ভ্যান চালকের সচেতনতামূলক সাইনবোর্ড রাস্তায় রাস্তায়

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ঝিনাইদহ
প্রকাশিত: ০৯:৩৮ এএম, ২৮ আগস্ট ২০১৯

ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলার কুশনা ইউনিয়নের কুশনা, জালালপুর, তালসারসহ একাধিক রাস্তায় চলার সময় চোখে পড়ে সচেতনতামূলক সাইনবোর্ড। সাইনবোর্ডগুলোর কোথাও লেখা আছে ‘সাবধান গাড়ির গতি কমান সামনে স্কুল’, আবার কোথাও লেখা আছে ‘সামনে বাজার আস্তে চলুন’। কোথাও লেখা আছে ‘আপনার শিশুকে স্কুলে পাঠান, বাল্যবিবাহ বন্ধ করুন’। ‘নিরাপদ সড়ক গড়তে সকলেই সচেতন হই’।

আর এই সাইনবোর্ডগুলো দিয়ে এলাকার মানুষকে সচেতন করে চলেছেন, উপজেলার তালসার গ্রামের, আব্দুল ওয়াদুদ ভুইয়ার ছেলে ভ্যানচালক আকিমুল ইসলাম সাজু (৩০)।

অভাবের সঙ্গে লড়াই করে শুধু বেঁচে আছেন তাই নয়, নিরবে সমাজের কাজ করে চলেছেন তিনি। অন্যরা গাছের সঙ্গে পেরেক পুঁতে নিজেদের প্রচারে যখন ব্যস্ত, সাজু তখন গাছের কথা চিন্তা করে বাঁশের খুটি ব্যবহর করছেন।

প্রতিবেশী জালাল মিয়া জানান, অভাবের কারণে তেমন পড়ালেখা করতে পারেনি সাজু। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় পরিবার থেকে তাকে অন্যের দোকানে কাজের জন্য পাঠানো হয়। কালীগঞ্জ শহরের কৌশিক এন্টারপ্রাইজে কাজ নেন তিনি। এরপর এক সময় ওই দোকান ছেড়ে বাড়ি ফিরে এসে ভ্যান চালানো শুরু করেন। দীর্ঘ ১২ বছর ধরে তিনি ভ্যান চালাচ্ছেন।

সাজু জানান, ভ্যান চালিয়ে যে টাকা আয় করেন তা দিয়েই চলে বাবা-মা আর স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে তার সংসার। এই আয়ের পাশাপাশি বাবা ওয়াদুদ ভুইয়ার বাজারে একটি চায়ের দোকান আছে। কষ্টেই চলে তাদের সংসার।

তালসার রাস্তায় বজলুর রহমান নামে এক মোটরসাইকেল চালক বলেন, প্রায়ই এ রাস্তা দিয়ে তিনি চলাচল করেন। রাস্তার বিভিন্ন বাঁকে, বাজার, স্কুলের সামনে বাঁশের খুটিতে বিভিন্ন সংকেত লেখা আছে। এ সংকেতের জন্য গাড়ি চালাতে তার অনেক সুবিধা হয়।

van

সচেতনতামূলক সাইনবোর্ডের পাশে আকিমুল

ভ্যান চালক আকিমুল ইসলাম এই প্রতিবেদককে জানান, ২০১৩ সালে কোটচাঁদপুর-তালসার সড়কে একটি দুর্ঘটনা ঘটে। তখন তানভির আলম নামে এক লোকের শিশু সন্তান স্কুলে যাওয়ার জন্য রাস্তা পার হচ্ছিল। এমন সময় দ্রুতগামী একটি মাইক্রোবাস তাকে চাপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যায় শিশুটি।

তিনি বলেন, সেই ঘটনা দেখে তিনি বুঝতে পারেন যে সচেতনতা না থাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। তখন তিনি চিন্তা করেন কীভাবে মানুষকে পথ চলায় সচেতন করা যায়। মূলত সেই ভাবনা থেকেই রাস্তার পাশে সচেতনতামূলক সাইনবোর্ড লাগানো শুরু করেন।

তিনি জানান, এগুলো প্রেস থেকে ছাপিয়ে এনে বাঁশের সঙ্গে বেঁধে নিজেই রাস্তার পাশে পুঁতে দেন। ভ্যান চালিয়ে যে টাকা আয় করেন তার মধ্যে থেকে সংসার চালিয়ে যে টাকা বাঁচাতে পারেন তাই দিয়ে এই সাইনবোর্ড তৈরি করেন।

এভাবে পর্যায়ক্রমে এখন পর্যন্ত নিজ ইউনিয়নের তালসার, জালালপুর, কুশনা সড়কে প্রায় অর্ধশত সাইনবোর্ড লাগিয়েছেন। তার আশা সারা উপজেলায় এই সাইনবোর্ড লাগাবেন। এ কাজে পরিবারের পক্ষ থেকেও সহযোগিতা পেয়েছেন বলে জানান তিনি।

ওই গ্রামের কৃষক বাছের আলী বলেন, সারাদিন ভ্যান চালিয়ে আকিমুল ইসলাম মানুষকে সচেতন করতে নানা শ্লোগান লিখে রেখেছেন। তার জন্য আমরা গ্রামবাসী গর্বিত।

তিনি আও বলেন, যাদের এ কাজ করার কথা তারা এগুলো না করে লুটে পুটে খাচ্ছেন।

আকিমুল ইসলামের বাবা আব্দুল ওয়াদুদ ভুইয়া জানান, তারা অভাবের সঙ্গে লড়াই করে চলেন। ছেলে ভ্যান চালিয়ে অর্থ উপার্জন করে। তারপরও সে সমাজকে ভালো রাখতে, মানুষকে সচেতন করতে নানা কাজ করে। এটা তার কাছে ভালোই লাগে। তবে অনেক সময় সংসারের কষ্টের কথায় মন খারাপ হয়।

এ বিষয়ে কুশনা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল হান্নান বলেন, ছেলেটি পেশায় একজন ভ্যান চালক। কিন্তু তার মনটা অনেক বড়। সে সমাজের জন্য নিরবে কাজ করে যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, আকিমুলের মতো সমাজের অন্যরাও সেবামূলক কাজে এগিয়ে এলে একদিন আমাদের এই সমাজ উন্নত সমাজে পরিণত হবে।

আব্দুল্লাহ আল মাসুদ/এমএমজেড/জেআইএম