আমার স্বামীর বিষয়টি স্পষ্ট করুক, আমরা অপবাদ থেকে মুক্তি চাই

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি শরীয়তপুর
প্রকাশিত: ০৫:২০ পিএম, ২৭ নভেম্বর ২০১৯

হলি আর্টিসান মামলার রায়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাতে রাজি হয়নি সাইফুলের পরিবার। তবে তার স্ত্রীর দাবি, তার স্বামী জঙ্গি ছিলেন না। তিনি হলি আর্টিসান রেস্তোরাঁর পিৎজার শেফ কর্মচারী ছিলেন। বিষয়টি রায়ে পরিষ্কার হওয়া উচিত ছিল জানিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন সোনিয়া বেগম।

নিহত সাইফুল ইসলাম চৌকিদারের বাড়ি শরীয়তপুরের নড়িয়া পৌরসভার কলুকাঠি গ্রামে। তিনি হলি আর্টিসানে পিৎজার শেফ কর্মচারী হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

২০১৬ সালের ১ জুলাই দিবাগত রাতে শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার কলুকাঠি গ্রামের মৃত আবুল হাসেম চৌকিদারের ছেলে ও ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিসান রেস্তোরাঁয় পিৎজা তৈরির কুক সাইফুল ইসলাম চৌকিদার ওই রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলায় নিহত হন। তার মৃত্যুর সংবাদ পাওয়ার পর সাইফুলের স্বজনরা ঢাকায় গিয়ে লাশ ফেরত পাওয়ার জন্য যোগাযোগ শুরু করে। ওই বছরের ৬ জুলাই সাইফুলের লাশ ফেরত পাওয়ার জন্য গুলশান থানায় নড়িয়া পৌরসভা ও শরীয়তপুর-২ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য কর্নেল (অব.) শওকত আলী এমপির প্রত্যয়নপত্র জমা দেয়। তখন গুলশান থানা পুলিশ তদন্ত শেষ হলেই লাশ ফেরত দেয়ার আশ্বাস দেন।

এরপর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে যোগাযোগ করার পর ডিএনএ টেস্টের জন্য প্রথমের সাইফুলের মাকে নিয়ে যেতে বলা হয়। ডিএনএ টেস্টের রিপোর্ট আসার পর লাশ ফেরত পাওয়ার জন্য সাইফুলের পরিবারের পক্ষ থেকে সাইফুলের ভায়রা ভাই কবীর হোসেন স্বাক্ষর করে একটি আবেদন জমা দেন। এরপর সাইফুলের মায়ের ডিএনএ টেস্টের টিপসইসহ একটি আবেদন চাওয়া হলে সেটিও জমা দেয়া হয়। পরে ২৫ সেপ্টেম্বর আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে জুরাইন কবরস্থানে সাইফুলের লাশ দাফন করা হয়। সাইফুলের ভায়রা ভাই কবীর হোসেনের দাবি, ওইদিন সকালেও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ২৮ সেপ্টেম্বর তাদের লাশ দেয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন।

সরেজমিনে বুধবার (২৭ নভেম্বর) বিকেলে কলুকাঠি গ্রামের বাড়ি কথা হয় সাইফুলের স্ত্রী সোনিয়া বেগমের সঙ্গে। তিনি জানান, সাইফুল মারা যাওয়ার পর সংসার চালাতে অনেক কষ্ট হচ্ছে। সেলাই মেশিনে কাজ করে ও আত্মীয়-স্বজদের সহযোগিতা নিয়ে সংসার চালাই। তার সঙ্গে ঘরে বৃদ্ধ শাশুড়ি। কীভাবে মেয়েদের পড়ালেখা করাই, কীভাবে সংসার চলে, কেউ তো কোনো খবর নিতে আসেনি। উপরন্তু অনেকেই মনে করে আমার স্বামী জঙ্গি ছিল। না হলে সরকার আমাদের খোঁজখবর নেবে না কেন? এ কারণে সাইফুলের বিষয়টি আজ রায়ে পরিষ্কার হওয়া উচিত ছিল।

তিনি বলেন, আমার দুই মেয়ে ও এক ছেলে। বড় মেয়ে সামিয়া আক্তার (১২) নড়িয়া মডেল বিহারী লাল উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। ছোট মেয়ে জিদনি আক্তার কলুকাঠি মা ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী ও ছেলে হাসান চৌকিদারের বয়স এখন ৩ বছর ২ মাস। সাইফুল যখন মারা যায় তখন আমি ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা। ওই অবস্থায় স্বামীর লাশ পাওয়ার জন্য অনেক ছোটাছুটি করেছি। সরকারের কাছে লিখিত আবেদন করেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শারীরিক, মানসিক আর আর্থিক হয়রানি ছাড়া কিছুই জোটেনি। দাফনের আগে শেষ বারের মতো মুখটাও দেখতে পারিনি স্বামীর। তাকে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করেছে।

তিনি আরও বলেন, সাইফুলের নাম-পরিচয় থাকার পরও বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করেছে। সাইফুল জঙ্গি বা নির্দোষ যেটাই হোক না কেন, সরকার সেটা স্পষ্ট করে প্রকাশ করুক। কারণ আমরা এ অপবাদ থেকে মুক্তি চাই।

সাইফুল ইসলাম চৌকিদারের মা সমমেহের বেগম (৭০) জাগো নিউজকে বলেন, আমরা বড় ছেলে সাইফুল। আমার সংসার চলতো তার রোজগারে। বড় ছেলেটা আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। এখন ছেলের বউ, নাতি, নাতনি নিয়ে সংসারে অনেক অভাব-অনটনে আছি। আমার ছেলেকে আল্লাহ যেন জান্নাতবাসী করেন।

প্রসঙ্গত, ২০১৬ এর ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিসানে হামলা চালায় জঙ্গিরা। এতে নিহত হন তিন বাংলাদেশিসহ ২০ জন। অন্যদের মধ্যে ৯ জন ইতালির, ৭ জন জাপানের এবং একজন ভারতীয়। এছাড়া জঙ্গিদের হামলার শুরুতেই দুই পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হন। রেস্তোরাঁর ভেতরে রাতভর জিম্মি ছিলেন অন্তত ২৪ জন, যাদের প্রায় ১১ ঘণ্টা পর পরদিন সকালে সেনা কমান্ডো পরিচালিত ‘অপারেশন থান্ডার বোল্টে’র সময় উদ্ধার করা হয়।

এছাড়া রাতের বিভিন্ন সময় উদ্ধার করা হয় আরও অন্তত সাতজনকে। অপারেশন থান্ডার বোল্টের পর রেস্তোরাঁ থেকে পাঁচ জঙ্গিসহ ছয়জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এছাড়া পালাতে গিয়ে আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আরেক রেস্তোরাঁকর্মী।

হলি আর্টিসান মামলার রায়ের সব খবর পড়ুন এক ক্লিকে

ছগির হোসেন/এমএএস/পিআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।