গণি মিয়া কি স্বীকৃতি পাবে?
স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় জীবন বাজি রেখে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রান্না করেছেন তিনি। এছাড়াও বিভিন্ন অপারেশনে গোলাবারুদ পৌঁছে দিয়েছেন গন্তব্যে। ১১নং সেক্টর থেকে নিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের ওপর প্রশিক্ষণও। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৮ বছর হলেও মেলেনি মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি।
হাজারও সহযোগী মুক্তিযোদ্ধার ভিড়ে নিভৃতে সময় কাটছে সহজ-সরল এই মানুষটির। বর্তমানে শহরের একটি কাপড়ের দোকানের সামান্য কর্মচারী তিনি। আর রাতে পরিচ্ছন্নকর্মী হিসেবে কাজ করেন। তিনি হলেন কুড়িগ্রামের উলিপুর শহরের পরিচিত মুখ আব্দুল গণি মিয়া (৬৭)।
দেশ স্বাধীনের আগে ভারতসহ বিভিন্ন জায়গায় ফুটবল খেলে কুড়িয়েছেন সুনাম। ক্রীড়ামোদি এই মানুষটি জীবন সায়াহ্নে এসে নিজ উদ্যোগে উলিপুর বড় মসজিদে (মসজিদুল হুদা) করছেন পরিচ্ছন্নতার কাজ। এই কাজ করে খুশি তিনি। প্রতিদিন রাত ৯টার পর চলে আসেন মসজিদ কমপ্লেক্সে। ঝড়-বৃষ্টি-শৈত্যপ্রবাহ তাকে আটকে রাখতে পারেনি। এখানে এসে হাতে তুলে নেন ঝাড়ু। নিজে ক্রয় করা সামগ্রি দিয়ে মসজিদের অজুখানা, প্রস্রাবখানা, অপরিষ্কার ড্রেনসহ ক্যাম্পাস পরিষ্কার করেন। এখানে দুই থেকে তিনঘণ্টা কাজ করে বাসায় গিয়ে গোসল সেরে ঘুমিয়ে পরেন।

এভাবে ৭/৮ বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। ব্যক্তিগত জীবনে ৬ সন্তানের জনক তিনি। ৩ ছেলে ও ৩ মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। সবাই যার যার সংসারে ব্যস্ত। জেলার উলিপুর উপজেলার পৌর এলাকার নাড়িকেলবাড়ি কাজিরচক গ্রামের মৃত. আব্দুল জলিল মিয়ার ছেলে তিনি। উলিপুর দোকান কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন প্রায় দুই যুগ ধরে।
আব্দুল গণি মিয়া জানান, ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন ডানপিটে স্বভাবের। খেলাধুলার প্রতি ছিল অসম্ভব টান। দেশ স্বাধীনের পূর্বে ভারতের মাইনকার চর, বকবান্দাসহ কুড়িগ্রাম, রংপুর, রাজশাহীর বিভিন্ন জায়গায় ফুটবল খেলে পরিচিতি লাভ করেন। এখনও ভালোবাসেন ফুটবলকে। স্থানীয়ভাবে লালদল ক্রীড়া সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। দুস্থ খেলোয়াড়দের জন্য জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ও বঙ্গবন্ধু কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে যে ভাতা প্রতি বছর দেয়া হয় তা তিনি পেয়েছেন কয়েকবার। শহরের কে পি সাহা অ্যান্ড বস্ত্রালয় কাপড়ের দোকানে কর্মচারী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন তিনি।
প্রতিদিন সকাল থেকে থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত দোকানের কাজ শেষ করে তিনি ছুটে যান মসজিদুল হুদায়। সেখানে থাকা অজু খানা, প্রস্রাব খানা, ড্রেনসহ মসজিদ ভবনের বাইরের অংশ পরিষ্কার করেন তিনি। পরে গভীররাতে বাড়িতে গিয়ে গোসল সেরে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। এই তার প্রতিদিনের জীবন।

তিনি আরও জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশ মাতৃকাকে মুক্ত করতে ১১নং সেক্টরের প্রশিক্ষক নজরুল ইসলামের কাছে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করলেও ওই সময় জেলার উলিপুর ও চিলমারীতে বিভিন্ন অপারেশনে মুক্তিযোদ্ধাদের গোলাবারুদ বহন এবং ক্যাম্পে রান্না বান্নার কাজ করে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছেন।
উলিপুর মসজিদুল হুদা’র সাধারণ সম্পাদক আলহাজ দেলোয়ার হোসেন জানান, গণি ভাই যে কাজটা করেন সেটা মেথর বা সুইপারের করার কথা। দীর্ঘদিন থেকে নিজ উদ্যোগে অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে কাজটুকু করেন তিনি। ঝড় বৃষ্টি, শীত উপেক্ষা করে গভীর রাত পর্যন্ত তিনি শ্রম দেন। উনি কখনই এ জন্য পারিশ্রমিক চাননি। আল্লাহর ঘরের খেদমত করাকে তিনি নিজের কাজ হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
উলিপুর উপজেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এম ডি ফয়জার রহমান বলেন, মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটি গণি মিয়ার নাম অন্তর্ভুক্ত করে কেন্দ্রে পাঠিয়েছেন। যুদ্ধকালীন ভূমিকার জন্য ১১নং সেক্টরের প্রশিক্ষক নজরুল ইসলাম ও জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের প্রত্যয়নপত্র তার রয়েছে।
নাজমুল/এমএএস/এমএস