‘পেটের দায়ে অটো চালাইতে হয়, বাবার ওষুধও কিনতে হয় প্রতিদিন’

মো. রোকনুজ্জামান মানু মো. রোকনুজ্জামান মানু , জেলা প্রতিনিধি কুড়িগ্রাম
প্রকাশিত: ০৭:১৮ পিএম, ০১ মে ২০২৬
যে বয়সে স্কুলে থাকার কথা, সে বয়সে অটোরিকশা চালাতে হচ্ছে সাজিদ হোসেনকে। ছবি-জাগো নিউজ
  • কুড়িগ্রামে বাড়ছে শিশুশ্রম
  • অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে ঝুঁকছে শিশুরা
  • পরিস্থিতি ‘উদ্বেগজনক’ বলছেন সংশ্লিষ্টরা
  • ওয়েল্ডিং কারখানাগুলোতে শিশু শ্রমিক বেশি

কুড়িগ্রাম-উলিপুর ব্যস্ত সড়কে প্রতিদিন ছুটে চলে একটি অটোরিকশা। চালকের আসনে বসা কিশোরটির নাম সাজিদ হোসেন। তার বয়স মাত্র ১৩। যে বয়সে তার স্কুলে থাকার কথা, সেই বয়সেই জীবনের কঠিন বাস্তবতায় তাকে ধরতে হয়েছে অটোরিকশার হ্যান্ডেল।

শুক্রবার (১ মে) আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসে শ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে যখন নানা আয়োজন চলছে, তখন সাজিদের মতো অসংখ্য শিশুর জীবনগল্প হয়ে ওঠে এক নিঃশব্দ প্রতিবাদ।

উলিপুর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের এই কিশোর চার বছর বয়সেই হারায় মাকে। কিছুদিন না যেতেই বাবা আবদুল বাতেন আক্রান্ত হন হৃদরোগে। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে একে একে বিক্রি হয়ে যায় পরিবারের সব জমিজমা। শেষমেশ মাথা গোঁজার ঠাঁই হয় একই এলাকার কামালখামার বাজারের একটি ভাড়া দোকানঘরে। সেখানে একসঙ্গে চলে বসবাস, সংগ্রাম আর বেঁচে থাকার লড়াই।

‘অটো চালাইতে আমার ভালো লাগে না। বন্ধুরা স্কুলে যায়, আমি ওই সময় রাস্তায় থাকি। খুব খারাপ লাগে। কিন্তু কী করমু, পেটের দায়ে চালাইতে হয়। বাবার ওষুধও কিনতে হয় প্রতিদিন’—সাজিদ হোসেন

পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম এখন সাজিদ হোসেন। ভোরের আলো ফোটার আগেই শুরু হয় তার দিন। আর সন্ধ্যা নামা পর্যন্ত চলতে থাকে অটোরিকশার চাকা। দিনের শেষে যা আয় হয়, তা দিয়েই কোনোভাবে চলে সংসার, বাবার ওষুধ, ঘরভাড়া আর দুবেলা খাবারের ব্যবস্থা।

‘পেটের দায়ে অটো চালাইতে হয়, বাবার ওষুধও কিনতে হয় প্রতিদিন’কুড়িগ্রামে ওয়েল্ডিং কারখানায় কর্মরত শিশু। ছবি-জাগো নিউজ

কিশোর সাজিদ হোসেন জাগো নিউজকে বলে, ‘অটো চালাইতে আমার ভালো লাগে না। বন্ধুরা স্কুলে যায়, আমি ওই সময় রাস্তায় থাকি। খুব খারাপ লাগে। কিন্তু কী করমু, পেটের দায়ে চালাইতে হয়। বাবার ওষুধও কিনতে হয় প্রতিদিন।’

অসুস্থ বাবা আবদুল বাতেনের কণ্ঠেও অসহায়ত্ব। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘হৃদরোগ হওয়ার পর আর কাজ করতে পারি না। চিকিৎসা করতে করতে সব শেষ হয়ে গেছে। পরে বাড়িঘর বিক্রি করে এই অটো কিনছি। আমি চালাতে পারি না, তাই ছেলেই চালায়। এই অটো চার্জ দেওয়ার ঘরেই আমাদের বসবাস।’

‘গত এক দশকে অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, কুড়িগ্রাম জেলায় শিশুশ্রম বাড়ছে। শিশুদের শ্রম থেকে ফিরিয়ে আনতে হলে পরিবারগুলোর জন্য টেকসই কর্মসংস্থান তৈরি ও সচেতনতা বাড়ানো জরুরি’—শিশু অধিকার কর্মী

শুধু সাজিদ নয়, নদী তীরবর্তী জেলা কুড়িগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় দারিদ্র্যের চাপে এমন অনেক শিশু জড়িয়ে পড়ছে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে। জেলা শহরের ওয়েল্ডিং কারখানাগুলোতে চোখে পড়ে শিশু শ্রমিকদের উপস্থিতি।

আরও পড়ুন:
দেশে বর্তমানে ৩৫ লাখ শিশু শ্রমে নিয়োজিত: ছায়া সংসদে বক্তারা
শিশুশ্রম কি দারিদ্র্যেরই ফসল?
দেশে ১৭ লাখ শিশু শ্রমিকের ১২ লাখ ঝুঁকিপূর্ণ কাজে: শ্রম সচিব
শিশুশ্রম প্রতিরোধে ইসলামের নির্দেশনা কী?
যে কারণে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ করা হয়
যে কারণে বিশ্বব্যাপী বেড়েছে শিশুশ্রম

শাপলা চত্বর সংলগ্ন একটি ওয়েল্ডিং কারখানায় কাজ করে আল আমিন ও সাব্বির রহমান। সাব্বির জানায়, তার বাবা সেলুনে কাজ করেন। অভাবের কারণে পঞ্চম শ্রেণির পর বন্ধ হয়ে যায় তার পড়াশোনা। এখন গ্যাস ঝালাইসহ নানা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে দিন কাটে তার।

‘পেটের দায়ে অটো চালাইতে হয়, বাবার ওষুধও কিনতে হয় প্রতিদিন’অভাবের তাড়নায় ছোট্ট বয়সেই অটোরিকশা চালানোকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে শিশু সাজিদ হোসেন/ছবি-জাগো নিউজ

ন্যাশনাল চিলড্রেন টাস্ক ফোর্স (এনসিটিএফ) কুড়িগ্রামের শিশু অধিকার কর্মী খাদিজা আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, ‌‘গত এক দশকে আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, কুড়িগ্রাম জেলায় শিশুশ্রম বাড়ছে। শিশুদের শ্রম থেকে ফিরিয়ে আনতে হলে পরিবারগুলোর জন্য টেকসই কর্মসংস্থান তৈরি ও সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।’

‘শিশুশ্রম সম্পূর্ণ বেআইনি। কিন্তু কুড়িগ্রামের মতো একটি দরিদ্র জেলায় দিন দিন শিশুরা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িয়ে পড়ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক’—আইনজীবী

জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সাজাদুল ইসলাম বলেন, কুড়িগ্রামে বড় শিল্পকারখানা না থাকায় শিশুশ্রম তুলনামূলক কম। তারপরও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে শিশুদের সরানো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

তিনি বলেন, ‘ওয়েল্ডিং কারখানা ও ঝালাইয়ের মতো কাজে যুক্ত শিশুদের তালিকা করে তাদের পরিবারকে সরকারি সহায়তার আওতায় আনলে এই সমস্যা অনেকটাই কমানো সম্ভব।’

‘পেটের দায়ে অটো চালাইতে হয়, বাবার ওষুধও কিনতে হয় প্রতিদিন’কারখানায় কর্মরত শিশু। ছবি-জাগো নিউজ

কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) থেকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারের সদস্যদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। যা পরোক্ষভাবে শিশুশ্রম হ্রাসে ভূমিকা রাখছে বলেও মন্তব্য করেন সাজাদুল ইসলাম।

কুড়িগ্রাম জজ কোর্টের লিগ্যাল এইডের কনসালটেন্ট (পরামর্শক) অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘শিশুশ্রম সম্পূর্ণ বেআইনি। কিন্তু কুড়িগ্রামের মতো একটি দরিদ্র জেলায় দিন দিন শিশুরা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িয়ে পড়ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইন প্রয়োগের পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারগুলোর আর্থিক সহায়তা দিতে হবে। একই সঙ্গে শিশুদের শিক্ষায় ফিরিয়ে আনতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি।’

এসআর/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।