স্ত্রীকে ফিরে পেতে ছোট ভাইকে হত্যা করে শরিফুল

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি যশোর
প্রকাশিত: ০৭:৫২ পিএম, ২৪ মে ২০১৯

যশোরের কেশবপুর উপজেলার কিশোর তরিকুল ইসলাম (১৫) খুনের রহস্য উন্মোচন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তরিকুলের আপন বড় ভাই শরিফুল তাকে হত্যা করেছে। পিবিআই শরিফুলকে আটকের পর সে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে।

২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর সকালে সাতবাড়িয়া পাচানীপাড়া গ্রামের একটি বাগান থেকে তরিকুলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় নিহতের বাবা নজরুল ইসলাম কেশবপুর থানায় অজ্ঞাত আসামিদের নামে মামলা করেন।

শরিফুল জানিয়েছে, স্ত্রীকে পাওয়ার শর্তে তার আপন ভাইকে হত্যার প্রস্তাব দেয় শ্বশুর বাড়ির লোকজন। এক পর্যায়ে স্ত্রীকে পাওয়ার আশায় ভাইকে হত্যার প্রস্তাবে রাজি হন শরিফুল। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী তরিকুলকে খুন করে শরিফুলের শ্যালক রবিউল ও আল-আমিন।

তরিকুল হত্যা মামলার অন্যতম আসামি ও নিহতের বড় ভাই শরিফুল ইসলামের এ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পিবিআই যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এমকেএইচ জাহাঙ্গীর হোসেন।

পিবিআই যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এমকেএইচ জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, আসামি শরিফুল ইসলাম মৃত তরিকুল ইসলামের আপন বড় ভাই। দুই ভাই তার বাবার কাঠমিস্ত্রির কাজে যোগালদার (সহযোগী) হিসেবে কাজ করতেন। ঘটনার আনুমানিক দুই সপ্তাহ আগে আভিযুক্ত বড়ভাই শরিফুল ইসলাম কেশবপুর থানার কমলপুর গ্রামের রশিদ বিশ্বাসের মেয়ে জেসমিন আরাকে বিয়ে করে।

বিয়ের কিছুদিন পর আসামি শরিফুল ইসলাম তার স্ত্রীকে নিয়ে শ্বশুর বাড়ি বেড়াতে যায়। সেখান থেকেই তাকে বাবার সঙ্গে কাঠমিস্ত্রির কাজ করার জন্য আসতে হতো। বিষয়টি শরিফুলের শ্বশুরবাড়ির লোকজনদের ভালো লাগেনি। তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন বিশেষ করে শরিফুলের বড় চাচা শ্বশুর খলিলুর রহমান ওরফে লেদ খলিল বিষয়টি নিয়ে নাখোশ হন।

তিনি বলেন, তোমার বাড়িতে তোমার ছোট একটা ভাই আছে, সে তো তোমার বাবার সঙ্গে কাজে যেতে পারে। বিষয়টি নিয়ে শরিফুলের মনেও রাগের সৃষ্টি হয়। বাড়িতে এসে তার বাবা-মাকে বিষয়টি জানিয়ে বলে তোমাদের ছোট ছেলেকে তো কাজে পাঠাতে পারতে, আমি শ্বশুর বাড়ি বেড়াতে গেছি, আমাকে কেন কাজে যেতে বলো?।

এ কথা শুনে সেই সময় শরিফুলের মা শরিফুলকে সংসার হতে পৃথক হওয়ার জন্য বলে। এ বিষয়টি শরিফুলের শ্বশুর বাড়ির লোকজনকে জানায়। পরবর্তীতে যখন শরিফুর শ্বশুর বাড়িতে যায় তখন তার শ্যালক রবিউল ইসলাম শরিফুলকে বলে, তুমি তো ঠিকমতো কাজও করতে পারো না, আবার পৃথক হয়ে আমার বোনকে খাওয়াবা কি? সবচেয়ে ভালো হয় তোমার বাবার সকল সম্পত্তি পেতে ও তোমার চাচাদের শায়েস্তা করতে তোমার ছোট ভাইকে সরিয়ে দিলে। তাহলে তুমি সবদিক থেকেই লাভবান হবা।

শরিফুলের বড় চাচা শ্বশুর শরিফুলকে জানায়, যদি রবিউল ইসলামের (শরিফুলের শ্যালক) কথামতো কাজ না করো তাহলে তোমার স্ত্রীকে আর পাঠানো হবে না। এমন হুমকিতে শরিফুল তার ছোট ভাইকে খুনে সম্মতি দেয়। শরিফুলের শ্যালক রবিউল তার কাছে জানতে চায় তোমরা কয়টার দিকে ঘুমাও। কবে তোমার (শরিফুলের) বাবা-মা বাড়িতে থাকবে না। হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা শরিফুলের চাচা শ্বশুরের বাড়িতেই হয়। শরিফুলের স্ত্রী জেসমিন আরা হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত ছিল।

ঘটনার দুইদিন আগে থেকেই শরিফুলের মা তার বাবার বাড়িতে বেড়াতে যায়। বাবা কাঠমিস্ত্রির কাজের জন্য কর্মস্থলে অবস্থান করে। সবকিছু জেনে নিয়ে ঘটনার দিন ২০১৮ সালের ৩ অক্টোবর রাত আনুমানিক ১১টার পরে শরিফুলের শ্যালক রবিউল এবং ফুপাতো শ্যালক আল-আমিন তার বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হয়। ওই সময়ের আগেই শরিফুলের স্ত্রী ‘স্টার জলসা’ চ্যানেলে গোবিন্দ সিরিয়াল দেখে তাদের শোবার রুমে ঘুমিয়ে পড়ে। শরিফুল ও তার ছোট ভাই তরিকুল টিভি রুমে ‘স্টার জলসা’ চ্যানেলে ‘প্রতিদান সিরিয়াল’ ও বিভিন্ন প্রোগ্রাম দেখতে থাকে। শরিফুলকে তার শ্যালক রবিউল ও ফুপাতো শ্যালক আল-আমিন বারান্দার ক্লপসিবল গেট খুলে দিতে বলে। শরিফুল গেট খুলে দিয়ে হত্যা করার জন্য ব্যবহৃত দা কোথায় রাখা আছে তা দেখিয়ে দেয়। দুইজন ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে তরিকুলকে বলে, ‘বেয়াই কেমন আছো?’ তরিকুলসহ তারা তিনজন বসে গল্প করে।

শ্যালক রবিউল শরিফুলকে বলে, দুলাভাই তুমি ঘুমাও। আর তরিকুলকে বলে, চলো বেয়াই আমরা বাইরে থেকে একটু ঘুরে আসি। এর আগেই শ্যালক রবিউল শরিফুলকে বলেছিল তার স্ত্রীর বাইরে কোনো প্রাকৃতিক কাজ রয়েছে কিনা নিশ্চিত হয়ে তাকে জানাবে। শরিফুল তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করে তুমি বাইরে যাবা কিনা? স্ত্রী না বলে ঘুমাতে থাকে। তরিকুল এবং শরিফুলের দুই শ্যালক বাইরে যাওয়ার সময় বলে যে, গেট খোলা রাখো, আটকানোর দরকার নেই। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী তরিকুলকে বাইরে নিয়ে খুন করা হয়। যদিও লাশ কোথায় রাখা হবে সেটি আগেই জানতো শরিফুল। তাই রাতের ভেতরে আর গেট আটকাই নাই। বাইরেও বের হয় নাই। সকাল বেলা শরিফুল তার বাড়ির দক্ষিণ পশ্চিম ধানের জমির পাশের জঙ্গলের মাঝে ছোট ভাই তরিকুলের মৃতদেহ দেখে চিৎকার করে লোকজন হাজির করায়।

বৃহস্পতিবার আসামি শরিফুল ইসলামকে তার বাড়ি থেকে আটকের পর আদালতে হাজির করা হয়। হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে শরিফুল। শরিফুল কেশবপুর উপজেলার সাতবাড়িয়া পাচানীপাড়া গ্রামের নজরুল ইসলামের ছেলে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত বাকি আসামিদের গ্রেফতার ও আলামত উদ্ধারে তৎপর রয়েছে পুলিশ।

মিলন রহমান/এমএএস/পিআর

আপনার মতামত লিখুন :