বরগুনায় নবীন-প্রবীণ মিলে চলছে গণসংযোগ
পাওয়া না পাওয়া আর অভ্যন্তরীণ মেরুকরণ নিয়ে বরগুনার আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে রয়েছে নানামুখী সমস্যা ও সমন্বয়হীনতা। তার উপরে নতুন করে যোগ হয়েছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে মনোনয়ন চাওয়া পাওয়া নিয়ে নবীন ও প্রবীণদের দৌড়ঝাঁপ।
জেলার জন্মলগ্ন থেকে বরগুনাতে তিনটি সংসদীয় আসন বিদ্যমান থাকলেও বর্তমানে বরগুনায় মোট সংসদীয় আসন দুটি। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় বরগুনা-৩ (আমতলী-তালতলী) আসনকে বিলুপ্ত করে জেলায় মোট দুটি সংসদীয় আসন করা হয়।
বরগুনা সদর, আমলী ও তালতলী নিয়ে গঠন করা হয় বরগুনা-০১ আসন। অন্যদিক বেতাগী, বামনা ও পাথরঘাটা নিয়ে গঠন করা হয় বরগুনা-০২ আসন।
যদিও বরগুনার আমতলী-তালতলী সংসদীয় আসনকে পূর্ণবহাল করার দাবিতে আন্দোলন করে আসছে ওই দুই উপজেলার সাধারণ মানুষ।
বরগুনা-০১ আসন (বরগুনা সদর, আমতলী, তালতলী) : এ যাবৎকালে বাংলাদেশে যতগুলো সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, প্রতিটি নির্বাচনেই আওয়ামী লীগ প্রার্থী অথবা আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন এই আসনে। তাই আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত বরগুনা-০১ আসনকে ধরে রাখতে সব ধরনের প্রষ্টো চালিয়ে যাচ্ছেন দলটির নেতা-কর্মীরা। অন্যদিকে বিএনপিও এই আসনটিতে একক প্রার্থী নিশ্চিত করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
এ আসনে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীরা হলেন, অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু, আলহাজ মো. জাহাঙ্গীর কবীর, গোলাম সরোয়ার ফোরকান, অ্যাডভোকেট কামরুল আহসান মহারাজ, গোলাম সরোয়ার টুকু ও মশিউর রহমান সিহাব।
এর মধ্যে অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু জেলা আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের সভাপতি ও বর্তমান সংসদ সদস্য। টানা ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি তিনি। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে পাঁচবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে চারবার (১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪) সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে একবার উপমন্ত্রীও হয়েছেন তিনি।
আলহাজ মো. জাহাঙ্গীর কবীর জেলা আওয়ামী লীগের সুদীর্ঘ বছরের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক জেলা পরিষদ প্রশাসক ছিলেন।
২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তৎকালীন বরগুনা-০৩ আসন (তালতলী-আমতলী) থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তখন বিএনপি সরকার গঠনের পর এই আসনের উপ-নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন গোলাম সরোয়ার ফোরকান। তবে তিনি এ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন।
অ্যাডভোকেট কামরুল আহসান মহারাজ জেলা যুবলীগের সভাপতি ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক। সর্বশেষ পৌর নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেয়েও ‘ওপেন সিক্রেট চক্রান্তের’ কারণে হেরে যান তিনি। নির্বাচনের দিন সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন তিনিসহ একাধিক নেতাকর্মী। এ ঘটনা জেলা আওয়ামী লীগের গণ্ডি পেরিয়ে যা কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগেও ব্যাপক আলোচনার সূত্রপাত ঘটায়।
গোলাম সরোয়ার টুকু বরগুনা জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি, বরগুনা সরকারি কলেজের সাবেক ভিপি, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক। তাকে নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে স্বপ্ন দেখছেন তৃণমূল আওয়ামী লীগের একটি অংশ। তাই এবারের নির্বাচনে তিনিও রয়েছেন সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে।
সম্প্রতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাঝে দান অনুদান আর সাহায্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে জেলা আওয়ামী লীগের মনোনয়ন যুদ্ধের তালিকায় নাম উঠে এসেছে জেলা আওয়ামী লীগের অপর আরেক তরুণ নেতা ও ধনাঢ্য ব্যবসায়ী মশিউর রহমান সিহাবের।
এ আসনে বিএনপির সম্ভাব্য ৪ জন মনোনয়ন প্রত্যাশী রয়েছেন। এর মধ্যে মতিয়ার রহমান তালুকদার অন্যতম। তিনি জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও বিএনপি-জাতীয় পার্টি থেকে একাধিকবার নির্বাচিত সাবেক সংসদ সদস্য।
মাহবুবুল আলম ফারুক মোল্লার বরগুনা জেলা বিএনপিরর সুদীর্ঘ বছরের সভাপতি ছিলেন। তিনি রয়েছেন মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে।
আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী হলেন, ফিরোজ উজ জামান মামুন। এছাড়া মনোনয়ন পেলে নির্বাচনে অংশ নেয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি মো. নজরুল ইসলাম মোল্লা।
অপরদিকে এ আসনে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক শাহজাহান মনসুর আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে বরগুনায় তার নির্বাচনী গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।
বরগুনা-০২ আসনের আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী হলেন, সাবেক সংসদ সদস্য ও পাথরঘাটা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শওকত হাচানুর রহমান রিমন। ২০১৩ সালের ২৬ জুলাই মর্মান্তিক এক সড়ক দুর্ঘটনায় বরগুনা-০২ আসনের সংসদ সদস্য বিশিষ্ট শিল্পপতি গোলাম সবুর টুলুর মৃত্যুর পর উপনির্বাচনে অংশ নিয়ে নির্বাচিত হন তিনি।
তবে এবার সাবেক সংসদ সদস্য বিশিষ্ট শিল্পপতি গোলাম সবুর টুলুর জ্যেষ্ঠ কন্যা জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ফারজানা সবুর রুমকীও রয়েছেন মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে।
সম্প্রতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাঝে দান অনুদান আর সাহায্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে জেলা আওয়ামী লীগের মনোনয়ন যুদ্ধের তালিকায় নাম উঠে এসেছে কেন্দ্রীয় যুবলীগের অর্থ বিষয়ক সম্পাদক সুভাস চন্দ্র হাওলাদারের। মনোনয়ন পেতে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে মাঠে ময়দানে তৃণমূল নেতাকর্মী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাঝে নিয়মিত সাহায্য সহযোগিতা দিয়ে আসছেন তিনি।
এছাড়াও বরগুনা পৌরসভার বর্তমান মেয়র ধনাঢ্য ব্যবসায়ী মো. শাহাদাত হোসেনও বরগুনা ২ আসনের সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে যাকেই মনোনয়ন দেয়া হোক না কেন একজোট হয়ে সবাই তার পক্ষেই মাঠে নামবেন এমনটাই ব্যাক্ত করেছেন সবাই।
এ আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হলেন অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট ব্যার অ্যাসোসিয়েশনের একাধিক বার নির্বচিত সভাপতি।
এছাড়াও বরগুনা জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও এই আসন থেকে একাধিকবার নির্বাচিত সাবেক সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম মনিও রয়েছেন সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে।
একই সঙ্গে জিয়া শিশু একাডেমির মহাসচিব বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা মো. হুমায়ুন কবীর এবং বেতাগী উপজেলা চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান কবীরের নাম আলোচনায় রয়েছে। তবে, এ আসনের ‘ক্যারিশম্যাটিক নেতা’ হিসেবে পরিচিত তিন তিনবার নির্বাচিত সাবেক সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম মনির পরিকল্পনায় নতুন কোনো ঘটনা ঘটে যেতে পারে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্ট অনেকেই।
অন্যদিকে বরগুনা ২ আসনে বিভিন্ন সময়ে দল বদলিয়ে একাধিকবার সংসদ সদস্য হওয়ার রেকর্ড রয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলনের বর্তমান নেতা গোলাম সরোয়ার হিরুর। তাই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলনের হয়ে মনোনয়ন পেতে পারেন তিনি।
সাইফুল ইসলাম মিরাজ/এমএএস/এমএস