বিদ্যুৎহীন চরে মোমবাতির আলোয় ইফতার-সেহেরি
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার মেঘনা নদীর বুক চিরে জেগে ওঠা ‘চর’ চরসোনামপুর গ্রামটি এখনো বিদ্যুৎহীন অবস্থায় পড়ে রয়েছে। নদীর ওপারেই আশুগঞ্জ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অবস্থান অথচ চরের এ গ্রামটি এখনো অন্ধাকারে আচ্ছন্ন। পবিত্র রমজান মাসেও মোমবাতি জ্বালিয়ে ইফতার ও সেহেরি খেতে হচ্ছে চরের মুসলিম বাসিন্দাদের। পাশাপাশি বিদ্যুৎ সুবিধা না থাকায় এখানকার শিক্ষার্থীদেরকেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকার কারণে যুগের পর যুগ ধরে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন চরে বসবাসকারীরা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রায় শত বছর পূর্বে মেঘনা নদীর বুক চিরে জেগে উঠে একটি চর। আশুগঞ্জ সদর ইউনিয়নের অন্তর্ভূক্ত এ চরটির নামকরণ করা হয় চরসোনারামপুর। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে চরসোনারাপুর গ্রামের বাসিন্দাদের সংখ্যা। বর্তমানে এ গ্রামটিতে কয়েক হাজার হিন্দু-মুসলমান একত্রে বসবাস করছেন।
এখানকার বাসিন্দাদের সিংহভাগই জেলে, তাদের জীবন-জীবিকা সবই মেঘনা নদীকে ঘিরে। খুব সকালে উঠে নদীতে জাল ফেলে মাছ ধরা, এরপর এসব মাছ আশুগঞ্জ বাজারে নিয়ে বিক্রি করেই চলে তাদের জীবন। সদর ইউনিয়নের অন্তর্ভূক্ত হলেও এখনো পর্যন্ত বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি চরসোনারামপুর গ্রামে। অথচ চরের এ গ্রামটিতে বিদ্যুতের টাওয়ার বসিয়ে আশুগঞ্জ বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত ১৩২ কেভি গ্রীড লাইনের মাধ্যমে সারাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে।

বর্তমানে চরসোনামপুর গ্রামে প্রায় ১৪শ ভোটার রয়েছেন। প্রতিবার নির্বাচন এলেই প্রার্থীদের কাছে এসব ভোটারদের কদর বাড়ে। তবে এ কদর খুব বেশিদিন থাকে না। নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে জনপ্রতিনিধিরা বিত্তশালী হন ঠিকই, শুধু বদলায় না চরের অবহেলিত এসব মানুষের জীবনযাত্রার চিত্র।
চরসোনামপুরবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি চরের ভাঙন রোধে বাঁধ নির্মাণ ও বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা। বছরের পর বছর পেরোলেও এখনো পর্যন্ত তাদের সে দাবি পূরণ করতে পারেনি কোনো সরকারই। প্রতিবারই আশ্বাস মিলে, ঘরে আসবে বিদ্যুৎ সঙ্গে ভাঙন রোধে নির্মিত হবে বাঁধ। চরের মানুষগুলো সেই আশ্বাসে আশায় বুক বাঁধেন। কিন্তু দিন যায়, মাস যায় সঙ্গে বছরও, অথচ ঘরে বিদ্যুৎ আসে না বাঁধও নির্মাণ হয় না।
অবশ্য সরকারের আশায় না থেকে চরের বাসিন্দাদের অনেকেই এখন নিজ উদ্যোগে সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থা করেছেন। চরবাসীর এ আত্মপ্রয়াস অনেকটা দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতোই।
চরসোনারামপুর গ্রামের গৃহবধূ সূরাইয়া বেগম জাগো নিউজকে বলেন, গত কয়েকদিন ধরেই টানা বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এতে করে সোলার প্যানেলে চার্জ হচ্ছে কম। চার্জ কম থাকায় পাখা চালানোর জন্য বাতি কিংবা বাতি জ্বালানোর জন্য পাখা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। রোজার মাসেও আমাদের মোমবাতি জ্বালিয়ে ইফতার-সেহেরি খেতে হচ্ছে। বিদ্যুতের কারণে ছেলে-মেয়েরা ঠিকমতো লেখাপড়াও করতে পারছে না।

চরের আরেক বাসিন্দা মো. আনোয়ার জাগো নিউজের কাছে আক্ষেপ করে বলেন, দেশের অনেক প্রত্যন্ত এলাকায় বিদ্যুৎ রয়েছে অথচ আমাদের চরসোনারামপুর গ্রামে বিদ্যুৎ নেই। বর্তমান সরকারের আমলে আমাদের মোমবাতি-হারিকেন জ্বালিয়ে ইফতার-সেহেরি খেতে হচ্ছে।
চরসোনারামপুর গ্রামের বৃদ্ধ সুভাষ চন্দ্র দাস জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের আশুগঞ্জ উপজেলায় এত বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় অথচ আমরাই বিদ্যুৎহীন অবস্থা পড়ে আছি। আমাদের কষ্ট কোনো সরকারের চোখে পড়ে না। নির্বাচন এলে প্রার্থীরা কত প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু নদী পার হয়ে শহরে গেলেই প্রার্থীরা তাদের প্রতিশ্রুতির কথা ভুলে যান।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল ও আশুগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাড. জিয়াউল হক মৃধা জাগো নিউজকে বলেন, সারাদেশে বিদ্যুতের উন্নয়নকে পরিহাস করছে চরসোনারামপুর গ্রাম। আমি সংসদে বক্তৃতা ও প্রশ্নোত্তর পর্বে চরসোনারামপুর গ্রামকে বিদ্যুতায়িত করার জন্য একাধিকবার বলেছি। বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গেও কথা বলেছি, নদীর তলদেশ দিয়ে সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া সম্ভব না হলে চরের জাতীয় গ্রীড লাইনের টাওয়ার থেকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করার জন্য বলেছি।
তবে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের আশুগঞ্জ বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী চন্দন কুমার সূত্রধর জাগো নিউজকে বলেন, নদীর মাঝখানে হওয়ায় চরসোনারামপুর গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া যাচ্ছে না। এখানে বিদ্যুৎ পৌঁছানোর কোনো পদ্ধতি আপাতত আমাদের কাছে নেই।
এফএ/এমএস