গম্ভীরা চর্চায় নেই সরকারি বরাদ্দ
গম্ভীরা এখন শুধু গানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, পরিণত হয়েছে সামাজিক আন্দোলনে। রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিকসহ সামাজিক সমস্যা ও তা সমাধানের একটি বিরাট হাতিয়ার। কিন্তু পৃষ্ঠপোষকতা, শিল্পীদের অবমূল্যায়ন ও গম্ভীরা চর্চার বা অনুশীলনের তেমন কোনো ব্যবস্থা না থাকায় আজ তা হারিয়ে যেতে বসেছে।
গবেষকদের তথ্য মতে, মর্তে শিবের গাজন হিসেবে এই গানের উৎপত্তি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদহে। শিবকে উপলক্ষ্য করে সে সময় গম্ভীরা পরিবেশন করা হতো। গম্ভীরা শিবের গাজন হলেও এটি ধর্মীয় গণ্ডির মধ্যে থাকেনি।
ধর্মীয় গণ্ডি পেরিয়ে আধুনিক গম্ভীরা ( বর্তমানে প্রচলিত) গানের প্রবর্তক শেখ সফিউর রহমান সুফি মাস্টার। তিনি শিবের পরিবর্তে নানা-নাতিকে উপস্থাপন করে এই গানকে সার্বজনীন করেছেন। এখানে নানার চরিত্র হচ্ছে অল্প শিক্ষিত কিন্তু সমাজ সচেতন। আর নাতি বোকা প্রকৃতির, কিন্তু তার কথা মিছরির ছুরির মতো। শুনে আনন্দ পাওয়া যাবে কিন্তু অন্তরে আঘাত লাগবে।
জানা গেছে, ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জ মালদহ জেলার একটি থানা ছিল। সে সুবাদে গম্ভীরা চাঁপাইনবাবগঞ্জে পরিবেশিত হতো। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর সুফি মাস্টার চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুরে বসবাস শুরু করেন এবং গম্ভীরা চর্চা করতে থাকেন। সেই সময় গম্ভীরার চর্চা থাকলেও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোনো রূপ পায়নি। শিক্ষ প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন ক্লাব, সমিতিতে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গম্ভীরা গান পরিবেশিত হতো। 
১৯৭৩ সালে নাটোরের উত্তরা গণভবনে এক অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উপস্থিতিতে গম্ভীরা পরিবেশন করেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিল্পী প্রয়াত কুতুবুল আলম, রকিবুদ্দীন ও সহশিল্পীরা। বঙ্গবন্ধু গম্ভীরা শোনার পর সমাজ সচেতনতার হাতিয়ার হিসেবে এ গানের প্রচার ও প্রসারের জন্য রেডিও টেলিভিশনে প্রচারের ব্যবস্থা করেন।
তারপর থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিল্পীরা গম্ভীরা অনুশীলনে আগ্রহী হয় এবং বর্তমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৬/৭টি দল গম্ভীরা গান পরিবেশন করছে। কিন্তু আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে এ দলগুলো কোনো রকমে টিকে রয়েছে।
তাদের অনুশীলনের জন্য স্থায়ী ঠিকানা ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাব রয়েছে। প্রশাসন বা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা মাঝে মধ্যে সহানুভূতি হিসেবে চাল বা গম দিয়ে সহযোগিতা করে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গম্ভীরা দলগুলোকে গান পরিবেশনের জন্য ডাকা হয়।
চাঁপাই গম্ভীরা দলের শিল্পী নানা মাহবুবুল আলম জানান, দেশের বিভিন্ন জেলায় তাদের আঞ্চলিক গানের জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যেমন- রংপুরে ভাওয়াইয়া গানের কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এছাড়াও নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রামে অঞ্চলিক গান চর্চার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু চাঁপাইনবাবগঞ্জে গম্ভীরা চর্চার জন্য কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। কয়েক বছর আগে গম্ভীরা একাডেমি নামে একটি প্রতিষ্ঠান খাতা কলমে হয়েছিল কিন্তু তা বাস্তবে রূপ পায়নি।
তিনি জানান, গম্ভীরা আর আগের মতো নেই। যে প্রতিষ্ঠান গান করতে ডাকে শুধু তাদের গুণের কথা বলতে হয়। তাদের দোষ বা সমালোচনা করা যায় না। এছাড়াও শিল্পীদের সম্মানিও তেমন দেয়া হয় না। অথচ একটি অনুষ্ঠানে নানা-নাতিসহ ৭/৮ জন শিল্পীর প্রয়োজন হয়। কিন্তু সে তুলনায় সম্মানি পাওয়া যায় না।
এসব কারণে গম্ভীরা গানের প্রতি শিল্পীরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। বর্তমানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোতে গম্ভীরা শিল্পীদের না ডেকে ব্যান্ড সঙ্গীতকে প্রধান্য বেশি দিচ্ছে। আবার বিভিন্ন এনজিও তাদের নিজস্ব দল বা শিল্পী দিয়ে নিজেদের মতো করে গান পরিবেশন করছে। যে কারণে গম্ভীরাতার স্বকীয়তা ও মান হারাচ্ছে।
তিনি আরো জানান, গম্ভীরা বাঁচাতে ও গম্ভীরা গানের উৎকর্ষ সাধনে জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রশাসন পৃষ্ঠপোষকতা করলে গম্ভীরা গান সর্বোৎকৃষ্ট একটি গণমাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। অনুশীলন এবং চর্চার জন্য নিজস্ব প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমির সদস্য সচিব ও জেলা সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা মো. ফয়সাল জানান, গম্ভীরা গান চর্চার জন্য প্রতিষ্ঠান তৈরি বা শিল্পীদের আর্থিক সহযোগিতার জন্য সরকারিভাবে কোনো বরাদ্দ নেই। যদি বরাদ্দ পায় তবে এ গান চর্চার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এসএস/এমএস