নগরবাড়ী ঘাটে ট্রাক ভাড়ার অর্ধেক টাকা যায় দালালদের পকেটে

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি পাবনা
প্রকাশিত: ০৭:০০ পিএম, ১৪ আগস্ট ২০২০

ট্রাক ভাড়া ১৩ হাজার টাকা হলে মধ্যস্বত্বভোগী দালালদের দিতে হয় অন্তত ৬ হাজার টাকা। এতে নগরবাড়ী ঘাট কেন্দ্রিক পরিবহন মালিক- শ্রমিকরা চরম আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন।

গত ৫-৬ বছর ধরে নগরবাড়ী ঘাটে এমনই অরাজকতা চলছে। প্রতিবাদ করলেই ট্রাকে আর মালামাল লোড করা হয় না। এতে ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। তাই এ অনিয়মকেই নিয়ম মেনে তারা বাড়তি লোডিং চার্জ দিয়ে আসছেন বলে জানান সাধারণ মালিক- শ্রমিকরা।

করোনাকালে তারা চরম দূরবস্থায় পড়ে এ অনিয়ম বন্ধের জন্য গত সোমবার (১০ আগস্ট) পাবনা জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেছেন।

নগরবাড়ী ঘাটে মধ্যস্বত্বভোগীদের বে-আইনিভাবে অর্থ আদায়ে পরিবহন মালিক- শ্রমিকদের চরম আর্থিক ক্ষতি প্রসঙ্গে বলছিলেন পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সদস্য মোখলেসুর রহমান মুকুল।

তিনি বলেন, পাবনা জেলার বেড়া উপজেলার আমিনপুর থানার ঐতিহ্যবাহী নগরবাড়ী ঘাট থেকে মালামাল পরিবহন করেই এ অঞ্চলের পরিহন মালিক- শ্রমিকদের মূল আয় রোজগার হয়ে থাকে।

তিনি জানান, এ ঘাটে প্রতিদিন অন্তত ২০০- ৩০০ ট্রাক লোড-আনলোড হয়ে থাকে। এর সাথে সম্পৃক্ত হাজার- হাজার মানুষ।

তিনি জানান, অন্য শ্রমজীবীদের মতো এ ঘাট তাদেরও রুটি-রোজগারের ঠিকানা।

PABNA-NOGORBARI

মুকুল আরও জানান, অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো বিগত ৫-৬ বছর ধরে এ ঘাটে সীমাহীন নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছে মধ্যস্বত্ব ভোগী কিছু মহল। তাদের কার্যাবলী রীতিমতো সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির মধ্যে পড়ে। কারণ একটি ট্রাক লোড করতে লেবার খরচ বাদ দিয়েই মধ্যস্বত্ব ভোগী দালালেরা ৫- ৮ হাজার টাকা অতিরিক্ত আদায় করেন। তিনি বেশ কয়েকটি চালানপত্র দেখান। এদের একটিতে দেখা যায় মোট ভাড়া ২৩ হাজার টাকা আর ঘাট খরচ দেখানো হয়েছে ৭ হাজার পাঁচশ’ টাকা।

তিনি জানান, অতিরিক্ত অর্থ না দিলে ওই গাড়িতে মালামাল লোড দেয়া হয় না। আবার অতিরিক্ত এত টাকা দালালদের প্রদান করায় পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের লভ্যাংশ বলে কিছু থাকে না। বিগত কয়েক বছরের এ নৈরাজ্যের ফলে মধ্যস্বত্ব ভোগী দালালেরা আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে বলে তিনি জানান। আর প্রকৃত শ্রমিকরা অনেকে এখন ঠিকমতো দু’বেলা খাবারও পাচ্ছেন না।

তিনি আরও জানান, দালালেরা পুরো ঘাটটি দুর্নীতির চাদরে ঢেকে ফেলেছেন। কিছু দালালের কাছে গোটা পরিবহন মালিক- শ্রমিকরা জিম্মি হয়ে পড়েছেন। প্রতিবাদ করলে হত্যার হুমকি পর্যন্ত দেয়া হয় বলে তিনি জানান। সাধারণ পরিবহন পরিহন মালিক- শ্রমিকদের পথে বসার উপক্রম হয়েছে। অনেকে গাড়ি সংখ্যা কমিয়ে বা বিক্রি করে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন।

বেশ ক’জন ট্রাক ড্রাইভারের সাথে কথা বলেও একই রকম তথ্য পাওয়া যায়। তারা জানান, এখন তারা ও তাদের মহাজনরা চরম বিপদের মধ্যে রয়েছেন।

নগরবাড়ী এলাকার বাসিন্দা এবং প্রবীণ ট্রাকচালক আক্কাস আলী (৬৫) জানান, রোববার (৯ সেপ্টেম্বর) তিনি ১১ হাজার টাকার একটি ভাড়া পান। এর মধ্যে ঘাট খরচই চলে গেছে ৫ হাজার।

তিনি জানান, জ্বালানী, তাদের বেতন, খাওয়া-দাওয়া ইত্যাদি বাদ দিলে যে টাকা বাঁচে তা দিয়ে মহাজনের পোষায় না। তারাও ঠিকমতো টাকা পাচ্ছেন না। তিনি ঘাটে অতিরিক্ত টাকা নেয়া বন্ধের জন্য জোর দাবি জানান।

PABNA-NOGORBARI-2

তরুণ ট্রাক চালক সাদ্দাম হোসেন(২২) জানান, তিনিও গত রোববার(৯ সেপ্টেম্বর) একটি ভাাড়া পান ১৩ হাজার ছয়শ’ টাকার। কিন্তু ঘাট খরচই গেছে ৬ হাজার টাকা। তিনিও দু:খ করে জানান, যে টাকা তারা মহাজনের হাতে দিতে পারেন তা দিয়ে আর পরিবহন ব্যবসা করা সম্ভব নয়। এত কম টাকা মহাজনের হাতে তুলে দিতেই তাদের লজ্জা করে জনিয়ে বলেন, তাদের তো কিছু করার নেই। প্রতিবাদ করলেই ঘাটে বসে থাকতে হতো, তাদের গাড়ি লোড দেয়া হতো না।

ট্রাকচালক আব্দুল বাতেন (৪৫) জানান, প্রতিদিনই গাড়ি লোড করি। ঘাট থেকে যেসব টাকা নেয়া হয় তা দিয়েই গাড়ি চালাই।

ঘাটে কর্মরত লেবারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তারা প্রতি বস্তা লোড-আনলোড করে দু’টাকা ৫০ পয়সা করে পান। ট্রাক ভাড়া থেকে অতিরিক্ত টাকা কেটে নেয়ার সাথে লেবাররা জড়িত নন। এটা এক শ্রেণির দালালরা এটি করে থাকে বলে তারা জানান।

প্রবীণ শ্রমিক নেতা আব্দুল হাকিম মোল্লা জানান, একটি ট্রাক যদি সার বোঝাই করে পাবনার কোনো এলাকা বা দূরের জেলায় ১৬ হাজার টাকা ভাড়ায় চুক্তিবদ্ধ হয় এর মধ্যে ঘাটে মধ্যস্বত্ব ভোগীদের ৭ হাজার টাকা লোডিং খরচ বাবদ দিতে হয়। এ টাকা পরিবহন মালিককে পরিশোধ করতে হয়। অথচ ঘাটে কর্মরত প্রকৃত লেবাররা গাড়ি প্রতি পান বড়জোর ৭শ/৮শ টাকা। বাদ বাকি টাকা ভাগ বাটোয়ারা হয়ে থাকে মধ্যস্বত্ব ভোগীদের মধ্যে। এতে করে পরিবহন মালিক-চালক, শ্রমিক সবাই আজ চরম ক্ষতির মুখে বলে তিনি জানান।

নগরবাড়ী ঘাটে কর্মরত লেবারদের সাথে কথা বলেও এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের যুগ্ম সম্পাদক শাহ আলম মুক্তি জানান, কোনো গাড়ির মালিক বা চালক এ ভয়াবহ অনিয়ম- দুর্নীতির প্রতিবাদ করলে ওই গাড়িকে দিনের পর দিন নগরবাড়ী ঘাটে বসিয়ে রাখা হয়। তাতে কোনো মালামাল লোড দেয়া হয় না। দূরবর্তী জেলা থেকে আগত ট্রাকগুলো থেকে ইচ্ছেমতো টাকা আদায় করে তাদের লোড দেয়া হয়। এতে এ এলাকার মালিক-শ্রমিকরা আরও ক্ষতির শিকার হন।

তিনি জানান, তাই এতটি বছর, দিনের পর দিন এমন দুর্নীতি, লুটপাট, অনিয়ম আমরা সহ্য করতে বাধ্য হয়েছি। কিন্তু এখন আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। করোনাকালের এ দুঃসময়ে আমাদের অনেকেরই পথে বসার উপক্রম। তাই আমরা এ ভয়াবহ দুর্নীতি বন্ধে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

PABNA-NOGORBARI-3

পাবনা জেলা সড়ক পরিবহন মোটর মালিক গ্রুপের লাইন সেক্রেটারি আব্দুল বারিক মোল্লা জানান, আমরা পরিবহন মালিকরা যেমন দুর্দশায় আছি, তেমনি শ্রমিকরাও দুর্দশায় পড়েছেন। অনেকে গাড়ির ব্যবসা ছেড়ে দেয়ার কথা ভাবছেন।

শ্রমিক ইউনিয়নের সিনিয়র সহ- সভাপতি হোসেন আলী মিয়া জানান, শ্রমিকরা এ করোনাকালে বড় দুঃসময় পার করছেন। কারণ ভাড়ার প্রায় অর্ধেক টাকাই মধ্যস্বত্ব ভোগীদের পকেটে চলে যাচ্ছে। মালিকরাই লাভ পাচ্ছেন না। তারা শ্রমিকদের টাকা দেবেন কোথা থেকে?

নগরবাড়ীর ঘাটের পাশের এলাকা হরিদেবপুর মহল্লার বাসিন্দা সাবেক মেরিন ক্যাপ্টেন এমদাদুল হক দুলাল জানান, তার ৩টি গাড়ি আছে। কিন্তু সেসব গাড়ি থেকে লাভ নেই বললেই চলে।

তিনি বলেন, তারা নগরবাড়ী নৌবন্দরে গুটি কয়েক মধ্যস্বত্ব ভোগী দালালদের ব্ল্যাক মেইলিং এর শিকার।

তিনি জানান, এ বন্দরে চলা এমন অনিয়ম দেশের অন্য কোনো বন্দরে আছে বলে আমার চাকরি জীবনে দেখিনি। তিনি এ ঘাটে চলা অনিয়ম দূর করে নগরবাড়ী নৌবন্দরের ঐতিহ্য ফিরিয়ে দেয়ার দাবি জানান।

এদিকে নগরবাড়ী ঘাটের মধ্যস্বত্ব ভোগী দালালরা সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর তারা গা ঢাকা দেয়। এজন্য তাদের সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

এ ব্যাপারে নগরবাড়ী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই মাঈদুল ইলাম জানান, তিনি কিছুদিন আগে এ ফাঁড়িতে যোগদান করেছেন। আর মাত্র কয়েকদিন আগে তারা ঘাটের সব কার্যাবলী দেখার অনুমতি সংক্রান্ত গেজেট হাতে পেয়েছেন।

তিনি জানান, তারা এখন থেকে নিয়মিতভাবে ঘাটের সব অনিয়ম দেখভাল করবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তি প্রদান করবেন।

এমএএস/পিআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]