ভালো নেই আশুগঞ্জের চাতাল শ্রমিকরা


প্রকাশিত: ০১:০৬ পিএম, ১৯ এপ্রিল ২০১৫

ভালো নেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জের চাতাল শ্রমিকরা। নাগরিক সুযোগ-সুবিধার অনেক কিছু থেকেই বঞ্চিত আশুগঞ্জের সাড়ে ৪শ চাতালকলের ১৫ হাজারেরও বেশি শ্রমিক। যুগের পর যুগ ধরে তারা মানবেতর জীবন-যাপন করে আসছেন।

পাশাপাশি বছর বছর দাদন নিয়ে ঋণের ভারে নুয়ে পড়ছেন শ্রমিকরা। এসব শ্রমিকদের দুঃখ গাঁথা নিয়ে গণমাধ্যমে একাধিকবার লেখালেখি হলেও কিছুতেই দিন পাল্টাচ্ছে না তাদের। অনেকেই অসহায় ও দুর্বিসহ এই জীবন থেকে মুক্তি চান, কিন্তু মুক্তির পথটাই যেন আটকে রেখেছেন মিল মালিক ও দাদন ব্যবসায়ীরা।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক সংলগ্ন আশুগঞ্জের সোনারামপুরের এম.আর অটো রাইস মিল নামের একটি চাতালকলে কাজ করেন সাবিরুন্নেছা (২৫)। নাগরিক সভ্যতা আর জীবন-জীবিকার টানে সাবিরুন্নেছার সাথে তার মায়ের দূরত্ব প্রায় ২০০ কিলোমিটার। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে মায়ের মুখ না দেখা সাবিরুন্নেছার কাছে তার মায়ের আদর, ঘুমপাড়ানি গান আর ভালোবাসার রঙিন স্মৃতিগুলো এখন শুধুই ফ্রেমেবন্দি সাদাকালো অতিত।

আলাপচারিতায় সাবিরুন্নেছা জাগো নিউজকে বলেন, তার বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলার শাল্লা উপজেলার কাশিপুর গ্রামের নোয়াগাঁও এলাকায়। বাবা হারা সাবিরুন্নেছার পরিবারে মা ও তিন বোন রয়েছেন। পরিবারের অভাব-অনটন আর জীবিকার তাগিদে গত ৪-৫ বছর আগে আশুগঞ্জে এসে চাতাল শ্রমিক বনে যান তিনি। স্বামী রায়হান তাকে ছেড়ে হাত ধরেছেন অন্য নারীর, আর তাই একমাত্র মেয়ে ফারজানাকে (০৪) নিয়ে এখন অনেকটা মানবেতর দিন-যাপন করছেন সাবিরুন্নেছা।

তিনি বলেন, একজন চাতাল সর্দারের অধীনে থেকে তারা রোদে ধান শুকিয়ে, ধান ভাঙানো ও চাল তৈরি করে বস্তা বোঝাইয়ের কাজ করে থাকেন। হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে এক মাঠ ভর্তি ধান রোদে শুকিয়ে ও সেদ্ধ করে চাল তৈরি এবং তা বস্তা বোঝাই করার পর চাতাল সর্দারের মাধ্যমে মিল মালিক তাদেরকে জনপ্রতি ৬০ টাকা মজুরি দেন।

আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এক মাঠ ধান শুকাতে দুই থেকে তিন দিন সময় লাগে আর আবহাওয়া প্রতিকূলে থাকলে আরও বেশিদিন সময় লাগে ধান শুকাতে। মজুরি এছাড়া প্রতি ১শ মণ ধানে সকল শ্রমিকদের ২৮ কেজি চাল দেওয়া হয়, আর বাড়তি হিসেবে মিল মালিকদের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের নামমাত্র বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। মৌলিক অধিকার হলেও এখানকার অনেক শ্রমিকই টাকার অভাবে ঠিকমত স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন না।

সামান্য মজুরি আর কিছু চাল দিয়ে কিভাবে চলে আপনাদের জীবন- এমন প্রশ্নের জবাবে সাবিরুন্নেছা বলেন, গরিব হয়ে জন্মেছিলাম বলেই আজ আমাদের এত কষ্ট করে বাঁচতে হচ্ছে। শত কষ্ট হলেও দাদনের যে টাকা ঋণ নিয়েছি সেই টাকা শোধ দিতে আমাদের এই কাজ করতে হচ্ছে। এতো পরিশ্রম করার পরও দাদনের টাকা শোধ দিতে পারছেন না তারা।

আরেক চাতাল শ্রমিক মো. রাসেল মিয়ার (২২) সাথে কথা হলে তিনি জাগোনিউজকে বলেন, তার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল উপজেলার জৈদরকান্দি এলাকায়। রাসেল তার ছোট ভাইকে নিয়ে এই চাতালকলে কাজ করেন। তারাও পরিবারের অভাব অনটনের কারণে এই চাতালকলে কাজ করছেন। কিন্তু তারা এই দুর্বিসহ জীবন থেকে মুক্তি চান। কিন্তু মুক্তির সেই পথটাকে আটকে রেখেছেন মিল মালিক ও দাদন ব্যবসায়ীরা।

সাবিরুন্নেছা ও রাসেলদের মতো বাকি চাতাল শ্রমিকদেরও একই অবস্থা। দাদন ব্যবসায়ী ও মিল মালিকদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে অনেকেই জিম্মি হয়ে পড়ায় ইচ্ছে করলেও এখন তারা এই কাজ ছাড়তে পারছেন না।

এসব ব্যাপারে জানতে চাইলে জেলা চাতালকল মালিক সমিতির সভাপতি মাহবুবুর রহমান জাগোনিউজকে বলেন, শ্রমিকদের জিম্মি করে রাখার অভিযোগটি সঠিক নয়। তারা ইচ্ছে করলেই ঋণের টাকা শোধ দিয়ে এখান থেকে চলে যেতে পারেন। তাছাড়া আমাদের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের উন্নয়নে যথেষ্ট সহযোগিতা করা হয়।

এমএএস/আরআইপি

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।