ওভার প্রেসারে চালানোর কারণেই বয়লারের বিস্ফোরণ
গাজীপুরে মাল্টি ফ্যাবস কারখানার বয়লারটি ওভার প্রেসারে চালানোর কারণেই বিস্ফোরণ ঘটে থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন বয়লার পরিদর্শক মো. হানিফ হোসেন।
তিনি মঙ্গলবার গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের কাশিমপুরের নয়াপাড়া এলাকায় বিধ্বস্ত মাল্টি ফ্যাবস কারখানা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এ কথা জানান।
তিনি আরও জানান, তবে বয়লারের সেফটি বাল্ব পরীক্ষার পর বুঝা যাবে বয়লার বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ। ওই কারখানার বয়লারের জন্য অনুমোদিত লোড ছিল ১০ বার। গত বছর এ বয়লারটি পরীক্ষা করা হয়। যার মেয়াদ এ বছরের ২৪ জুন শেষ হয়েছে।
এদিকে সোমবার সন্ধ্যায় মাল্টি ফ্যাবস লিমিটেড নামের পোশাক কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণের ঘটনায় রাতে ৯ জনের মরদেহ উদ্ধারের পর মঙ্গলবার সকালে আরও একজনের এবং বিকেলে তিনজনের লাশ উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। এনিয়ে এ দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ১৩-তে দাঁড়ালো। নিখোঁজ রয়েছে দুই জন।
গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মাহমুদ হাসান জানান, ১০টি মরদেহের মধ্যে সবার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর মধ্যে সোমবার রাতে ৪ জনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বাকি মরদেহগুলো মঙ্গলবার বিকেলে পরিবারের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বিকেলে উদ্ধার করা মরদেহগুলো গাজীপুরে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
নিহতরা হলেন, বগুড়ার সোনাতলা উপজেলার নামাজখালী গ্রামের শাহার আলীর ছেলে মাহবুবুর রহমান (২৩), চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার বামনসুন্দর গ্রামের মৃত মোকছেদ আহমেদের ছেলে আব্দুস সালাম (৫৫), চাঁদপুর সদরের মদনা গ্রামের বাচ্চু ছৈয়ালের ছেলে গিয়াস উদ্দিন (৩০), মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার গোবরা গ্রামের আইয়ুব আলী সরদারের ছেলে আল আমিন (৩০), রাজবাড়ির গোয়ালন্দ উপজেলার বরাট বাজার এলাকার মনিন্দনাথের ছেলে বিপ্লব চন্দ্র শীল (৩৮), ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসির নগর উপজেলার কুন্ডা গ্রামের সাগর আলী মীরের ছেলে মজিবুর রহমান (৩৭), চট্টগ্রামের কাটাছড়া বঙ্গনূর এলাকার লুৎফুল হকের ছেলে মুনসুরুল হক (৩৫), চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ইছাখালী গ্রামের মৃত নূরুল মোস্তফা চৌধুরীর ছেলে আরশাদ হোসেন (৪০), নওগাঁ সদরের চরকরামপুর এলাকার আজিজুল হকের ছেলে আমিরুজ্জামান (৩৫) ও পটুয়াখালী বাউফল উপজেলার ইন্দ্রকোল গ্রামের কাশেম ফরাজীর ছেলে মাসুদ রানা (৩৫)।
এছাড়া গাইবান্দার পলাশবাড়ি উপজেলার মরিয়া গ্রামের মৃত মো. লিয়াকত আলীর ছেলে সোলেমান মিয়া (৩০) ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে মারা যায়। সেখানে কামরুল ইসলাম (৩২) নামের আহত একজন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
আশেপাশের ১০টি কারখানায় ১দিনের ছুটি
গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশের পরিদর্শক আব্দুল খালেক জানান, সোমবার রাতে দুর্ঘটনার পর মঙ্গলবার সকালে কর্তৃপক্ষ অনির্দিষ্টকালের জন্য কারখানা বন্ধ করে ফটকে নোটিশ টানিয়ে দিয়েছে। এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ওই কারখানার পাশের কটন ক্লাব, ইসলাম নীট ওয়্যার, আলিম ফ্যাশন লিমিটেড, ডেল্টা ফ্যাশন, মাস্কো লিমিটেডসহ ১০টি কারখানা মঙ্গলবারের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
মালিক পক্ষের বক্তব্য
কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মহিউদ্দিন ফারুকী জানান, কারখানাটির বয়লারটি মেয়াদ উত্তীর্ণ ছিল না। গত ১৯ জুন নবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছে। এটি একটি দুর্ঘটনা মাত্র।
তিনি আরও জানান, নিহতের প্রতিটি পরিবারকে নগদ ৩ লাখ টাকা এবং পরিবারের সদস্যদের মধ্যে থেকে একজনকে চাকরি দেয়া হবে। আর আহত সব শ্রমিকের চিকিৎসা ব্যয় কারখানা কর্তৃপক্ষ বহন করবে।
নিখোঁজ দুই শ্রমিক
মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত মাল্টি ফ্যাবস কারখানার দুই শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছে এর মধ্যে নজরুল ইসলাম (৩৫) ওই কারখানার মেকানিক্যাল ফিডার পদে চাকরি করতেন।
তার ছোট ভাই নাজমুল ইসলাম জানান, তিন সন্তানের জনক নজরুল তিন বছর ধরে এ কারখানায় চাকরি করছেন। ঘটনার দিন সোমবার তিনি কারখানায় ছিলেন। এ ঈদেও তিনি গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধায় যাননি। তিনি কাশিমপুরের মোল্লা মার্কেট এলাকায় ভাড়া থাকেন। চার ভাইয়ের মধ্যে নজরুল সবার বড়।
নিখোঁজ এরশাদ উল্ল্যা ওই করাখানার ইলেক্ট্রিশিয়ান পদে চাকরি করতেন। দুর্ঘটনার দিন তিনি কারখানায় আসেন। তার ভাই আব্দুল্লাহ জানান, ১২ বছর ধরে এ কারখানায় চাকরি করেন এরশাদ। চার মাস আগে তিনি বিয়ে করেছেন। ঈদের ছুটি শেষে স্ত্রীকে নিয়ে তিনি গাজীপুরের কাশিমপুরে আসেন। তিন ভাইয়ের মধ্যে এরশাদ সবার বড়।
উল্লেখ্য, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের কাশিমপুর নয়াপাড়া এলাকার মাল্টি ফ্যাবস লিমিটেড পোশাক কারখানার বয়লার বিস্ফোরণ হয়ে ১২ জন নিহত ও অর্ধশতাধিক আহত হয়।
আমিনুল ইসলাম/এমএএস/এমএস