কটু কথা শুনেও কৃষ্ণা এখন সেরা ফুটবলার
নারী হয়েও ফুটবল খেলায় একসময় অনেক কটু কথা হজম করতে হয়েছে কৃষ্ণা রাণী সরকারকে। পরিবারের সদস্যরাও কটু কথা বাদ যাননি। অথচ সেই কৃষ্ণা এখন সেরা নারী ফুটবল খেলোয়াড়। তার জোড়া গোলেই সাফ নারী ফুটবল চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ।
টাঙ্গাইলের প্রত্যন্ত অঞ্চল গোপালপুর উপজেলার শিমলা ইউনিয়নের উত্তর পাথালিয়া গ্রামের বাসুদেব সরকার ও নমিতা রাণী সরকার দম্পতির মেয়ে জাতীয় নারী ফুটবল দলের স্ট্রাইকার কৃষ্ণা রাণী সরকার।
দুই ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় কৃষ্ণা। ছোট ভাই পলাশ সরকার ঢাকার গ্রিন ইউনিভার্সিটিতে প্রথমবর্ষে অধ্যয়নরত। কৃষ্ণাও বর্তমানে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। এরআগে গোপালপুর সূতী ভিএম পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি সম্পন্ন করে কৃষ্ণা রাণী সরকার। ফুটবল পরিচিতিও পায় ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে।

কৃষ্ণার মা নমিতা রাণী সরকার আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘আমার মেয়ের ফুটবল খেলা নিয়ে যারা একসময় কটু কথা বলতো, এখন তারাই আসছেন অভিনন্দন জানাতে। এ অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো না।’
তিনি আরও বলেন, আমার মেয়ে দেশের সম্মান রক্ষা করতে পেরেছে জেনে অনেক আনন্দিত হয়েছি। কৃষ্ণার সুন্দর ভবিষ্যত কামনায় দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন তিনি।
কৃষ্ণার বাবা বাসুদেব সরকার বলেন, ‘শৈশব থেকেই ফুটবল খেলায় আগ্রহী ছিল কৃষ্ণা। ফুটবল খেলায় আগ্রহ আর কৌশল দেখে গোপালপুর সূতী ভি এম স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক লতিফ আর বাপন স্যার ওকে বেশ উৎসাহ জুগিয়েছেন। সার্বিক সহযোগিতা করেছেন বর্তমান গোপালপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ঠান্ডু। তাদের উৎসাহ, অনুপ্রেরণা আর সহযোগিতায় আমার মেয়ে কৃষ্ণা রাণী সরকার এখন দেশের গর্ব।’

তিনি বলেন, ‘লোকজন মেয়েদের খেলাধুলা পছন্দ করতেন না। নানা সমালোচনার মধ্যে পড়েছি আমি আর কৃষ্ণা। তবে সেসব কথা উপেক্ষা করে আমি কৃষ্ণাকে ফুটবল খেলা চালিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছি। আজ সেই কৃষ্ণাই আমাদের গ্রামের সম্মান বৃদ্ধি করেছে। তার সাফল্যে আমি গর্বিত।’
শিমলা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড ইউপি সদস্য জামাল বসনী বলেন, ‘সামাজিক নানা প্রতিবন্ধকতা আর প্রতিকূলতার মধ্যদিয়ে কৃষ্ণাকে ফুটবল খেলা চালিয়ে যেতে হয়েছে। এখন সে এই গ্রামের পরিচয় দেশসহ নানা দেশে পরিচিত করেছে।’

গোপালপুর সূতী ভিএম পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের ক্রীড়া শিক্ষক গোলাম রায়হান বাপন বলেন, ‘কৃষ্ণার ফুটবল খেলার হাতেখড়ি আমার হাতে। সে আমাদের বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল। প্রশিক্ষণের শুরু থেকে কৃষ্ণার খেলায় নৈপুণ্য দেখেছি। দেখেছি তীব্র আকাঙ্ক্ষাসহ বল নিয়ে দৌড়ানোর তীব্র গতি। তার প্রতিভা দেখে আমি বিশ্বাস করেছিলাম সে ভালো কিছু করবে।’

২০১১ সালে বঙ্গমাতা ফুটবল দিয়ে জাতীয় প্রতিযোগিতার শুরু। এরপর বয়সভিত্তিক, ২০১৩ সালে শ্রীলঙ্কা সফরসহ ২০১৬ সালে অনূর্ধ্ব ১৬ চ্যাম্পিয়ন দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করার পর জাতীয় নারী ফুটবল দলে স্থান পান কৃষ্ণা।
গোপালপুর সূতী ভি এম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আতিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমাদের বিদ্যালয় থেকে ২০১৪ সালে জিপি-৫ পেয়ে এসএসসি পাস করে কৃষ্ণা রাণী সরকার। সে লেখাপড়ায় যেমন মেধাবী ছিল, তেমনি ফুটবল খেলায়ও ছিল পারদর্শী। সে আমাদের জেলাসহ দেশের সম্মান রক্ষা করেছে। কৃষ্ণা এখন দেশের মেয়েদের জন্য আইডল।’

কৃষ্ণাকে সংবর্ধনা দেওয়ার কথা জানিয়ে গোপালপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পারভেজ মল্লিক বলেন, ‘কৃষ্ণা শুধু গোপালপুর বা টাঙ্গাইলের নয়, সারাদেশের গর্ব। বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্টের মাধ্যমে তার উত্থান। দেশে ফেরার পর আমরা ওকে বড় করে একটি সংবর্ধনা দেবো।’
এ বিষয়ে টাঙ্গাইল-২ (গোপালপুর ভূঞাপুর) আসনের সংসদ সদস্য তানভীর হাসান ছোট মনির বলেন, ‘গ্রামের মেয়েরা খেলাধুলায় আসতে চায় না। তবে কৃষ্ণা একটি প্রত্যন্ত এলাকা থেকে আজ জাতীয় তারকায় পরিণত হয়েছে। সে এখন গ্রামের মেয়েদের প্রতিভা বিকাশের জন্য একটি উদাহরণ। আমি তার উত্তরোত্তর সফলতা কামনা করি।’

সোমবার (১৯ সেপ্টেম্বর) নেপালের কাঠমান্ডুর দশরথ রঙ্গশালা স্টেডিয়ামে ৩-১ গোলের ব্যবধানে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জিতে দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। স্ট্রাইকার কৃষ্ণা রাণী সরকারই করেন জোড়া গোল।
আরিফ উর রহমান টগর/এসআর/এমএস