষ্ঠী। জীবনযাত্রার আয় ও ব্যয়ের মধ্যে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য।
চাঁদপুরের গ্রামাঞ্চলে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, গত এক বছরে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে ২০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত। মৌসুমভেদে কিছু সবজির দাম দ্বিগুণও হয়েছে। এতে একটি সাধারণ পরিবারের মাসিক খাদ্য ব্যয় আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে। কিন্তু আয় বাড়েনি সেই হারে। ফলে সংসার চালাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে শ্রমজীবী ও কৃষক পরিবারগুলো।
ধান কেটে ভ্যানে করে নিয়ে যাচ্ছেন দুই শ্রমিক/ছবি-জাগো নিউজ
চাঁদপুর সদর উপজেলার সফরমালী এলাকার কৃষক মিন্টু খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আগে যে জমিতে চাষ করতে কম খরচ হতো, এখন সেখানে সার, বীজ, সেচ ও শ্রমিক মিলে খরচ বেড়েছে ৩০-৪০ শতাংশ। কিন্তু ফসল বিক্রি করতে গেলে সেই অনুযায়ী দাম পাই না। অনেকেই এখন ধান চাষ ছেড়ে দিচ্ছে।’
‘আগে যে জমিতে চাষ করতে কম খরচ হতো, এখন সেখানে সার, বীজ, সেচ ও শ্রমিক মিলে খরচ বেড়েছে ৩০-৪০ শতাংশ। কিন্তু ফসল বিক্রি করতে গেলে সেই অনুযায়ী দাম পাই না। অনেকেই এখন ধান চাষ ছেড়ে দিচ্ছে’
একই উপজেলার শাহতলি এলাকার কৃষক আবুল খায়ের বলেন, ‘বাজারে সবকিছুর দাম বাড়লেও কৃষকের ফসলের দাম বাড়ে না। আমরা আড়তে কম দামে বিক্রি করি। পরে বাজারে গিয়ে দেখি সেই পণ্যের দাম দ্বিগুণ। তাহলে লাভটা পাচ্ছে কারা?’
হাইমচর উপজেলার চরভৈরবি এলাকার কৃষক কামরুল ইসলাম। তিনি জানান, চরাঞ্চলের জমিতে ভালো ফলন হলেও উৎপাদন খরচ ও বাজার ব্যবস্থার কারণে কৃষকদের আগ্রহ কমছে।
কামরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা সবজি নিয়ে বাজারে গেলে তেমন দাম পাই না। অথচ বাজারে সেই পণ্য অনেক বেশি দামে বিক্রি হয়। এই অবস্থায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।’
গ্রামীণ দিনমজুরদের অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। কাজের মজুরি কিছুটা বাড়লেও বাজারদরের সঙ্গে তার কোনো সামঞ্জস্য নেই। বর্তমানে গ্রামে একজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৫০০-৭০০ টাকা। শহরে তা ৮০০-১০০০ টাকা পর্যন্ত হলেও জীবনযাত্রার ব্যয় সেখানে আরও বেশি।
চাঁদপুর শহরে ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন সফিকুল ইসলাম। দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি জানান, ১০-১৫ বছর আগে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে সংসার চালানো তুলনামূলকভাবে সহজ ছিল। তখন পরিবারের সবাই একসঙ্গে থাকতেন। আয়-রোজগার দিয়ে মোটামুটি স্বাচ্ছন্দ্যেই চলতো সংসার।
শফিকুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। ছেলে-মেয়েরা আলাদা হয়ে গেছে, মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। এখন তিনি এবং তার স্ত্রী—এ দুজনেরই সংসার। তবুও দৈনিক ৫০০-৬০০ টাকার মতো আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক দিন এই আয় আরও কমে যায়। বাজারে গেলে এই টাকায় প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। মাঝে মাঝে বাড়িতে অতিথি এলে খরচ সামলাতে চরম কষ্টে পড়তে হয় বলে তিনি জানান।
পেশায় একজন রংমিস্ত্রি রিপন হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের পেশা ঝুঁকিপূর্ণ হলেও সে অনুযায়ী পারিশ্রমিক পাওয়া যায় না। আগে দৈনিক ৪০০-৫০০ টাকা মজুরি ছিল। বর্তমানে ৮০০-১০০০ টাকা পর্যন্ত পাওয়া গেলেও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সেই আয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।’
তিনি বলেন, দেশে শ্রমজীবী মানুষের শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে না। এ কারণেই অনেকেই বাধ্য হয়ে প্রবাসে পাড়ি জমাচ্ছেন। কারণ দেশের আয় দিয়ে সংসার চালানো দিন দিন অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
ঘাসের বোঝা মাথায় একজন কৃষক/ছবি-জাগো নিউজ
আরও পড়ুন:
ভেজা ধানেই খোরাকির খোঁজ
বগুড়ার চরে ‘লাল সোনা’ বিপ্লব
‘পেটের দায়ে অটো চালাইতে হয়, বাবার ওষুধও কিনতে হয় প্রতিদিন’
চাকা ঘোরে কিন্তু ভাগ্য ফেরে না মৃৎশিল্পীদের
‘তেলের পেছনে ছুটবো নাকি কৃষিকাজ করবো?’
মাছ কেটে জীবন চলে তাদের
লোকলজ্জা উপেক্ষা, ভ্যান চালিয়ে সংসার চালান সুলতানা
বিশ্লেষকরা বলছেন, শহরের তুলনায় গ্রামে আয়ের উৎস অনেক সীমিত। শহরে চাকরি, ব্যবসা ও বিভিন্ন খাতে আয় বাড়ার সুযোগ থাকলেও গ্রামে কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ও বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাবে মানুষ পিছিয়ে পড়ছে। ফলে গ্রামীণ জীবনযাত্রার মান দ্রুত অবনতি হচ্ছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চাঁদপুর জেলা শাখার সভাপতি ও বাবুরহাট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মোশারেফ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, আন্তর্জাতিক সংকটের প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে পড়লেও বাস্তব পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। তার মতে, শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
‘গ্রামীণ দিনমজুরদের অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। কাজের মজুরি কিছুটা বাড়লেও বাজারদরের সঙ্গে তার কোনো সামঞ্জস্য নেই। বর্তমানে গ্রামে একজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৫০০-৭০০ টাকা। শহরে তা ৮০০-১০০০ টাকা পর্যন্ত হলেও জীবনযাত্রার ব্যয় সেখানে আরও বেশি’
তিনি বলেন, ‘শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা গেলে দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হতে পারতো। শুধু নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বসে সিদ্ধান্ত নিলে হবে না, বাস্তব পরিস্থিতি বুঝে পদক্ষেপ নিতে হবে।’
বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রভাব এখন সব শ্রেণির মানুষের ওপর পড়ছে বলে জানান চাঁদপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি সুভাষ চন্দ্র রায়।
তিনি বলেন, ‘কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। কৃষি উৎপাদন বাড়লে বাজারে সরবরাহ বাড়বে, তখন দ্রব্যমূল্যও নিয়ন্ত্রণে আসবে। আমদানিনির্ভরতা কমাতে কৃষিখাতে আরও বিনিয়োগ ও সহায়তা প্রয়োজন।’
মাথায় বোঝা নিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন একজন শ্রমিক/ছবি-জাগো নিউজ
চাঁদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ আবু তাহের জানান, জেলায় মোট আবাদি জমির পরিমাণ ৮৭ হাজার ৬৩ হেক্টর। তবে গত দুই থেকে তিন বছরে প্রায় দেড় হাজার হেক্টর জমি আবাদ থেকে হারিয়ে গেছে।
তার ভাষ্য, ‘কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, শ্রমিক সংকট, কৃষিজমিতে বসতবাড়ি নির্মাণ এবং মৎস্য চাষে জমির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় আবাদি জমি কমছে।’
একদিকে আবাদি জমি কমছে, অন্যদিকে জনসংখ্যা বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে খাদ্য উৎপাদন ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন এই উপ-পরিচালক।
তিনি বলেন, কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে কার্যকর বাজারব্যবস্থা, সংরক্ষণ সুবিধা ও সরকারি সহায়তা জরুরি।
এসআর/এএসএম