৫২ বছর পর খুঁজে পেলেন আপন ঠিকানা

জাহিদ পাটোয়ারী
জাহিদ পাটোয়ারী জাহিদ পাটোয়ারী , কুমিল্লা
প্রকাশিত: ০৮:২০ পিএম, ২৪ জুলাই ২০২২
বোনের পাশে খোরশেদা বেগম (বামে)

ছয় বছর বয়সেই গৃহপরিচারিকার কাজে লেগে যান খোরশেদা। গৃহকর্ত্রীর অত্যাচার সইতে না পেরে বেরিয়ে পড়েন অজানার উদ্দেশ্যে। বাড়িঘরের ঠিকানা না জানায় হেঁটেছেন রাস্তায় রাস্তায়। অবশেষে ঠাঁই মেলে মানিকগঞ্জের একটি দরিদ্র পরিবারে।

দীর্ঘ ৫২ বছর পর খোরশেদা খুঁজে পেয়েছেন আপন ঠিকানা। তাকে ফিরে পেয়ে স্বজনদেরও আনন্দের শেষ নেই। বাড়িতে চলছে উৎসবের আমেজ। অর্ধশত বছর পর আপন নীড় ফিরে পাওয়া এ ষাটোর্ধ্বকে দেখতে ভিড় করছেন গ্রামবাসী।

কুমিল্লার দেবিদ্বারে এমন ঘটনা ঘটেছে। ফিরে আসা খোরশেদা বেগম উপজেলার বরকামতা ইউনিয়নের বাগমারা গ্রামের মৃত আব্দুল মালেকের মেয়ে।

খোরশেদার বড় ভাই জয়নাল আবেদন জাগো নিউজকে জানান, তিনিসহ তার তিন বোনকে রেখে ছোটবেলায় মা মারা যান। ভাইবোনদের মধ্যে খোরশেদা ছিলেন সবার ছোট। এরপর আর বিয়ে করেননি বাবা আব্দুল মালেক। তবে পাঁচজনের সংসার চালানো তার পক্ষে অনেক কষ্টকর ছিল। দেশ স্বাধীনের আগে সংসারের অভাব-অনটনের কারণে ছয় বছর বয়য়ে খোরশেদাকে গৃহপরিচারিকার কাজে লাগিয়ে দেন চান্দিনা উপজেলার এক পরিচিতের বাসায়।

ওই সময় কথা ছিল খোরশেদা তাদের শিশুদের দেখাশোনা ও খেলার সঙ্গী হিসেবে থাকবেন। একপর্যায়ে ওই পরিবারটি চাকরির সুবাদে পাবনা জেলায় চলে যায়। সঙ্গে নিয়ে যায় খোরশেদাকেও।

jagonews24

সেখানে একদিন পানি আনতে গিয়ে একটি মাটির কলস ভাঙার অভিযোগে ওই বাসার গৃহকর্ত্রী খোরশেদার ওপর শুরু করেন নির্যাতন। একপর্যায়ে তাকে ঘর থেকে বের করে দেওয়া হয়। খোরশেদা রাগে-ক্ষোভে আর ওই বাসায় ফিরে যাননি।

জয়নাল আবেদিন বলেন, ‘ওই সময় বাবার আর আমার নাম এবং কুমিল্লার চান্দিনা ছাড়া সে কিছুই বলতে পারতো। বাড়িঘরের ঠিকানা না জানায় সে না খেয়ে বেশ কয়েকদিন রাস্তায় রাস্তায় হেঁটেছে। অবশেষে ঠাঁই মেলে মানিকগঞ্জের দরিদ্র এক পরিবারে। বর্তমানে খোরশেদার চার মেয়ে ও এক ছেলে সন্তান রয়েছে। স্বামী মারা গেছে বহু বছর আগেই।’

‘খোরশেদার নিখোঁজের খবরে আমরা বাপ-ছেলে মিলে বহু স্থানে খুঁজেছি। এতেও কোনো সন্ধান মেলেনি। এরপরও আমার বিশ্বস ছিল সে বেঁচে থাকলে কোনো একদিন বাড়িতে ফিরে আসবে। আমার ছেলেমেয়েদেরও বলে রেখেছি যে সে কখনো এলে তাকে যেন ফিরিয়ে না দেয়। অবশেষে দেরিতে হলেও আল্লাহপাক আমার বোনকে আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দিয়েছেন’, যোগ করেন খোরশেদার ভাই জয়নাল আবেদিন।

জয়নাল বলেন, ‘হঠাৎ করে ঈদুল আজহার পরদিন ছেলেকে নিয়ে চান্দিনায় আসে খোরশেদা। পরে স্থানীয়দের সহযোগিতায় খোঁজ করতে করতে আমাদের বাড়িতে আসে। দীর্ঘ ৫২ বছর পর তাকে পেয়ে আমাদের খুশির সীমা নেই।’

বাগমারা গ্রামের বাসিন্দা মাহবুবুল আলম লিটন বলেন, ‘৫২ বছর পর আমাদের গ্রামের একটি সন্তান ফিরে এসেছে—এটাই আমাদের জন্য খুশির খবর। তাকে এক নজর দেখতে প্রতিদিন বাড়িতে লোকজন ভিড় করছেন। তার আগমনে গ্রামে উৎসবের আমেজ বইছে।’

খোরশেদা বেগম বলেন, ‘৫২ বছরে কোটিবার চেষ্টা করেছি নিজের বাড়ি ও স্বজনদের কাছে পৌঁছানোর। মানিকগঞ্জে ফেরিওয়ালাসহ কুমিল্লার যার সঙ্গেই পরিচয় হয়েছে তাকেই জিজ্ঞেস করেছি বাবার বাড়ি চেনে কি না। কেউ সন্ধান দিতে পারেনি। অবশেষে আমি যেখানে থাকি সে এলাকার এক ব্যক্তি চান্দিনায় বিয়ের সূত্র ধরে বাবার বাড়ির সন্ধান পেয়েছি। এতে আল্লাহর কাছে লাখো কোটি শুকরিয়া।’

জাহিদ পাটোয়ারী/এসআর/জিকেএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।