অনিয়ম-ভুল নিয়ে প্রশ্নে মেজাজ হারালেন খুলনার সিভিল সার্জন
টিকাদানে বড় ধরনের অনিয়ম, দাপ্তরিক চিঠিতে ‘মিথ্যা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার’ লেখার গুরুতর ভুল এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স নবায়নে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগে তোলপাড় চলছে খুলনার সিভিল সার্জন দপ্তরে। এসব ত্রুটি ও দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট প্রশ্নে মেজাজ হারিয়েছেন সিভিল সার্জন ডা. মোছা. মাহফুজা খাতুন; যদিও ঘুষের অভিযোগ অস্বীকার করে চিঠি ও টিকার বিষয়টিকে ‘ভুল’ বলে দাবি করেছেন তিনি।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের চিঠি সূত্রে জানা যায়, গত ১৩ মে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) একটি প্রতিনিধিদল বটিয়াঘাটা উপজেলার ইপিআই স্টোর পরিদর্শনে গিয়ে স্টক রেজিস্টারে একাধিক অসংগতি খুঁজে পায়। প্রায় দুই মাস ধরে স্টক রেজিস্টার হালনাগাদ না করা, ব্যবহৃত ভায়ালের (টিকার শিশি) সঙ্গে তথ্যের গরমিল এবং হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইনের হিসাবেও অসংগতির অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া কোভিড-১৯ এর টাকা ভুয়া ভাউচার করে আত্মসাৎ করারও অভিযোগ রয়েছে সংশ্লিষ্ট মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ইপিআই) জ্যোতির্ময়ীর বিরুদ্ধে।
অভিযোগ অনুযায়ী, কাগজপত্রে ১৩ হাজার ৫০০ জনকে টিকা প্রদানের তথ্য দেখানো হলেও ভায়ালের হিসাবের সঙ্গে তার মিল পাওয়া যায়নি। নথিপত্র অনুযায়ী যেখানে প্রায় ১ হাজার ৪০০ ভায়াল ব্যবহারের কথা, সেখানে সরেজমিনে দেখা যায় মাত্র ৯০০ ভায়াল ব্যবহৃত হয়েছে এবং আরও ৫৮৬ ভায়াল স্টোরে মজুত রয়েছে। এতে প্রায় ৪ হাজার মানুষকে টিকা প্রদানের তথ্য মিথ্যা বলে প্রতীয়মান হয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। এ ঘটনায় সরকারি অর্থ অপচয় ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে রোববার থেকে তিন কর্মদিবসের মধ্যে লিখিত জবাব দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যথায় বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়।
তবে সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে ইস্যু করা এই চিঠি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দাপ্তরিক চিঠির শুরুতে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার’ লেখার আগে টাইপিং ভুলে লেখা হয়েছে ‘মিথ্যা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার’।
এদিকে অন্য একটি অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স নবায়ন বাবদ ‘অফিস খরচ’ হিসেবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিকদের উপজেলাভেদে ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা গুনতে হয়। এই টাকা না দিলে লাইসেন্স নবায়নে নানা ধরনের বাধা-বিপত্তি তৈরি করা হয়। লাইসেন্স নিয়মিত নবায়ন না হওয়ায় সরকার যেমন সময়মতো রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি নামসর্বস্ব কিছু প্রতিষ্ঠানকে কমিশনের বিনিময়ে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত একাধিক অসাধু ব্যক্তি এই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন। এছাড়া সিভিল সার্জনের নিয়মিত ইপিআই কার্যক্রম তদারকি করার কথা থাকলেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধিদল এই অনিয়ম খুঁজে বের করায় সিভিল সার্জনের তদারকি ব্যবস্থার ঘাটতিও দৃশ্যমান হয়েছে।
খুলনা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চিঠিতে ‘মিথ্যা’ শব্দটি লেখা হয়ত ইচ্ছাকৃত ছিল না, এটি ভুলবশত হয়েছে। তবে অনিয়মের বিষয়ে কর্মচারীরা সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে পারেন না, কারণ সিভিল সার্জনের নেতৃত্বেই পুরো দপ্তর চলে। ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স প্রদান বা নবায়নে বাড়তি টাকা নেওয়ার বিষয়ে কর্মচারীদের হস্তক্ষেপ করার কোনো সুযোগ নেই।
ইপিআই টিকায় অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে বটিয়াঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ইপিআই) জ্যোতির্ময়ী বলেন, ‘কাজ করতে গেলে টুকটাক ত্রুটি হয়। টিকাদান কর্মসূচির কাজ ঠিকই হয়েছে, কিন্তু কিছু তথ্য আপডেট করতে পারিনি। খুব শিগগিরই তা করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘স্টকের বিষয়ে স্বাস্থ্য প্রতিনিধিদল যে তথ্য দিয়েছে তা পুরোপুরি সঠিক নয়। আমার ত্রুটি আছে, কিন্তু ভ্যাকসিন তো বাইরে বিক্রি করা হয়নি, ভ্যাকসিন স্টোরেই আছে। সেগুলো পর্যায়ক্রমে দেওয়া হবে। আমাকে সতর্ক না করে হুট করে নোটিশ করা হয়েছে। এমনকি সাংবাদিকদের তথ্য দেওয়া নিয়েও আমাকে অভিযুক্ত করা হচ্ছে, অথচ আমি কোনো দাপ্তরিক চিঠি সাংবাদিকদের দিইনি।’
সার্বিক বিষয়ে খুলনার সিভিল সার্জন ডা. মোছা. মাহফুজা খাতুন বলেন, ‘ইপিআই টিকার মিথ্যা রিপোর্টের কারণে জ্যোতির্ময়ীকে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দেওয়া হয়েছে। আর দাপ্তরিক চিঠির শুরুতে ‘মিথ্যা’ শব্দটি ভুলবশত টাইপ হয়েছে। কিন্তু আমার দপ্তরের একটা চিঠি এত দ্রুত ভুল সংশোধনের আগেই সাংবাদিকদের হাতে কীভাবে গেলো, আমি বুঝলাম না। দপ্তরের চিঠির এই ভুল নিয়ে গতকাল থেকে আমাকে অনবরত উত্তর দিয়ে যেতে হচ্ছে।’
ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি কোনো ঘুষ নিই না। এই অভিযোগ পুরোপুরি মিথ্যা। আমার নাম ভাঙিয়ে হয়ত কেউ এটি করতে পারে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
আরিফুর রহমান/এমএন/এমএস