স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বসে অঝোরে কাঁদলেন অন্তঃসত্ত্বা
ঝালকাঠি সদর উপজেলার প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরত্বের পরমহল গ্রাম থেকে মাতৃত্বকালীন সেবা নেয়ার জন্য সোমবার সকাল ১০টায় মা ও শিশু কল্যাণকেন্দ্রে আসেন ৬ মাসের অন্তঃসত্ত্বা শিল্পী বেগম (২৫)।
সকালে এসে চিকিৎসক জোয়াহের আলীর সঙ্গে দেখা করলে তিনি কয়েকটি টেস্ট (পরীক্ষা) করতে দেন। টেস্ট রিপোর্ট নিয়ে ফিরে আসেন দুপুর দেড়টায়। এসে দেখেন চিকৎসক নেই।
উপায় না পেয়ে অপেক্ষমান বেঞ্চে বসে অপেক্ষা করতে থাকেন এই অন্তঃসত্ত্বা। বিকেল ৩টা পর্যন্ত চিকিৎসক কর্মস্থলে না ফেরায় কষ্ট সহ্য করতে না পেরে অঝোরে কাঁদছিলেন। তার সঙ্গে থাকা মা আছিয়া বেগম মেয়ের কান্না সইতে না পেরে চিকিৎসকের মুঠোফোনে কল দেন।
এ সময় চিকিৎসক অপর প্রান্ত থেকে বলেন, আমি বাইরে কাজে আছি। সন্ধ্যায় ফিরবো। আপনারা অপেক্ষা করেন। সোমবার দুপুর দেড়টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত এমন চিত্র দেখা গেছে ঝালকাঠি মা ও শিশু কল্যাণকেন্দ্রে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, দরিদ্র মা ও শিশুদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেয়ার কথা থাকলেও এখানে টাকা ছাড়া কোনো সেবাই পাচ্ছেন না রোগীরা।
চিকিৎসক, নার্স, এফডব্লিউভি ও আয়া মিলে একটি সিন্ডিকেট তৈরি করে জোর করে অর্থ আদায় করছেন বলে অভিযোগ রোগীদের।
রোগীরা বলেন, ঝালকাঠি মা ও শিশু কল্যাণকেন্দ্রের চিকিৎসক ডা. জোয়াহের আলী, ভিজিটর জেসমিন নাহার, লক্ষ্মী রানি সিকদার, মনিকা মিস্ত্রি, মনিরা সুলতানা, পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শিকা জুলিয়ারা জেসমিন ও আয়া মিলে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গঠন করে এ অর্থ আদায় করছেন।
ভান্ডারিয়া উপজেলার হরিণপালা গ্রাম থেকে গত ৯ নভেম্বর সকাল ১০টায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. দেলোয়ার হোসেন তার মেয়ে ফাতেমাকে নিয়ে এখানে আসেন সন্তান ডেলিভারির করানোর জন্য।
চিকিৎসক জোয়াহের আলী অন্তঃসত্ত্বাকে দেখে বলেন, নরমাল ডেলিভারি হবে না। সিজারিয়ান অপারেশন করতে হবে। সিজারিয়ান অপারেশন করতে কিছু খরচ আছে বলে জানান পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শিকা জুলিয়ারা জেসমিন।
পরে ৫ হাজার টাকায় চুক্তি হয়। বিকেল ৫টায় অপারেশন সম্পন্ন হয়। অপারেশনের পর ৩ হাজার টাকার ওষুধ কিনতে হয় রোগীর স্বজনদের।
গত ১১ নভেম্বর দুপুরে কর্তব্যরত নার্সরা জানিয়ে দেন, আপনাদের সময় শেষ। টাকা দিয়ে রোগী নিয়ে যান। এ সময় চুক্তির ৫ হাজার টাকা থেকে ১ হাজার টাকা কম দিতে চাইলে জুলিয়ারা জেসমিন দুর্ব্যবহার করেন বলেও অভিযোগ করেন শিক্ষক মো. দেলোয়ার হোসেন।
শহরতলীর ইছানীল এলাকা থেকে শ্রমজীবী আ. রহিম তার বোন ফাতেমা আক্তারকে গত ১৪ নভেম্বর নিয়ে আসেন নরমাল ডেলিভারি করানোর জন্য। ডেলিভারি শেষে খরচ ও মিষ্টি খাওয়ার কথা বলে ৩ হাজার টাকা দাবি করা হয়। অনেক অনুরোধ করলে ১২০০ টাকা রাখা হয়।
নলছিটি উপজেলার কুলকাঠি গ্রামের মোস্তাফিজুর রহমান রুবেল তার স্ত্রী খাতুনে জান্নাত শেফাকে গত ৪ নভেম্বর নিয়ে আসেন নরমাল ডেলিভারি করানোর জন্য।
জুলিয়ারা জেসমিন তার নিকটাত্মীয় বিধায় মানসম্মত সেবা পাবার আশায় এসেছিলেন মা ও শিশু কল্যাণকেন্দ্রে। রুবেল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কত টাকা নিয়েছে তা বললে তো আর ফেরত পাব না। তবে আমার সঙ্গে যা করা হয়েছে তা ডাকাতি। আমি আল্লাহর কাছে বিচার চাই, তিনি যেন এই জালিমদের বিচার করেন।
এছাড়া এখানে সর্বনিম্ন চার্জে এমআর ১ হাজার টাকা, ডিএনসি ২ হাজার টাকা, প্রশ্রাব পরীক্ষা ৫০ টাকা, নরমাল ডেলিভারি ২ হাজার টাকা এবং সিজারিয়ান অপারেশন করতে ৫ হাজার টাকা চুক্তি করে নেয়া হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে রোগী ফেরত দেয়ার ভয় দেখানো হয়।
সোমবার দুপুর দেড়টায় মা ও শিশু কল্যাণকেন্দ্রে গেলে কোনো চিকিৎসককে পাওয়া যায়নি। তখন সেখানে ছিলেন ঝালকাঠির ভিজিটর জেসমিন নাহার, লক্ষ্মী রানি সিকদার ও মনিকা মিস্ত্রি।
তাদের সঙ্গে কথা বলে রোগী ও স্বজনদের দেয়া তথ্যের সত্যতা স্বীকার করলেও টাকা আদায়ের বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করেন তারা।
তারা বলেন, আমরা রোগীর কাছ থেকে জোর করে টাকা নেই না। সন্তান হওয়ার পর অথবা আমাদের কাজে খুশি হয়ে যদি কেউ মিষ্টি খেতে টাকা দেয় তাহলে নেই।
এ সময় জুলিয়ারা জেসমিনকে এখানে খুঁজে না পেয়ে তাদের কাছে জিজ্ঞাসা করলে কোনো সদুত্তর না দিয়ে তারা বলেন, কোথায় গেছে তা আমরা জানি না।
এসব বিষয়ে জানতে চিকিৎসক জোয়াহের আলীর মুঠোফোনে কল দিলে তিনি বলেন, আমি একটু জরুরি কাজে বাইরে আসছি। সন্ধ্যার দিকে ফিরবো।
বেলা ২টার আগে বাইরের কাজটা কি বেশি জরুরি ছিল জানতে চাইলে চিকিৎসক জোয়াহের আলী কোনো উত্তর না দিয়ে লাইন কেটে ফোন বন্ধ করে দেন।
মো. আতিকুর রহমান/এএম/আরআইপি