পাহাড়ি ফুলঝাড়ু বিক্রি করে চলে সহস্রাধিক পরিবার

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি খাগড়াছড়ি
প্রকাশিত: ০৯:৩৩ পিএম, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

পাহাড়ের ফুলঝাড়ুর চাহিদা বাড়ছে দিনদিন। কারণ অন্যান্য ঝাড়ুর চেয়ে এটি সহজে ব্যবহার করা যায়। দেখতে সুন্দর, টিকে বেশিদিন ও দামে কম। পাহাড়ের এ ফুলঝাড়ু বিক্রি করে চলে সহস্রাধিক পরিবার।

খাগড়াছড়ি পৌর বাস টার্মিনালের পাশে বিশাল খোলা মাঠ। সেখানেই স্থানীয় বাজার ও বিভিন্ন পাহাড়ি পল্লী থেকে সংগ্রহ করা ফুলঝাড়ু সারিবদ্ধভাবে শুকানো হচ্ছে। শুকানো শেষেই এসব ফুলঝাড়ু পাইকারের হাত ধরে যাবে দেশের সমতলের বিভিন্ন জেলায়।

পাহাড়ি জেলা খাগড়াছড়ির রামগড়, দীঘিনালা ও গুইমারাসহ বিভিন্ন উপজেলায় রয়েছে ফুলঝাড়ুর আড়ৎ। স্থানীয় বাজার কিংবা পাহাড় থেকে ফুলঝাড়ু সংগ্রহকারীদের থেকে নগদে ক্রয় করে শুকানো হয় খোলা মাঠে।

পার্বত্য খাগড়াছড়ির পাহাড়ি জনপদ বড়পিলাকের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর ধনিরাম ত্রিপুরা, মালতি ত্রিপুরা আর হাফছড়ির লাব্রেচাই মারমা।

পাহাড়ে ঘুরে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো ফুলঝাড়ু সংগ্রহ করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেন। এ থেকেই চলে তাদের সন্তানের লেখাপড়ার খরচসহ সংসারের যাবতীয় ব্যয়। এদের মতোই পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অনেকেরই আয়ের অন্যতম উৎস ফুলঝাড়ু।

সম্প্রতি এ পেশার সঙ্গে বাঙালি জনগোষ্ঠীর লোকজনও জড়িয়ে পড়েছেন। সময়ের ব্যবধানে পাহাড়ের ফুলঝাড়ুতে সমৃদ্ধ হচ্ছে পাহাড়ের অর্থনীতি।

এক হাত দুই হাত করে পাহাড়ের ফুলঝাড়ু রফতানি হচ্ছে নোয়াখালী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, ঢাকা ও টাঙ্গাইলের মতো বড় বড় শহরে। সমতলের জেলাগুলোতে পাহাড়ের ফুলঝাড়ুর কদরও অনেক বেশি বলে জানিয়েছেন খাগড়াছড়িতে আসা পাইকাররা। তবে তাদের মতে পাশের দেশ ভারত থেকে অবৈধ উপায়ে ফুলঝাড়ু আসার কারণে পাহাড়ের ফুলঝাড়ুর কদর কমেছে।

স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনগণের বেশিরভাগ জুমচাষের ওপর নির্ভরশীল হলেও জুমচাষের ফসল ঘরে তোলার পর পৌষ মাস থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত ঝাড়ুফুল বিক্রি করেই তাদের জীবিকা চলে।

jaru2

ফুলঝাড়ু সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণের সঙ্গে পাহাড়ের হাজারো বাসিন্দা জড়িত জানিয়ে খাগড়াছড়ির গুইমারার হাফছড়ি আড়তদার অংচিং মারমা বলেন, ফুলঝাড়ু পাহাড়ের মানুষের বাড়তি আয়ের পথ খুলে দিয়েছে। অনেকেই গভীর জঙ্গল থেকে ফুলঝাড়ু সংগ্রহ করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেন। আবার অনেক আড়তদার বা পাইকার তাদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা ফুলঝাড়ু কিনেন।

৭-১০টি ফুলে একটি আঁটি। আর এমন একটি আঁটি বাজারে বিক্রি হয় ১৩-১৫ টাকায়। এভাবেই ১০০ আঁটি ফুলঝাড়ু বিক্রি হচ্ছে ১৩০০ থেকে ১৫০০ টাকায়। সপ্তাহে ১০০ আঁটি ফুলঝাড়ু সংগ্রহ করতে পারে অনেকেই এমনটাই জানিয়েছেন দীঘিনালার সাত মাইল এলাকার বাসিন্দা বসন্ত কান্তি ত্রিপুরা।

তিনি জানান, অনেকেই এক মৌসুমে পাহাড় থেকে সংগ্রহ করা ফুলঝাড়ু বিক্রি করে আয় করে ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। তার মতে পুঁজি দিয়ে কৃষি কাজের চেয়ে বিনা পুঁজিতে বছরে চার মাস ফুলঝাড়ু সংগ্রহে অধিকতর লাভজনক।

গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ফুলঝাড়ু ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মো. মনজুরুল আলম বলেন, পৌষ মাসের শুরু থেকেই ফুলঝাড়ু সংগ্রহ শুরু হয়। ক্রেতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এখন অগ্রিম টাকা দিয়েই ফুলঝাড়ু কিনতে হয়।

খাগড়াছড়ির পানছড়ি, দীঘিনালা, মাটিরাঙ্গা, গুইমারা ও পাশের জেলা রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি ও সাজেকের বিভিন্ন এলাকা থেকে ফুলঝাড়ু সংগ্রহ করা হয়। ফুলঝাড়ু কেনার পর খোলা মাঠে শুকানো হয়। প্রায় ১৫ দিন শুকানোর পর এসব ফুলঝাড়ু সমতলের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয় বলেও জানান তিনি।

তবে বর্তমানে ফুলঝাড়ু ব্যবসায়ীরা লোকসান গুনছেন দাবি করে একাধিক ব্যবসায়ী বলেন, পাশের দেশ ভারত থেকে অবৈধ পথে সিলেট সীমান্ত দিয়ে ফুলঝাড়ু আসার কারণে পাহাড়ে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো ফুলঝাড়ুর দাম কমে যাচ্ছে।

তাদের মতে, অবৈধ পথে দেশে ফুলঝাড়ু আসা বন্ধ না হলে সরকার মোটা অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হবে। পাশাপাশি সারাদেশে পাহাড়ে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো ফুলঝাড়ুর কদর কমে যাবে। এতে করে সরকারের পাশাপাশি স্থানীয়রাও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

মুজিবুর রহমান ভুইয়া/এএম/জেআইএম

আপনার মতামত লিখুন :