গোখাদ্যের অস্বাভাবিক দামে হতাশ রূপগঞ্জের খামারিরা
গোখাদ্যের ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধিতে বিপাকে পড়েছেন নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের খামারিরা। খাবারের অস্বাভাবিক দামের কারণে দুধ উৎপাদন ও পশু মোটাতাজাকরণে ব্যয় বেড়েছে। এতে করে পশুপালনে হিমশিম খাচ্ছেন উপজেলার খামারিরা।
রূপগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ডেইরি খামার রয়েছে এক হাজার ১৪৫টি এবং পশু মোটাতাজাকরণ খামার রয়েছে ৩২০টি। খামারিদের মোট গরুর সংখ্যা এক লাখ ১১ হাজার। আসন্ন ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে গরু মোটাতাজাকরণে বিনিয়োগ করা অর্থ গচ্চা যাওয়ার শঙ্কায় রয়েছেন খামারিরা। এছাড়া দুধ উৎপাদনেও খরচ বেড়েছে। ফলে যাবতীয় খরচ মিটিয়ে আয় দূরের কথা, লোকসান গুণতে হচ্ছে। খামারিরা গবাদিপশু পালন প্রসারে গোখাদ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়েছেন।
তারাব পৌরসভার তেৎলাব এলাকার সিউল ডেইরি ফার্মের মালিক গোলাম মোহাম্মদ বলেন, দুধের ব্যবসায় লাভের চেয়ে লোকসানই বেশি। গোখাদ্যের দাম যেভাবে বাড়ছে সেভাবে দুধের দাম বাড়াছে না। এমন হলে দুধ বেচা বন্ধ করে দিতে হবে। হু হু করে গরুর খাবারের দাম বাড়ছে। সেভাবে দুধের দাম তো বাড়ে না। লোকসান দিয়ে এভাবে দুধ বেচতে থাকলে বাড়ি বেচে গরুর খাদ্য কিনতে হবে। আমার খামারে গত বছর ৭০টি গাভী ছিল। দুধ বিক্রি করে উৎপাদন খরচ উঠিয়ে তেমন লাভ না হওয়ায় ৩৫টি গরু বিক্রি করেছি, এখন ৩৫টি আছে।
খামারিরা জানান, বর্তমানে এক বস্তা ভালো মানের গমের ভূষি বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৫০০ থেকে এক হাজার ৬০০ টাকায়। কিছুদিন আগে যার বাজার মূল্য ছিল এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকা। একইভাবে মাসকলাইয়ের ভূষি বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৪০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকায়। কয়েক মাস আগেও এর দাম ছিল এক হাজার থেকে এক হাজার ১০০ টাকা। খৈল বিক্রি হচ্ছে প্রতি বস্তা তিন হাজার ২০০ থেকে তিন হাজার ৩০০ টাকায়, যা কয়েক মাস আগে ছিল দুই হাজার ২০০ থেকে দুই হাজার ৩০০ টাকায়। দাম বেড়েছে শুকনো খড়েরও। বর্তমানে এক মণ খড় বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়, যা তিন থেকে চার মাস আগে ছিল ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা।

উপজেলার মাসাব বাজারের গোখাদ্য বিক্রেতা আব্দুস সালাম বলেন, বেচাবিক্রি অনেক কমে গেছে। বেশি দামে খামারিরা খাদ্য কিনতে চায় না। অল্প অল্প করে কেনেন। আমাদের তো কিছু করার নেই। বেশি দামে কিনে আনতে হয় তাই বেশি দামে বেচতে হয়। তারপরও বেচাবিক্রি নেই বললেই চলে।
উপজেলার পবনকুল গ্রামের গোখামারি আব্দুল মোতালেব হোসেন বলেন, আমার খামারে ৮০টি গাভী ছিল। প্রতিদিন খরচ হতো চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। কিন্তু খড় ও ভূষির দাম বেড়ে যাওয়ায় আমি অনেক গাভী বিক্রি করে দিয়েছি। বর্তমানে আমার খামারে ৩০টি গাভী রয়েছে। প্রতিদিন ৯০ থেকে ১০০ লিটার করে দুধ পাওয়া যায়। এই দুধ বিক্রি করে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা হয়। কিন্তু ৩০টি গাভীর পেছনে আমার খরচ হয় প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা। দুধের জন্য অতিরিক্ত টাকা দিয়েই গাভীর খাবার কিনতে হচ্ছে। দুই-তিন মাস আগেও এক লিটার দুধের উৎপাদন খরচ ছিল ৩০-৩৬ টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৪৫-৫০ টাকা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, উৎপাদন খরচ বাড়লেও পাইকারি বাজারে দুধের দাম বাড়েনি। বর্তমানে খুচরা বাজারে এক লিটার দুধ ৬০ থেকে ৬৫ টাকা দরে বিক্রি হলেও পাইকারি বাজারে তা ৪৫ টাকা থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
উপজেলার দক্ষিণবাঘ গ্রামের নায়েবালী বলেন, আমার খামারে ৯০টি ষাঁড় গরু ছিল। খড়, ভূষি, গমের খুদ ও ফিডের দাম চড়া হওয়ায় বেশ কয়েকটি ষাঁড় বিক্রি করে দিয়েছি। বর্তমানে খামারে ৪০টি ষাঁড় আছে। প্রতিটি গরুর দাম দেড় লাখ টাকা থেকে দুই লাখ টাকা হবে। বর্তমানে চড়া মূল্যে খাবার কিনতে হচ্ছে। এত দামে খাবার কিনে গরু মোটাতাজা করে বাজারে কেমন দাম পাবো তা নিয়ে আমি সন্দিহান।
রূপগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রিগেন মোল্লা বলেন, খামারিদের সব ধরনের সেবা ও পরামর্শ দিচ্ছি আমরা। পশুখাদ্যের ভ্যাট ও ট্যাক্স কমানোর জন্যও সরকারের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে।
এমআরআর/এএসএম