বিদেশি নাগরিক হিসেবে নাশকতার আশঙ্কায় এলাকাবাসী
শিশু পারভীন আমজেদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। শ্রেণি রোল ৯। বাবার নাম কাদের মাঝি। মা-ভাই-বোন নিয়ে আলীপুরে বেড়িবাঁধের বাইরে লিটন সিকদারের ভাড়া বাসায় থাকে। পারভিন দাদার নাম জানে না। শুধু এইটুকু জানে দাদার বাড়ি কক্সবাজার পুলিশ মাঠ এলাকায়।
একই বক্তব্য ওই স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী তৈয়বার। বাবার নাম রহিম মাঝি। আলীপুরের আবুল খলিফার বাসার ভাড়াটিয়া। শহীদুল বেপারির মেয়ে তৃতীয় শ্রেণির তাছলিমা, দাদার বাড়িঘর কোথায় জানাতে পারেনি। একই কথা ওই শ্রেণির আরেক তাছলিমার। বাবার নাম সৈয়দ আলী বললেও দাদার নাম জানে না। জানে না তাদের বাড়িঘর কোথায়। এভাবে চতুর্থ শ্রেণির শাহীন আলম, পঞ্চম শ্রেণির রহমতউল্লাহ, তৃতীয় শ্রেণির আতাউর রহমান এরা কেউ তাদের দাদার নাম কিংবা বাড়ি কোথায় জানে না। এভাবে প্রায় অর্ধশত শিশু শিক্ষার্থী রয়েছে আমজেদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। যাদের বাব-দাদার বাড়ি কক্সবাজারসহ ওই এলাকার।
স্থানীয় লোকজন এদেরকে রোহিঙ্গা হিসাবে চেনে। কেউ ১০ বছর, কেউ আবার এক যুগ ধরে মৎস্য বন্দর আলীপুরের বেড়িবাঁধের বাইরে বসবাস করছে। অধিকাংশরা ট্রলারের মাঝি। প্রভাবশালী স্থানীয় রাজনীতিকসহ ট্রলার মালিকরা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে জন্ম নিবন্ধন সনদ নিয়ে তাদের সন্তানদের বিভিন্ন স্কুলে ভর্তি হয়ে লেখাপড়া করছে। অনেকে ভোটার হয়ে গেছেন। আলীপুর বন্দরের পশ্চিমদিকের হাতেমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আরও অর্ধশতাধিক শিশু শিক্ষার্থী রয়েছে যাদের সকলের বাড়িঘর কক্সবাজারসহ দুর্গম এলাকার। কারও কারও বাড়ি বার্মায় বলে এদেরকে রোহিঙ্গা বলে স্থানীয়দের কাছে ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, আলীপুর বেড়িবাঁধের বাইরে এদের অধিকাংশের বসবাস। স্থানীয়রা জানান, এরা অনেকে বিভিন্ন স্থান থেকে মাদকের ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন। এরা নিজেদের মধ্যে যখন কথাবার্তা বলে তা স্থানীয়রা বোঝেন না। অধিকাংশ মহিলারা থামি (মেক্সির মতো এক ধরণের নিজস্ব পোষাক) পরিধান করে। রফিক নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে রয়েছে অসংখ্য অভিযোগ। স্থানীয়দের ভাষ্য, ‘রোহিঙ্গা রফিক কোন কাজকর্ম করে না। ঘোরাফেরা করে। বাঁধের স্লোপে সারেংবাড়িতে ভাড়ায় থাকে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে। বেশ আরাম আয়েশেই দিন কাটছে। দুই হাতে প্রচুর টাকা খরচ করে।’
অসংখ্য অভিযোগ, রফিক কোন অপরাধপ্রবণ কাজের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। এদের মধ্যে আবার অনেকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে মানুষের কাছে মুর্তিমান আতঙ্কে পরিণত হয়েছে।
এদের একজন ফজল ওরফে ফজইল্যা। আলীপুর বাজারে বহুবার প্রকাশ্যে সশস্ত্র ধাওয়া পাল্টাধাওয়ায় অংশ নেয়। মাদক, ইয়াবাসহ চোরাচালানের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। কয়েকমাস ধরে ফজইল্যা নিরুদ্দেশ। জনশ্রুতি রয়েছে ফজইল্যার আরেক ভাই করিম অবৈধপথে মালয়েশিয়া চম্পট দিয়েছে। বর্তমানে এরা অবৈধপথে মালয়েশিয়া লোক নেয়ার বাণিজ্যে নেমেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
মৎস্যবন্দর আলীপুরের মানুষের কাছে এসব রোহিঙ্গাদের একটি সমিতির রয়েছে। যার সভাপতি হিসাবে স্থানীয়রা চেনেন, শামসুদ্দিন মাঝিকে। স্থানীয় মাঝি সমিতির সভাপতিসহ জেলেরো স্পষ্ট ভাষায় এদেরকে বার্মাইয়া বলে জানেন। পুলিশসহ সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার আড়ালে কক্সবাজার সীমান্তবর্তী বার্মাসহ তার আশপাশের অন্তত এক শ’ সন্দেহভাজন পরিবার আলীপুর এবং মহিপুরে নির্বিঘ্নে বসবাস করে আসছে। কিন্তু প্রশাসনের কারও কাছে এ সম্পর্কিত কোন তথ্য-উপাত্ত নেই। জেলে পরিচয়ে এরা ট্রলারে অবস্থান করছে। আলীপুর-মহিপুরের প্রভাবশালী কয়েক ট্রলার মালিক এদের নিয়ন্ত্রক। বর্তমানে আবার এদের প্রশাসনিক ঝামেলা এড়াতে পরিবার প্রতি দুই হাজার করে টাকা আদায় করছে আশ্রয়দাতারা।
শামসু মাঝির সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য কয়েকদফা চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু প্রত্যেকবার তিনি সাগরে গেছেন বলে পরিবার থেকে জানানো হয়েছে।
এলাকার একাধিক সূত্রে জানা গেছে, গত একমাসে লতাচাপলী ইউনিয়নের অন্তত চারজন মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। যাদেরকে এ রোহিঙ্গাচক্র মালয়েশিয়া নেয়ার কথা বলে এখন মুক্তিপন দাবি করে আসছে। অভিভাবকরা তার স্বজনদের মুক্তিপণের মাধ্যমে উদ্ধারের জন্য প্রশাসনেরও দ্বারস্থ হচ্ছে না। কুয়াকাটার পাঞ্জুপাড়ার মিরাজ (২৪) প্রায় দুই মাস নিখোঁজ রয়েছে। এখন তার পরিবারের কাছে দুই লাখ টাকা মুক্তিপণ চাওয়া হচ্ছে। এমনকি ওই চক্র বলে দিয়েছে এক লাখ টাকা নগদ পেলে মিরাজের সঙ্গে তার পরিবারের লোকজনের সঙ্গে কথা বলাবে।
একইভাবে মুসল্লীয়াবাদ গ্রামের জাকির মুন্সি নিখোঁজ রয়েছে প্রায় এক মাস। জাকির কুয়াকাটায় চায়ের দোকান করত। জালাল মাঝির ছেলে আল-আমিন ও বাহাদুরকে নিখোঁজ পরিবারের লোকজন এসব ঘটনার জন্য দায়ী করছেন।
এভাবে আলীপুর-মহিপুরে কক্সবাজারসহ তার আশপাশের এলাকা থেকে আসা এ চক্রের সন্তানদের কোন কিছু না জেনে-শুনে কেন স্কুলে ভর্তি করানো হচ্ছে- এমন প্রশ্নের জবাবে আমজেদপুর সঃ প্রাঃ বিঃ শিক্ষক সুলতান মাহমুদ জানান, জন্মনিবন্ধন পত্র নিয়ে হাজির হয়। ফলে তাদের করার কিছুই থাকছে না। বর্তমানে কথিত রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়ায় আলীপুর-মহিপুরের স্থায়ী বাসিন্দারা নাশকতাসহ এই এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং চোরাচালানি কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করছেন। পাশাপাশি মাদকের জমজমাট ব্যবসাও জমে উঠেছে। সেই সঙ্গে অস্ত্রসহ অনেক বড় চালান আসার শঙ্কার কথাও জানালেন অনেকে।
এখানকার জেলেরা বিষয়টি সহজভাবে মেনে নিতে পারছেন না। তাদের দাবি প্রকৃতপক্ষে এরা কোথাকার লোকজন। কী তাদের কর্মকাণ্ড তা উদঘাটন করা জরুরি প্রয়োজন। কারণ ট্রলারযোগে এরা সাগরবক্ষে যাওয়া আসা করছে। প্রভাবশালী, রাতারাতি টাকাকড়ির মালিক বনে যাওয়া ট্রলার মালিকরা এসব মাঝিদের ট্রলারে রাখতে বেশ স্বাচ্ছন্দবোধ করছেন। তাই পর্যটন এলাকার নিরাপত্তার স্বার্থে এদের প্রকৃত পরিচয় এখনই উদঘাটন করা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় অনেক মাঝি এদের ব্যাপারে চাঞ্চল্যকর তথ্যের ইঙ্গিত বহন করলেও সরাসরি মুখ খোলেনি।
লতাচাপলী ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নুর সায়েদ ফকির জানান, বার্মাইয়া রেহিঙ্গাদের এখানকার আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয় সাবেক চেয়ারম্যান। তখন এদের সন্তানদের জন্মনিবন্ধন দেয়া হয়েছে।
সাবেক চেয়ারম্যান বারেক মোল্লা এসব অস্বীকার করে জানান, মূলত এরা কক্সবাজার, মহেশখালী, টেকনাফ, ফটিকছড়ি এলাকার বাসীন্দা। ট্রলার শ্রমিক হিসাবে এই এলাকায় এরা কাজ-কর্ম করে খায়। সবাই গরিব মানুষ।
কলাপাড়া থানার ওসি মোহাঃ আজিজুর রহমান জানান, এদের ব্যাপারে খোঁজ-খবর নেয়া হচ্ছে। কেউ যদি বহিরাগত থাকে তাহলে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এমজেড/পিআর