‘অনিয়মের আখড়া’ কক্সবাজার কারাগারে ফিরছে শৃঙ্খলা
অনিয়ম আর দুর্নীতিতে জর্জরিত ছিল কক্সবাজার জেলা কারাগার। দুর্নীতির মাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, জামিন হওয়া বন্দিদের কাছ থেকেও নেওয়া হতো টাকা। আর মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে কারাগারে বসে মাদক কারবারিদের মোবাইলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলা তো ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এ নিয়ে বেশ সমালোচিত ছিল কারা কর্তৃপক্ষ।
এবার সেই কারাগারের চিত্রে এসেছে পরিবর্তন। ধীরে ধীরে ফিরেছে শৃঙ্খলা। গত তিন মাসে চোখে পড়ার মতো কারাগারের উন্নতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সদ্য মুক্তি পাওয়া কয়েক বন্দি।
দর্শনার্থীদের ঘরে এসেছে ফ্যান, তাদের বিনোদনে বসেছে বড় টেলিভিশন। সচল হয়েছে ক্যান্টিন। পরিপাটি করে সাজানো কারা ফটকের সামনে বড় মনিটরে জামিনপ্রাপ্ত বন্দিদের নাম প্রচার হচ্ছে। এতে কোন বন্দি জামিনে বের হবেন সেটা প্রধান সড়ক থেকেই অনায়াসে পড়ে নেওয়া যাচ্ছে।
তবে এখনো কয়েকজন কারা কর্মকর্তা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ করেন মুক্তি পাওয়া কয়েক বন্দি। তারা জানান, গোপনে এই কর্মকর্তারা নানা অনিয়ম করে যাচ্ছেন। যার মধ্যে একটি হচ্ছে ‘বিকাশ প্রতারণা’। এছাড়া বন্দিদের সঙ্গে তাদের খারাপ আচরণ তো রয়েছেই। তবে এই কর্মকর্তাদের নাম বলতে পারেননি জামিন পাওয়া বন্দিরা।
জামিনের পর গত ২৭ সেপ্টেম্বর বিকেলে কারাগার থেকে মুক্তি পান টেকনাফের বাসিন্দা ওমর আলী, আবু সিদ্দিক, মো. গোলামুর রহমান ও আবুল কাসেম।
তারা জানান, কারাগারে গত তিন মাসে চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন এসেছে। নতুন জেল সুপারের তদারকির কারণে টান পড়েছে অনিয়ম-দুর্নীতির লাগামে। পাশাপাশি কারাগারে খাবারের মানও বেড়েছে।
দীর্ঘদিন কারাভোগের পর সদ্য মুক্তি পাওয়া সদরের ঝিলংজা লারপাড়ার বাসিন্দা নুরুল আলম, শাহদাত জানান, কক্সবাজার কারাগারে দুর্নীতির মাত্রা এমন পর্যায়ে ছিল যে, জামিনপ্রাপ্ত বন্দিদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হতো। কেউ টাকা দিতে অপারগ হলে বিভিন্ন অজুহাতে আরও কয়েকদিন তাকে রেখে দেওয়া হতো কারাগারে। মোটা অংকের বিনিময়ে কারাগারে বসে সরকারি মোবাইল ব্যবহার করতেন প্রভাবশালী মাদক কারবারিরা। ফলে কারাগারে বসেই তারা নির্বিঘ্ন মাদক কারবার চালিয়ে যেতেন।
জেল ফেরত ওমর আলী ও আবু সিদ্দিক বলেন, তিনমাস আগে বিত্তশালী ও ইয়াবা কারবারি ছাড়া সরকারি মোবাইলে সাধারণ বন্দিরা তেমন সুযোগ পেতেন না। ২০ টাকা মিনিটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতেন মাদক কারবারিরা। কিন্তু বর্তমানে নিয়ম অনুযায়ী প্রতি সপ্তাহে সাধারণ বন্দিরা ১০ মিনিট করে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেন। এছাড়া অযথা হয়রানি ও সিট বাণিজ্যসহ নানা অনিয়ম বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি খাবারের মান বেড়েছে।
কক্সবাজার কারাগারের বন্দি আছেন সদরের জিয়াউল হক। তাকে দেখতে কারাগারে যান স্ত্রী রাহেলা আকতার। এই নারী বলেন, আমার স্বামী পাঁচ মাস ধরে জেলে। মাসে একবার তাকে দেখতে যাই। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত গরমের কারণে দর্শনার্থী ঘরে বসা যেত না। কিন্তু এ মাসে গিয়ে দেখেছি ভিন্নচিত্র। দর্শনার্থী ঘরে সিলিং ফ্যান লাগানো হয়েছে। টেলিভিশন ও ক্যান্টিনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
কারা সূত্র জানায়, কক্সবাজার জেলা কারাগারের দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়। এরপর সমালোচনার মুখে ২৯ জুলাই কক্সবাজার কারাগার থেকে জেল সুপার নেছার আহমেদকে বদলি করা হয়। তার জায়গায় আসেন মো. শাহ আলম খান।
নতুন জেল সুপার বলেন, কারাগারের বিশৃঙ্খলা নিয়ে সমালোচনা ছিল, তাই আমি যোগদানের পর প্রথমেই নজর দিয়েছি শৃঙ্খলা ফেরানোর দিকে। বন্দিদের স্বজনদের সাক্ষাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত ও দর্শনার্থীদের সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভালো ব্যবহার নিশ্চিতে তদারকি করা হচ্ছে। বন্দিদের বিনোদনে কারাগারের ভেতরে উন্মুক্ত স্থানে বড় মনিটরে নাটক, গান পরিবেশন করা হয়। এছাড়া সেখানে প্রতিদিন বিকেলে এক ঘণ্টা করে মোটিভেশনাল প্রোগ্রাম চালু রয়েছে।
জেলা সুপার শাহ আলম খান আরও বলেন, প্রতিদিন সরকারি মোবাইল বুথে বন্দিদের সিরিয়ালে কথা বলা নিশ্চিত হয়েছে। বন্ধ করা হয়েছে কারাভ্যন্তরে নগদ টাকা ব্যবহার। কারা ক্যান্টিনে নির্ধারিত মূল্য তালিকা ঝুলিয়ে কম্পিউটারের মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে খাবার বিক্রি হচ্ছে।
পরীক্ষার মাধ্যমে শতভাগ স্বচ্ছতার সঙ্গে কারারক্ষী নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে বলে জানান কক্সবাজার কারাগারের এই জেল সুপার।
এর আগে ২০১৯ সালে তৎকালীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক কক্সবাজার জেলা কারাগারে গিয়েছিলেন। তখন তিনিও এই কারাগারে বন্দিদের থাকার বিষয়টি দেখে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
সায়ীদ আলমগীর/জেডএইচ/জিকেএস