গিলা-চামড়াতেই মাংসের স্বাদ খুঁজছেন নিম্নবিত্তরা

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক বগুড়া
প্রকাশিত: ০৯:৫৪ পিএম, ১৩ মে ২০২৬
সাধ্যের বাইরে আস্ত মুরগি, তাই সন্তানের মুখে মাংসের স্বাদ দিতে ভরসা গিলা-কলিজা ও চামড়া/ছবি: জাগো নিউজ

বগুড়া শহরের ফতেহ্ আলী বাজারে তিন বছরের ছেলেকে নিয়ে এসেছিলেন গৃহিণী জীবন বেগম। এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরে মুরগির দাম শুনছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো আস্ত মুরগিই তার ব্যাগে উঠেনি। অনেক হিসাব-নিকাশের পর ৬০ টাকা দিয়ে এক কেজি মুরগির চামড়া আর ৬০ টাকায় আধা কেজি গিলা-কলিজা কিনে বাড়ির পথে রওনা দেন।

কথা বলতে গিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বলেন, ‘ছোট বাচ্চা মাংস খেতে চায়। আগে ছোট মুরগি কিনতাম। এখন সেটাও পারি না। তাই বাধ্য হয়ে গিলা-কলিজা আর চামড়া কিনি।’

জীবন বেগমের এ বাস্তবতা এখন শুধু একটি পরিবারের নয়। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের খাদ্য তালিকা থেকে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে আস্ত মুরগি। সে জায়গা দখল করছে মুরগির কাটা অংশ গিলা, কলিজা, চামড়া, গলা আর পা।

চামড়া-গিলাতেই মাংসের স্বাদ খুঁজছেন নিম্নবিত্তরা

‘এখন আস্ত মুরগির চেয়ে কাটা অংশের ক্রেতা বেশি। মানুষ ৫০-১০০ টাকার মধ্যে কিছু নিতে চায়’

তবে এ পরিবর্তনের সঙ্গে বাড়ছে আরেকটি নীরব ঝুঁকি। বাজারে বাড়ছে কাটা মুরগির দোকান, কিন্তু এসব অংশ কোথা থেকে আসছে, কীভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে বা আদৌ স্বাস্থ্যসম্মত কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর জানে না কেউ।

বগুড়ার সবচেয়ে বড় কাঁচাবাজার ফতেহ্ আলী ঘুরে দেখা যায়, আস্ত মুরগির দোকানের পাশেই এখন আলাদা করে গড়ে উঠেছে গিলা-কলিজা ও চামড়া বিক্রির ছোট ছোট দোকান। আগে এসব অংশ অবিক্রিত পড়ে থাকত বা ফেলে দেওয়া হতো। এখন সেগুলোরই আলাদা বাজার তৈরি হয়েছে। অনেক দোকানে আস্ত মুরগিও কেটে আলাদা অংশ হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন
আয়ের পাল্লা হালকা, ব্যয়ের ভারে ন্যুব্জ শ্রমজীবী
চতুর্মুখী চাপে চিড়েচ্যাপ্টা বোরো চাষি
ইলিশ উধাও, জলবায়ু পরিবর্তনকে দুষছেন গবেষকরা

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, শুধু বাজারের মুরগি নয়, বিভিন্ন হোটেল-রেস্তোরাঁ, ফাস্টফুড দোকান ও প্রসেসিং পয়েন্ট থেকেও কম দামে গিলা-কলিজা, চামড়া ও অন্যান্য অংশ সংগ্রহ করা হয়। পরে সেগুলো বাজারে এনে বিক্রি করা হয়। তবে এসব অংশ কতটা তাজা, কোন পরিবেশে সংরক্ষণ করা হয়েছে কিংবা কোন মুরগির অংশ ভালো বা নষ্ট, তা নির্ধারণের কার্যকর কোনো পদ্ধতি নেই।

চামড়া-গিলাতেই মাংসের স্বাদ খুঁজছেন নিম্নবিত্তরা

একাধিক ক্রেতা অভিযোগ করেন, অনেক সময় বাসায় নেওয়ার পর গিলা-কলিজা থেকে দুর্গন্ধ বের হয়। কেউ কেউ বলেন, বরফে দীর্ঘসময় সংরক্ষণ করা কিংবা আগের দিনের অবিক্রিত অংশও নতুনের সঙ্গে মিশিয়ে বিক্রি করেন অনেক ব্যবসায়ি। যার কারণে খেতে না পেরে সেগুলো ফেলে দিতে বাধ্য হয়।

‘গিলা-কলিজায় কিছু পুষ্টিগুণ থাকলেও অতিরিক্ত চামড়া ও চর্বিযুক্ত অংশ নিয়মিত খাওয়া হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের ঝুঁকি বাড়াতে পারে’- পুষ্টিবিদ জেনিফা জাসিয়া

বাজার সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যবসায়ী ও ক্রেতার অভিযোগ, শহরের কিছু হোটেল, চাইনিজ রেস্তোরাঁ ও ফাস্টফুড দোকানে ব্যবহারের পর মুরগির হাড়হাড্ডি, গিলা-কলিজা ও বিভিন্ন কাটা অংশ আলাদা করে জমিয়ে রাখা হয়। কয়েকদিন ধরে ফ্রিজ বা বরফে সংরক্ষণের পর সেগুলো কম দামে বিভিন্ন পাইকার বা খুচরা বিক্রেতার কাছে বিক্রি করা হয়। পরে এসব অংশ বাজারে এনে নতুন পণ্যের সঙ্গে মিশিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে কোনটি তাজা আর কোনটি দীর্ঘদিন সংরক্ষিত, তা বুঝে ওঠার উপায় থাকে না ক্রেতার।

মুরগি ব্যবসায়ী আব্দুল মান্নান প্রামাণিক জানান, এখন আস্ত মুরগির চেয়ে কাটা অংশের ক্রেতা বেশি। মানুষ ৫০-১০০ টাকার মধ্যে কিছু নিতে চায়। তাই দোকানিরাও আলাদা করে অংশ বিক্রি করছে। বর্তমানে তার দোকানে মুরগির চামড়া ৬০ টাকা কেজি, গিলা-কলিজা ১২০ থেকে ১৩০, গলা ১২০ এবং মুরগির পা ১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। সব অংশ মিশিয়ে ১২০ টাকায় এক কেজি মিক্সড আইটেমও বিক্রি হচ্ছে।

চামড়া-গিলাতেই মাংসের স্বাদ খুঁজছেন নিম্নবিত্তরা

বাজারে কথা হয় রিকশাচালক ওয়াসিম রেজার সঙ্গে। হাতে ছোট একটি পলিথিন ব্যাগ। তাতে আধা কেজির মতো গিলা-কলিজা। বলেন, একটা আস্ত মুরগি কিনতে গেলে ৩০০-৪০০ টাকা লাগে, যা আমার পক্ষে সম্ভব না। দিনে যা আয় হয়, তা দিয়ে সংসারই চলে না। তাই এখন গিলা-কলিজাই ভরসা।

আরও পড়ুন
ভোজ্যতেল নিতে ‘শর্তের চাপে’ ব্যবসায়ীরা, বিপাকে ক্রেতা
‘পেটের দায়ে অটো চালাইতে হয়, বাবার ওষুধও কিনতে হয় প্রতিদিন’
লোকলজ্জা উপেক্ষা, ভ্যান চালিয়ে সংসার চালান সুলতানা

ফতেহ্ আলী বাজারে বর্তমানে ব্রয়লার মুরগি ১৯০ থেকে ২২০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। লেয়ার মুরগি ৩৫০ থেকে ৩৬০ টাকা, সোনালি বা পাকিস্তানি মুরগি ৩৫০ থেকে ৩৬০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে প্রায় সব ধরনের মুরগি।

ক্রেতা আবু সাঈদ বলেন, আগে যেটা ২৬০ টাকায় কিনতাম, এখন সেটি ৩৬০ টাকা। বাজারে গেলে এখন হিসাব মেলানো যায় না।

‘মুরগির রোগবালাইও বাজার অস্থির হওয়ার অন্যতম কারণ। গত কয়েক মাসে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের প্রকোপ বেড়েছে। এতে অনেক খামারে মুরগি মারা যাচ্ছে’

অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা সাজ্জাদুল করিম বলেন, শুধু মুরগি না, সব খাদ্যপণ্যের দামই চড়া। বাজারে তদারকি নেই। এখন মধ্যবিত্ত মানুষও হিমশিম খাচ্ছে।

এদিকে খামার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মুরগির রোগবালাইও বাজার অস্থির হওয়ার অন্যতম কারণ। গত কয়েক মাসে বিভিন্ন খামারে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের প্রকোপ বেড়েছে। এতে অনেক খামারে মুরগি মারা যাচ্ছে।

চামড়া-গিলাতেই মাংসের স্বাদ খুঁজছেন নিম্নবিত্তরা

খামারি আবুল হোসেন বলেন, বর্তমানে রানীক্ষেত, গামবোরো, ক্রনিক রেসপিরেটরি ডিজিজ (সিআরডি) ও হিট স্ট্রোকজনিত সমস্যায় মুরগি বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। আবহাওয়ার অস্বাভাবিক গরম, লোডশেডিং, অপরিকল্পিত খামার ব্যবস্থাপনা এবং মানহীন খাদ্য ও ওষুধ ব্যবহারের কারণেও মৃত্যুহার বাড়ছে।

মুরগি ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম বলেন, অনেক খামারে রোগে মুরগি মারা যাচ্ছে। ছোট খামারিরা লোকসান দিয়ে ব্যবসা ছাড়ছে। বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ায় দামও কমছে না। গত এক বছরে পোল্ট্রি ফিড, বাচ্চা, ওষুধ, বিদ্যুৎ ও পরিবহন খরচ কয়েক দফা বেড়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও সেই অনুপাতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়েনি। ফলে একদিকে খামারিরা সংকটে, অন্যদিকে ক্রেতারাও পড়েছেন চাপে। আমরাও দাম কমিয়ে বিক্রি করতে পারি না।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. ওমর আলী বলেন, অনিরাপদ উপায়ে সংরক্ষণ করা গিলা-কলিজা বা কাটা অংশ খেলে খাদ্যে বিষক্রিয়া, ডায়রিয়া, পেটের সংক্রমণসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘসময় খোলা পরিবেশে রাখা বা পর্যাপ্ত ঠান্ডা না থাকলে দ্রুত ব্যাকটেরিয়া জন্মানোর আশঙ্কা থাকে।

চামড়া-গিলাতেই মাংসের স্বাদ খুঁজছেন নিম্নবিত্তরা

তিনি বলেন, বাজারে কাটা অংশ বিক্রির ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে অসুস্থ মুরগি জবাই করে বাজারে বিক্রি ঠেকাতে প্রাণিসম্পদ বিভাগ ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের যৌথ তদারকি প্রয়োজন।

আরও পড়ুন
‘মনকে সান্ত্বনা দেই ফসল দিয়েছেন আল্লাহ, নিয়েছেনও তিনি’
চাকা ঘোরে কিন্তু ভাগ্য ফেরে না মৃৎশিল্পীদের

ফতেহ্ আলী বাজার দোকান মালিক সমিতির সভাপতি লেলিন শেখ বলেন, মুরগির খাদ্যের দাম বৃদ্ধি, রোগবালাই আর সরবরাহ সংকট মিলেই এ পরিস্থিতি। এখন অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে নিম্ন আয়ের মানুষের পাত থেকে হয়তো একদিন এ গিলা-কলিজাটুকুও হারিয়ে যাবে।

বগুড়া পুষ্টি বিশেষজ্ঞ জেনিফা জাসিয়া বলেন, নিম্ন আয়ের মানুষ এখন বাধ্য হয়ে মুরগির মূল মাংসের বদলে চামড়া, গিলা-কলিজা কিংবা অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত অংশের ওপর নির্ভর করছেন। এতে শরীর প্রয়োজনীয় মানসম্মত প্রোটিন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিশেষ করে শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও মস্তিষ্কের বিকাশে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

তিনি বলেন, গিলা-কলিজায় কিছু পুষ্টিগুণ থাকলেও অতিরিক্ত চামড়া ও চর্বিযুক্ত অংশ নিয়মিত খাওয়া হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এছাড়া অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সংরক্ষণ করা কাটা অংশ থেকে খাদ্যে বিষক্রিয়া, ডায়রিয়া ও ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের আশঙ্কাও থাকে।

তার মতে, বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কারণ, তারা প্রয়োজনীয় প্রাণিজ প্রোটিনের বিকল্প খুঁজে পাচ্ছে না। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব জনস্বাস্থ্যের ওপরও পড়তে পারে।

এল.বি/কেএইচকে/এএইচ/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।