সুনামগঞ্জে প্রকৃত কৃষকরাই বাদ পড়ছে সরকারি সহায়তার তালিকা থেকে
সুনামগঞ্জের দেখার হাওর সংলগ্ন খলায় ধান শুকাচ্ছিলেন কৃষক আব্দুল্লাহ মুকিত। সাত একর জমিতে বোরো আবাদ করলেও ভারী বর্ষণ আর জলাবদ্ধতায় পাঁচ একরের স্বপ্নই এখন পানির নিচে। বড় পরিবার আর পড়াশোনা করা সন্তানদের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার একমাত্র অবলম্বন ছিল এই কৃষি জমি।
মুকিত আক্ষেপ করে বলেন, ‘দিনভর ধান শুকানোর চেষ্টা করছি, সরকারি সহায়তার পেছনে দৌড়ানোর সময় কোথায়? যারা চাষাবাদ করে না, তাদের অনেকেই দেখি তালিকার জন্য ঘুরছে। আমার আইডি কার্ড এখনো কেউ নেয়নি। জানি না প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা আমাদের ভাগ্যে আছে কি না।’
শুধু আব্দুল্লাহ মুকিত নন, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার লক্ষণশ্রী ইউনিয়নের দেখার হাওরের অধিকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সঙ্গে এখনো সহায়তার জন্য কেউ যোগাযোগ করেনি।

জানা গেছে, সুনামগঞ্জের হাওরগুলোতে জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তায় সরকারের পক্ষ থেকে ২০ কেজি চাল ও নগদ অর্থ প্রদানের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এই সহায়তার জন্য একটি তালিকাও তৈরি করা হচ্ছে। তবে অনেক এলাকায় তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ফলে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা বাদ পড়ার সংশয়ে আছেন। যদিও এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বর্তমানে তালিকাগুলো পুনরায় যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অভিযোগ, যারা চাষাবাদ করে না, তাদের অনেকেই তালিকার পেছনে দৌড়াচ্ছে। অথচ প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত অনেক কৃষক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকায় তালিকায় নাম লেখাতে পারছেন না।
দেখার হাওরের কৃষক শফিক মিয়া বলেন, হাওরে ধানের ক্ষতি হয়েছে প্রায় সব কৃষকের। কিন্তু আইডি কার্ড নেওয়া হচ্ছে তাদেরই, যাদের নেতাদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক আছে।

লক্ষণশ্রী ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হাফিজ উদ্দিন তালুকদার বলেন, মাত্র দুদিনের সময় দিয়ে ক্ষতিগ্রস্তের তালিকা করতে বলা হয়েছিল। এজন্য কিছু ভুলত্রুটি হয়ে থাকতে পারে। ইতিমধ্যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, প্রতি ইউনিয়নে পাঁচ সদস্যের কমিটি যাচাই-বাছাই করে দ্রুত তালিকা চূড়ান্ত করবে। যে কমিটিতে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, বিএনপির দুজন প্রতিনিধি এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাসহ দুজন প্রতিনিধি থাকবেন।
শাল্লার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ছত্তার মিয়া বলেন, জেলার মধ্যে সবচেয়ে দুর্গম শাল্লা উপজেলা। যেখানে অনেক কৃষকের ধান নষ্ট হয়েছে। ইতিমধ্যে আমি ২৯ সদস্যবিশিষ্ট যাচাই-বাছাই কমিটি করেছি।
তিনি বলেন, সরকার ক, খ ও গ তালিকা অর্থাৎ ক্ষয়ক্ষতির ভিত্তিতে ২০ কেজি করে চাল এবং তিন ক্যাটাগরিতে সাত হাজার পাঁচশ, পাঁচ হাজার ও দুই হাজার পাঁচশ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত দিয়েছে। তার মতে, এই ক্যাটাগরির কারণে স্বজনপ্রীতি হতে পারে। ইউপি সদস্য ও দলীয় নেতারা তাদের নিজেদের লোককে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেখানোর চেষ্টা করতে পারেন।

এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মতিউর রহমান বলেন, জলাবদ্ধতায় হাওরের যেসব কৃষকের ক্ষতি হয়েছে, তাদের তালিকা তৈরি হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রাথমিকভাবে ৯৮ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা হলেও সেগুলো যাচাই-বাছাই এবং সংযুক্তি চলছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, তালিকা তৈরিতে কোনো দলীয় পরিচয় কিংবা কোনো রকম দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া যাবে না। নির্দেশনা অনুযায়ী স্থানীয় প্রশাসন, ইউনিয়ন পরিষদ এবং কৃষি বিভাগকে সরেজমিনে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা তৈরি করতে বলা হয়েছে।
লিপসন আহমেদ/কেএইচকে/এএসএম