‘ঘরের মধ্যে পানি ঢুকতিছে, বাঁধ না হলি আমরা কনে থাকপো’

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক খুলনা
প্রকাশিত: ০৬:২০ পিএম, ২৯ মে ২০২১

দিনমজুর আনোয়ার হোসেন (৫০)। খুলনার কয়রা উপজেলা মহারাজপুর ইউনিয়নের দশহালিয়া গ্রামে কপোতাক্ষ নদীর তীরে বেড়িবাঁধের পাশে পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে নিয়মিত সংগ্রাম তার। ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা, ফণী, আম্ফান ও ইয়াসের কবলে কয়েক দফায় বেড়িবাঁধ ভেঙে যায় তার চোখের সামনেই। এখন কোনো রকম টিকে আছে তার ঘরটি। সেটিও বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় যাতায়াতের কোনো পথ নেই। নেই খবার, নেই সুপেয় পানির ব্যবস্থা।

বিচিত্র জীবনের রুঢ় বাস্তবতার সঙ্গে প্রতিনিয়ত বেঁচে থাকার সংগ্রাম করছেন এ উপজেলার হাজার হাজার মানুষ। দুর্গত এলাকার এসব মানুষ সহায়-সম্বল হারিয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রামে এখন দিশেহারা। বানভাসি এসব মানুষের মধ্যে চলছে শুধু হাহাকার।

শনিবার (২৯ মে) দুপুরে দশহালিয়া এলাকায় কথা হয় আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ষাটের দশকের পর জোড়াতালি দিয়ে বাঁধ মেরামত করা হলেও তা বেশি দিন টিকছে না। টেকসই বাঁধ নির্মাণ না করায় ঘূর্ণিঝড় আম্ফানে কিছুটা ক্ষতি হলেও ইয়াসে পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে যায়। দশহালিয়া বেড়িবাঁধ ভেঙে মহারাজপুর সব এলাকা প্লাবিতসহ পার্শ্ববর্তী বাগালী ইউনিয়নের বেশকিছু অংশ প্লাবিত হয়েছে। হাজার হাজার বিঘার মৎস্যঘের, ফসলি জমি, বসতঘর, মসজিদ-মাদরাসা, দোকানপাট ও খেয়াঘাট হুমকির মুখে পড়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে কয়েক হাজার মানুষ।

তিনি বলেন, ‘গত বছর আম্ফানে ভাঙা বেড়িবাঁধ কোনো রকমে মেরামত করা হয়েছিল। এবার ইয়াসে পুরো ভাইসে গেছে। এহন ছেলে-পুলে, নাতি-নাতনি নিয়া খাইয়ে না খাইয়ে অতি দুশ্চিন্তায় আছি। একটু জোয়ার আলি সব পানিতে ডুবি যায়। ঘরের মধ্যে পানি ঢুকতেছে। বাঁধ না হলি আমরা কনে থাকপো।’

পাশের আটরা গ্রামের তরুণ সমাজসেবক আছাফুর রহমান বলেন, ষাটের দশকে নির্মিত বাঁধ যেমন দুর্বল, তেমনি নিচু। বাঁধটি ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসে বার বার ভাঙে। আবার সংস্কারও করা হয়। কিন্তু টেকসই বেড়িবাঁধ না দিলে কীভাবে টিকবে। একটু জোয়ারের পানি বাড়লেই বাঁধ ভাঙে।

ঘেরী নদী তীরের বাসিন্দা আবদুর রব খোকন বলেন, ঝড়-বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসলে আমরা খুবই আতঙ্কে থাকি। বিশেষ করে রাতে ছেলে-মেয়ে নিয়ে বসে থাকতে হয়। কখন বাড়িঘর ভেঙে নদীতে চলে যায় এ চিন্তায়।

মহারাজপুর ইউনিয়নের মডবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা বৃদ্ধ জরিনা খাতুন বলেন, এক জোয়ারেই পানি অনেক বাড়ছে। এহোন বেড়ি ভাইঙ্গা ওই পাশ দিয়্যা ছুইট্ট্যা গ্যাছে। এতে আমাগো ঘরবাড়ির মেলা ক্ষতি হইছে। ঘেরের ও পুকুরের মাছ সব চইলে গেছে নদীর পানিতে আমাগোর স্বপ্ন ভাইসে গেছে। বার বার এমন ভাঙা আমাদের ভালো কোরি বাঁচতে দেয় না সব শেষ করে দেয়। আমাদের বেড়িবাঁধ ব্যবস্থা কইরা দেক আমাগী স্বপ্ন যেন আর না ভাইসে যায়।

সাতক্ষরীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুর রহমান বলেন, কয়রায় ঘূর্ণিঝড় ইয়াসে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আংশিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১৫ কিলোমিটার। ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে বাঁধ মেরামতের জন্য জাইকা ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে বাঁধ মেরামতের সরঞ্জামাদি বাঁশ, জিও ব্যাগ, সিনথেটিক ব্যাগ, দড়ি, পেরেক দিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে মেরামত কাজ অব্যাহত আছে। গত ২৮ মে (শুক্রবার) পাঁচটি পয়েন্ট ভেঙে যাওয়া বেড়িবাঁধ মেরামত করা হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) অনিমেষ বিশ্বাস বলেন, একের পর এক ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে খুলনার কয়রা উপজেলার কপোতাক্ষ ও শাকবাড়িয়া নদী তীরের ১১৭ কিলোমিটারের মধ্যে ৫১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের বিভিন্ন স্থান ক্ষতবিক্ষত হয়। মাঝে মধ্যে ও বিগত দিনগুলোতে সংস্কার হলেও বেশিরভাগই অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। এলাকাবাসীর দুঃখ লাঘবে দ্রুত উপকূলে টেকসই বেড়িবাঁধ দরকার।

স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. আক্তারুজ্জামান বাবু বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ঘুরে দেখেছি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, জনগণ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহযোগিতায় ভাঙা বেড়িবাঁধের কাজ অব্যাহত আছে। এলাকাবাসীর দুর্দশা লাঘবে ভেঙে যাওয়া স্থানগুলো জাইকা ও পানি উন্নয়ন বোর্ড তাৎক্ষণিক টেন্ডার আহ্বান করেছে। ২/৪ দিনের মধ্যে মেরামত কাজ শুরু হবে এবং তা দ্রুতগতিতে সম্পন্ন হবে।

আলমগীর হান্নান/আরএইচ/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]