বাড়ির আঙ্গিনায় ৮ জনের কবর : দাদনে জর্জরিত পরিবারগুলো


প্রকাশিত: ০১:৫০ পিএম, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

বাড়ির আঙ্গিনায় ৮ জনের কবর। পুরো গ্রাম জুড়েই হাহাকার আর আহাজারি। মরার পর কেউ স্বামী, কেউ বা স্বজনদের মুখও দেখতে পারেনি। বাঁশ দিয়ে ঘেরা কবরই একমাত্র সান্ত্বনা এখন তাদের।

এদিকে ঘরে নেই খাবার, নেই সন্তানদের ভবিষ্যত সম্ভাবনা। অপরদিকে দাদন ব্যবসায়ীদের চাপে চিন্তায় পাগল প্রায় স্বজনরা। এ অবস্থা গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার চণ্ডিপুর গ্রাম জুড়ে।

এর মধ্যে কখনও কখনও বুক ফাঁটা কান্নার শব্দে পুড়ো গ্রাম শোকে ভারী হয়ে উঠছে। ছুটে আসেন প্রতিবেশীরা নিহত স্বজনদের সন্ত্বনা দেয়ার জন্য। কিন্তু, কোন সান্তনাই তাদের চোখের পানি থামাতে পারেছে না। তারা কোনো ভাবেই এই ঘটনাকে মেনে নিতে পারছে না।

গত ৬ ফেব্রুয়ারি রাতের আধাঁরে গাইবান্ধার তুলসীঘাট এলাকায় ঢাকাগামী নৈশ্যকোচে পেট্রলবোমা হামলায় দগ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই শিশুসহ চারজন ও পরে হাসপাতালে আরো চারজনের মৃত্যু হয়।

চণ্ডিপুর গ্রামে আগুনে পুড়ে প্রাণ হারানোরা হলেন, সৈয়দ আলী, হালিমা বেগম, সুজন মিয়া, শিল্পী, সুমন মিয়া, সোনাভান, সাজু মিয়া ও আবু কালাম।

ঘটনার নয় দিন পরেও গ্রামটিতে চলছে শোকের মাতম। স্বজনদের আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। পেটে নেই খাবার, নেই কারোও স্বামী, কারোও মেয়ে কারো বাবা। সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তিস্তা নদী সংলগ্ন চণ্ডিপুর গ্রামের ঘরে ঘরে অভাব যেন লেগেই আছে। সারা বছরই করতে হয় অভাবের সঙ্গে যুদ্ধ। ধার-দেনা আর দাদন পরিশোধের জন্য গ্রামের ৩২ জন হতভাগা দিনমজুর কাজের সন্ধানে বাসে উঠেছিল সেইদিন। লক্ষ্য ছিল ঢাকা কিংবা অন্য জেলায় গিয়ে কাজ খুঁজে নেয়া। বাড়িতে বাবা-মা-স্ত্রী-সন্তানরাও স্বপ্ন নিয়ে বসেছিল তাদের পরিবারের কর্তা আয় রোজগার করে ঘরে ফিরবে। পরিশোধ করা হবে ধার দেনা আর দাদন। কিন্তু, তাদের ৮ জনকে বাড়ি ফিরতে হয়েছে পোড়া লাশ হয়ে। অন্যদের কারো গায়ে ক্ষত, কেউ পঙ্গু, কেউবা এখন মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করছে।

নিহতদের মধ্যে একজন সৈয়দ আলী। দাদনের টাকা পরিশোধ করতেই কাজের সন্ধানে ঘটনার দিনে মাত্র তিনশ’ টাকা নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন। গ্রামে কাজ না থাকায় সুদের ওপর টাকা নিয়ে সংসার চালাতে হয়েছে। সৈয়দ আলীর মতো ছিলেন অনেকেই। ইতোমধ্যে দাদন ব্যবসায়ীরা তাদের চাপও দিতে শুরু করেছিল। তাই তারা দেরি না করে বেরিয়ে পড়েছিল কাজের খোঁজে।

কিন্তু, সবার স্বপ্নই পুড়ে গেছে পেট্রল বোমায়। সৈয়দ আলী তার তিন সন্তানসহ ৪ জনের পরিবার এখন দিশেহারা। সরকার যে ১০ হাজার টাকা দিয়েছে তা লাশ দাফন আর দাদন পরিশোধেই ফুরিয়ে গেছে। এখন ছেলে মেয়ে নিয়ে দু’চোখে অন্ধকার দেখছে তার স্ত্রী। শুধু সৈয়দ আলীই নয়, নিহত অন্য সাতজনের পরিবারেও একই পরিস্থিতি। অনিশ্চিত জীবনে কান্না ছাড়া আর কিছুই নেই সামনে তাদের।

পেট্রলের আগুনে মানুষ হত্যাকারীদের বিচার চায় নিহত ও আহতদের স্বজনরা । তারা চায় সরকার এই দরিদ্র মানুষগুলোর সন্তানদের খাওয়া পড়ার সুযোগ করে দিক। রাজনীতির নামে সহিংসতা করে ক্ষমতার রদবদল হয় কিন্তু এই অসহায় খেটে খাওয়া মানুষগুলোর ভাগ্যের কখনই পরিবর্তন হয় না। ভাগ্যের সাথে যুদ্ধ করেই তাদের বেঁচে থাকতে হয়। তাই তাদের বেঁচে থাকার জন্য সামাজিক নিরাপত্তা, সরকারেই কাছেই দাবি করে তারা।

কে ক্ষমতায় গেল, আর কে ক্ষমতায় থাকবে। এ নিয়ে তাদের কোন মাথাব্যথা নেই। তারা চায়, দুবেলা পেটপুড়ে খেয়ে, সুস্থ্য জীবন যাপন করতে।

গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক এহছানে এলাহী জাগোনিউজকে বলেন, নিহত ও আহতদের জন্য অর্থ সহযোগিতা দেয়া হয়েছে। প্রয়োজনে আরও সহযোগিতা দেয়া হবে অগ্নিদগ্ধদের।

পিয়ারুল ইসলাম হুমায়ুন/এমএএস/আরআই




পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।