ঢাকঢোল পিটিয়ে সৈকতে বিশাল মেলার আয়োজন, নেই পর্যটকের সাড়া

সায়ীদ আলমগীর
সায়ীদ আলমগীর সায়ীদ আলমগীর কক্সবাজার
প্রকাশিত: ১০:৪৫ এএম, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২

কক্সবাজার সৈকতের লাবনী পয়েন্টের প্রবেশ মুখেই বিশাল সাম্পান আকৃতির মঞ্চ। তার সামনে এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিপুল পরিমাণ খালি চেয়ার। সেখানে খেলা করছিল কিছু পথশিশু। সড়কের দুপাশের ফুটপাতের ওপর নির্মিত ১৭৫টি স্টলের অধিকাংশই খালি। মঞ্চ পেরিয়ে কয়েক পা এগোলেই সমুদ্র বালিয়াড়ির দুপাশে আছে আরও ২৫টি স্টল। তবে এখানকার কিছু স্টল খালি থাকলেও অধিকাংশ স্টলে শোভা পাচ্ছে গার্মেন্টসের তৈরি দেশীয় পোশাক।

মঙ্গলবার (২৭ সেপ্টেম্বর) বিকেলে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের লাবনী পয়েন্টে সাত দিনব্যাপী চলমান পর্যটন মেলাতে গিয়ে এমন দৃশ্যের দেখা মিলে।

বালিয়াড়ির তীরে জিও ব্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে কুমিল্লার পর্যটক ফেরদৌস হিরু ও শাহীন দম্পতি বলেন, পুরো সমুদ্র সৈকতের বিশ্রী অবস্থা। কিটকট চেয়ার, ভ্রাম্যমাণ খাবার ও ঝিনুকের দোকান ও বিচ বাইকের দখলে বালিয়াড়ি আর নোনা জল দখলে রেখেছে জেটস্কি ও স্পিডবোট। পাড় ভাঙা সৈকতে বসে কিংবা দাঁড়িয়েও সমুদ্র দেখা সম্ভব হচ্ছিল না। তাই মেলা চলছে শুনে এসেছিলাম ঘুরে দেখতে। কিন্তু এখানে দেখি আরও ভয়ানক অবস্থা। সব খালি, শূন্য, দু-একটা মানহীন খাবারের দোকান আর কিছু গার্মেন্টসের কাপড় ছাড়া কিছুই দেখলাম না। বুঝে আসছে না, এটি বিচ কার্নিভাল নাকি কোনো তামাশা।

হোটেল সীগার্ল পয়েন্টে দেখা মেলে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের তানিন রায়হান ও শাহাদত দম্পতির। পর্যটন মেলার খবর পেয়ে বেড়াতে এসেছেন কি-না জানতে চাইলে তারা বলেন, কোথায় মেলা হচ্ছে আমরা তা জানি না। প্রথম সারির কোনো গণমাধ্যমে এমন আয়োজনের বিষয়ে চোখে পড়েনি। আর কিসের ছাড়ের কথা বলছেন? আগে এলে যে কক্ষ ১ হাজার টাকায় থাকতাম, এবারও তো একই দামে উঠেছি। কক্ষ বলেন কিংবা খাবার কোথাও তো ছাড় পাইনি আমরা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সমন্বয়হীনতা, আয়-ব্যয়ে নয়-ছয় এবং নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনায় বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে কক্সবাজারে যাত্রা হয়েছে সাত দিনব্যাপী পর্যটন মেলার। মঙ্গলবার সকাল ১০টায় লাবনী পয়েন্ট থেকে এক শোভাযাত্রার মধ্য দিয়েই পর্যটন উৎসবের পথচলা শুরু হয়। এতে অংশ নেয় জেলা প্রশাসন, ট্যুরিস্ট পুলিশ, বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি, ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টুয়াক) ও হোটেল মোটেলর মালিকসহ প্রায় ২ হাজার লোক।

ঢাকঢোল পিটিয়ে সৈকতে বিশাল মেলার আয়োজন, নেই পর্যটকের সাড়া

র‌্যালি শেষে লাবনী পয়েন্টে ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার রিজিওনের প্রবেশ মুখের সামনে গড়া মঞ্চে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়। অনুষ্ঠানের মাঝপথেই পর্যটন উৎসব বয়কট করে চলে যান কক্সবাজার সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কায়সারুল হক জুয়েল। তবে সে সময়ও দর্শক আসনের বেশিরভাগ চেয়ার ছিল খালি। অনুষ্ঠানে নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা দেখে ঘটনাস্থলে উপস্থিত সংবাদকর্মীরা অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করে চলে আসেন।

এ বিষয়ে কক্সবাজারের স্থানীয় এক সংবাদকর্মী অভিযোগ করে বলেন, ‘পর্যটন দিবসের উদ্বোধনী ছিল নানা অব্যবস্থপনায় ভরপুর। সংবাদকর্মীদের জন্য নির্ধারিত কোনো আসন ছিল না। আপ্যায়নের নামে করেছেন অপমান। এছাড়া সামনের চেয়ারগুলো ছাড়া বাকি আসন গুলো ফাঁকা ও এলোমেলো।’

এ বিষয়ে কক্সবাজার সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কায়সারুল হক জুয়েল জাগো নিউজকে বলেন, মেলাটির আয়োজক জেলা প্রশাসন ও বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি। আমি সেই কমিটির সদস্য। কিন্তু মেলা শুরুর আগে এ নিয়ে ম্যানেজমেন্ট কমিটির সঙ্গে কোনো সমন্বয় করেনি জেলা প্রশাসন। শুধু মেলা নয় কোনো বিষয়েই ম্যানেজমেন্ট কমিটিকে আগে থেকে কিছুই জানানো হয়নি।

ঢাকঢোল পিটিয়ে সৈকতে বিশাল মেলার আয়োজন, নেই পর্যটকের সাড়া

তার দাবি, জেলা প্রশাসনের যে বা যারা সমুদ্র সৈকতের দায়িত্বে থাকেন তাদের ব্যাংক ব্যালেন্স কয়েকদিনে ফুলে ফেঁপে ওঠে। তারা মোটা অংকের বিনিময়ে আমাদের না জানিয়ে রাতের আঁধারে সিদ্ধান্ত নেয়। এসব বিষয়ে আমি আগেও তাদের সাবধান করেছিলাম। কিন্তু তারা শোনেনি।

অনুষ্ঠান বয়কট করার কারণে হিসেবে তিনি বলেন, আমি উপজেলা চেয়ারম্যান। আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে গিয়েছিলাম। যাওয়ার পর মেলার নামে তাদের টাকার নয়-ছয় দেখে বিরক্ত ছিলাম। এসব বুঝতে পেরে তারা আমাকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেয়নি। তাই আমি বয়কট করে চলে এসেছি। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি থেকে পদত্যাগ করার। কয়েকদিনের মধ্যেই তারা আমার পদত্যাগপত্র পাবে।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, কক্সবাজারে সাত দিনের পর্যটন মেলার আয়োজন করেছে জেলা প্রশাসন ও বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি। উৎসব চলবে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত। মেলা উপলক্ষে লাবনী পয়েন্টের দুপাশের ফুটপাতে ও সমুদ্র সৈকতের বালিয়াড়িতে ২০০ স্টল করা হয়েছে। প্রতিদিনই থাকবে নানা আয়োজন।

জেলা ছাত্রলীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি মইন উদ্দিন বলেন, ‘যাত্রাপালার শিল্পী দিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে বিশ্ব পর্যটন বিকাশ করতে চায় বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি।’

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মো. আবু সুফিয়ান জাগো নিউজকে বলেন, বিশ্ব পর্যটন দিবসে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতে আরও বেশি আকৃষ্ট করতে এ মেলার আয়োজন করা হয়েছে। এতে থাকবে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, আগামী জীবনের প্রজন্ম-বিষয়ক রচনা প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কৌতুক, বিচ ফুটবল, বিচ ক্রিকেটসহ কক্সবাজারের নানা ঐতিহ্য নিয়ে নাটক।

ঢাকঢোল পিটিয়ে সৈকতে বিশাল মেলার আয়োজন, নেই পর্যটকের সাড়া

তিনি আরও বলেন, মেলা চলাকালে তারকা মানের হোটেল কর্তৃপক্ষ ৪০ শতাংশ ছাড় দেবে এবং অন্য হোটেলগুলো কক্ষ ভাড়া নেবে ৮০০ টাকা (যেখানে চারজন থাকতে পারবেন)। পাশাপাশি রেস্তোরাঁগুলোতে দেওয়া হবে ৫০ ভাগ পর্যন্ত ছাড়। একই সঙ্গে সৈকতের কিটকট (বিচ ছাতা), ছবি তোলাসহ পর্যটন-সংশ্লিষ্ট অন্য সেবাতেও রয়েছে বিভিন্ন ছাড়।

তবে বিশেষ ছাড় নিয়ে কক্সবাজার রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সভাপতি নঈমুল হক টুটুল বলেন, ৫০ শতাংশ পর্যন্ত যে ছাড়ের কথা প্রশাসন বলছে, তা নিয়ে মালিকদের সঙ্গে কোনো আলাপ হয়নি।

কক্সবাজারের আবাসিক হোটেল মোটেল মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, আমরা উৎসবের জন্য আর্থিক সহযোগিতা করেছি। এছাড়া আমাদের সমিতির মালিকানাধীন ননএসি রুমগুলো মেলা চলাকালে ৮০০ টাকা ভাড়া দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে এখনো পর্যটকের তেমন সাড়া পাইনি।

হোটেল মোটেল অফিসার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও হোটেল মোটেল মালিক সমিতির মুখপাত্র কলিম উল্লাহ জাগো নিউজকে বলেন, এটি পর্যটন মৌসুম নয়। তবুও ১৫-২০ হাজার পর্যটক রয়েছে এখন। এমন পর্যটক সারাবছরই থাকে। উৎসব উপলক্ষে পর্যটক বাড়ার কোনো লক্ষণ দেখছি না।

ঢাকঢোল পিটিয়ে সৈকতে বিশাল মেলার আয়োজন, নেই পর্যটকের সাড়া

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মেলা আয়োজনে সরকারি কোনো বরাদ্দ নেই। তবে পর্যটন ব্যবসায়ীদের নানা সংগঠনের আর্থিক সহযোগিতা, ফাইভ স্টার মানের হোটেলের অনুদান, বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির নিজস্ব তহবিল, স্টল ভাড়া সহ অন্যান্য কয়েকটি খাত থেকে এই মেলায় খরচ বহন করা হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির এক সদস্য বলেন, ‘কমিটি থেকে ৫০ লাখ, বসুন্ধরা গ্রুপের ১০ লাখ এবং স্টল ভাড়া থেকে প্রায় ৩০ লাখ টাকা এসেছে। এছাড়া শহরের পাঁচটি ৫ তারকা হোটেল, হোটেল মোটেল মালিক সমিতি ও টুয়াক মোটা অংকের অনুদান দিয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় দেড় কোটির ওপরে মেলা উপলক্ষে আয় হয়েছে। তবে ব্যয় জানা নেই।’

এ বিষয়ে এডিএম আবু সুফিয়ান বলেন, সরকারি কোনো বাজেট নেই মেলার জন্য। ৫ হাজার গেঞ্জির চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা মাত্র ১২০০ গেঞ্জি এবং ১৫০ পোস্টার পেয়েছি। তবুও আমরা সাহসে ভর করে মেলার আয়োজন করেছি। মেলার জন্য বসুন্ধরা গ্রুপ ১০লাখ টাকা এবং স্টলগুলোর বেশির ভাগ ভাড়া ১০ হাজার করে নিয়েছি। তবে, কিছু স্টলের ভাড়া হয়েছে ৫০ হাজার।

তিনি আরও বলেন, এটি একটি বড় আয়োজন। এমন আয়োজনে ছোটখাটো বিচ্যুতি থাকেই। সমস্ত ভুল ত্রুটি বিচ্যুতি আমি আমার কাঁধে নিচ্ছি। তবুও আসুন সবাই মিলে মেলাটি সুন্দরভাবে সমাপ্ত করি।

সায়ীদ আলমগীর/এসজে/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।