ইসরায়েলি হামলা

বাড়ি বিক্রি করে লেবাননে পাঠানো সুরঞ্জন ফিরলেন লাশ হয়ে, পথে বসলো পরিবার

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি সাতক্ষীরা
প্রকাশিত: ০৯:৫৮ পিএম, ১৩ মে ২০২৬
লেবাননে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত সাতক্ষীরার সুরঞ্জন দাস

অভাবের সংসার। স্বপ্ন ছিল একদিন সচ্ছলতা ফিরবে। সেই আশাতেই শেষ সম্বল বাড়ির জমিটুকু বিক্রি করে ছেলে শুভ দাসকে লেবাননে পাঠিয়েছিলেন সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার শ্রীপতিপুর গ্রামের ভ্যানচালক সুরঞ্জন দাস। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! তিন বছর পর সেই ছেলে ফিরলো লাশ হয়ে।

সোমবার (১১ মে) রাতে লেবাননের সংঘাতপূর্ণ মাইফাদুন এলাকায় চলাচলের সময় ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত হন শুভ দাস। একই ঘটনায় আরও দুই বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

সুরঞ্জন দাসের সংসারে স্ত্রী, তিন ছেলে ও এক মেয়ে। বড় ছেলে আলাদা থাকেন। মেজ ছেলে শুভ দাস স্থানীয় কয়লা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাসের পর পড়াশোনার পাশাপাশি ট্রলি চালাতেন। ছোট ছেলে সুদীপ স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে। মেয়ে সাধনা দাস নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী।

পরিবারের আর্থিক সংকট সামাল দিতে তিন বছর আগে শুভকে লেবাননে পাঠানো হয়। সেখানে তিনি মাইফাদুন এলাকায় একটি বাড়ির দেখাশোনা ও বাগানের কাজ করতেন। ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে সুরঞ্জন দাস শেষ আশ্রয়স্থল এক শতক জমির বাড়িটি বিক্রি করেন। পাশাপাশি স্থানীয় সমিতি ও ব্যক্তিদের কাছ থেকে চড়া সুদে প্রায় চার লাখ টাকা ঋণ নেন। বাড়ি বিক্রির পর পরিবারটি একই গ্রামে ভাড়া বাসায় বসবাস শুরু করে।

শুভ প্রতিমাসে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা পাঠাতেন। সেই অর্থ দিয়েই চলত সংসার, শোধ হতো ঋণের কিস্তি। চলতো ভাই-বোনের পড়াশোনা। তবে গত দুই মাস কোনো টাকা পাঠাতে পারেননি তিনি।

বুধবার (১৩ মে) সকালে শ্রীপতিপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, শুভর বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। পরিবারের সদস্যরা অপেক্ষা করছেন তার মরদেহ দেশে ফেরার।

শুভর বোন সাধনা দাস জানান, মঙ্গলবার (১২ মে) দুপুরে তারা ভাইয়ের মৃত্যু সংবাদ পান। এর আগের রাতেই পরিবারের সঙ্গে শুভর শেষ কথা হয়েছিল। দুই মাস টাকা পাঠাতে না পারায় তিনি মানসিক কষ্টে ছিলেন বলেও জানান তিনি।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে সাধনা বলেন, ‌‘দাদা ছিল আমাদের পরিবারের একমাত্র ভরসা। এখন আমাদের পড়াশোনা কীভাবে চলবে জানি না। বাবার ঋণ কীভাবে শোধ হবে, সেটাও বুঝতে পারছি না।’

আক্ষেপ করে মা শিখা রানী দাস বলেন, ‘সংসারের হাল ফেরাতে বিয়ে না করেই বিদেশে গিয়েছিল শুভ। কিছুদিন পর দেশে এনে ছেলেকে বিয়ে দেওয়ার স্বপ্ন ছিল। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।’

ছেলেকে হারিয়ে শোকে পাথর সুরঞ্জন দাস। তিনি বলেন, ‘ঈশ্বর যেন আমাকে এই শোক সহ্য করার শক্তি দেন। এখন আবার নতুন করে সংসার কীভাবে চালাবো, সেটাই ভাবছি।’

স্থানীয় বাসিন্দা সুমন দাস বলেন, ‘শুভ অত্যন্ত শান্ত ও ভদ্র স্বভাবের ছেলে ছিলেন। গ্রামের কারও সঙ্গে তার কোনো বিরোধ ছিল না।’

এ বিষয়ে কলারোয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘শুভর মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রশাসন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে। পাশাপাশি পরিবারকে সরকারি সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হবে।’

লেবাননে নিহত তিন প্রবাসী বাংলাদেশির মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে বলে জানান সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বিষ্ণুপদ পাল।

আহসানুর রহমান রাজীব/এসআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।