কোটি টাকা টিকিট বিক্রির রেল স্টেশনে যাত্রীদের দুর্ভোগ

আজিজুল সঞ্চয়
আজিজুল সঞ্চয় আজিজুল সঞ্চয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া
প্রকাশিত: ০৯:২৭ এএম, ১১ ডিসেম্বর ২০১৯

বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল জোনের গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনগুলোর মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশনটি অন্যতম। সরকারের আয়ের দিক থেকেও চট্টগ্রামের পরেই এ স্টেশনের অবস্থান। প্রতি মাসে প্রায় এক কোটি টাকার টিকিট বিক্রি হয়ে থাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশনে।

প্রতিদিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশন দিয়ে দেড় থেকে দুই হাজার হাজার যাত্রী ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াত করেন। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশনে যাত্রীদের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। কিন্তু যাত্রী সংখ্যার বিপরীতে বাড়েনি সেবার মান। যে পরিমাণ আসনযুক্ত টিকিট ইস্যু করা হয় তা চাহিদা অনুযায়ী খুবই কম। এর মধ্যে বেশির ভাগ টিকিটই চলে যায় কালোবাজারিদের হাতে। এর ফলে যাত্রীদের চড়া দামে টিকিট কিনতে হয় কালোবাজারিদের কাছ থেকে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিদিন ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-নোয়াখালী রেলপথে চলচলকারী ৭টি আন্তঃনগর ট্রেন এবং ৭টি মেইল ও লোকাল ট্রেন দুইবার করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশনে যাত্রাবিরতি করে। আন্তঃনগর ট্রেনগুলোতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার যাত্রীদের জন্য বরাদ্দ রয়েছে প্রায় ৭০০ টিকিট। কিন্তু এই টিকিট সংখ্যা যাত্রীদের চাহিদার অর্ধেকের চেয়েও কম। বর্তমানে স্টেশনে আসনবিহীন টিকিট বিক্রির হারও বেড়েছে। সব মিলিয়ে প্রতি মাসে প্রায় এক কোটি টাকার টিকিট বিক্রি হয় বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

rail

স্টেশনের কাউন্টার ও ‘রেলসেবা’ অ্যাপের মাধ্যমে যাত্রার দিনের ১০দিন আগে থেকে টিকিট দেয়া হয় যাত্রীদের। তবে টিকিট ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই অধিকাংশ টিকিট কালোবাজারিরা কেটে ফেলেন। মূলত কাউন্টারে অতিরিক্ত টাকা দিয়েই টিকিট পান কালোবাজারিরা। এর ফলে ৭-৮ দিন আগে কাউন্টারে গিয়েও টিকিট না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন অনেক যাত্রী।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ঢাকাগামী আন্তঃনগর ট্রেনের প্রতিটি টিকিট ১৪৫ টাকার পরিবর্তে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা ও চট্টগ্রামগামী আন্তঃনগর ট্রেনের টিকিট ২৩০ টাকার পরিবর্তে বিক্রি হয় ৩৫০ টাকা থেকে ৪৫০ টাকা এবং সিলেটগামী ট্রেনের ২১০ টাকার টিকিট ৩৫০ টাকা থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয় কালোবাজারে। তবে উৎসব-পার্বণে টিকিটের এই দাম আরও বেড়ে যায়।

যাত্রীদের অভিযোগ, স্টেশনের ভারপ্রাপ্ত মাস্টার, টিকিট বুকিং ক্লার্ক এবং রেলওয়ে পুলিশের যোগসাজশে কালোবাজারিদের হাতে পৌঁছে যায় যাত্রীদের জন্য বরাদ্দকৃত টিকিট।

rail

টিকিটি কালোবাজারি ছাড়াও যাত্রীদের আরও দুর্ভোগ পোহাতে হয় স্টেশনে। বিশাল সংখ্যক যাত্রীদের জন্য আন্তঃনগর ট্রেনের দুইটি এবং মেইল ও লোকাল ট্রেনের জন্য দুইটি টিকিট কাউন্টার রয়েছে। যাত্রীদের তুলনায় কাউন্টার সংখ্যা কম হওয়ায় দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় টিকিটের জন্য। এছাড়া ট্রেন ছাড়ার কয়েক ঘণ্টা আগে থেকে যাত্রীদের জন্য আসনবিহীন টিকিট সরবরাহ করার ফলে ট্রেন স্টেশনে ঢোকার আগ মুহূর্তে কাউন্টারে যাত্রীদের ভিড় বেড়ে যায় কয়েক গুণ।

এদিকে প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে যাত্রীদের করা জন্য স্টেশনের একমাত্র বিশ্রামাগারটির অবস্থাও নাজুক হয়ে আছে দীর্ঘদিন ধরে। শুধুমাত্র নামে প্রথম শ্রেণির বিশ্রামাগার হলেও এর ভেতরের নোংরা পরিবেশের কারণে বসতে পারেন না যাত্রীরা। মূলত বিশ্রামাগারটি স্টেশনের ভিক্ষুক আর ভবঘুরেদের দখলেই থাকে বেশির ভাগ সময়। এর ফলে যাত্রীদের স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়েই ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে হয়।

শরীফুল ইসলাম নামে এক যাত্রী বলেন, মহানগর এক্সপ্রেসে করে ঢাকায় যাওয়ার জন্য টিকিট কিনতে ৫দিন আগে কাউন্টারে টিকিটের জন্য গিয়েছিলাম, কিন্তু টিকিট পাইনি। রেলসেবা অ্যাপেও চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছি। পরে এক কালোবাজারির কাছ থেকে আড়াইশ টাকায় একটি টিকিট কিনেছি। দীর্ঘদিন ধরে এই অবস্থা চলছে স্টেশনে। স্টেশনের লোকজন জড়িত থাকার কারণেই কালোবাজারি বন্ধ হচ্ছে না।

হাফসা বেগম নামে আরেক যাত্রী বলেন, মহানগর প্রভাতী ট্রেনে করে চট্টগ্রামে আত্মীয়ের বাসায় যাবো। ট্রেন আসতে বিলম্ব হতে দেখে বিশ্রামাগারে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে দেখি বসার মতো পরিবেশ নেই। টয়লেটও তালাবদ্ধ করে রেখেছে। তাই বাধ্য হয়ে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছি।

rail

আরিফ মিয়া নামে এক যাত্রী জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশন থেকে টিকিট পাওয়া মানে সোনার হরিণ হাতে পাওয়া। এমনিতেই টিকিট সংখ্যা কম, এরপর আবার কালোবাজারি সমস্যা। যাত্রীদের চাহিদা বিবেচনা করে নতুন একটি ট্রেন দেয়া প্রয়োজন।

তবে কালোবাজারিদের সাথে যোগসাজশের অভিযোগ সঠিক নয় দাবি করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশন পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই মো. মোজাম্মেল খান জাগো নিউজকে বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় টিকিট কালোবাজারির সমস্যা অনেক আগের। এমন কোনো মাস নেই যে দুই-তিনটা মামলা না দিচ্ছি। কালোবাজারিও ধরছি। এখনও কয়েকজন জেলে আছে। এরা মূলত স্টেশনের বাইরে গিয়ে এই কাজ করে। টিকিট তো আর আমরা বিক্রি করি না, কাউন্টার থেকে তারা কীভাবে টিকিট পায় সেটা স্টেশন কর্তৃপক্ষই বলতে পারবে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশনের ভারপ্রাপ্ত মাস্টার মো. শোয়েব জাগো নিউজকে বলেন, আমার ও স্টেশনের কর্মচারীদের সঙ্গে টিকিট কালোবাজারিদের কোনো যোগসাজশ নেই। কিছু মাদকাসক্ত যাত্রী বেশে কাউন্টার থেকে দুই-চারটি টিকিট নিয়ে কালোবাজারে বিক্রি করে। কিন্তু যাত্রীরা চড়া দামে টিকিট না কিনলেই কালোবাজারি বন্ধ হয়ে যাবে। আর টিকিট সংখ্যা কম হওয়ায় টিকিট না পেয়ে অনেকেই কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগ করেন। নতুন একটি ট্রেন দিলে অথবা অন্য কোনো ট্রেনের যাত্রাবিরতি দেয়া হলে যাত্রীদের আর কোনো অভিযোগ থাকবে না। আর যাত্রীদের তুলনায় টিকিট ও কাউন্টার স্বল্পতা এবং বিশ্রামাগার নিয়ে ইতোমধ্যে আমরা সংশ্লিষ্ট দফতরে চিঠি পাঠিয়েছি। অচিরেই এসব সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করছি।

আরএআর/জেআইএম