টেকনাফের পাহাড়ে অপহরণ: অভিযানে ক্ষিপ্ত অপহরণকারীরা
কক্সবাজারের টেকনাফে পাহাড়ি ছড়ায় মাছ শিকারে গিয়ে অপহৃত শিক্ষার্থীসহ ৮ জনকে তিনদিনেও উদ্ধার করতে পারেনি শৃংখলা বাহিনী। উল্টো তাদের সন্ধানে পুলিশ ও এলাকার লোকজন পাহাড়ে অভিযান চালানোই ক্ষিপ্ত হয়েছে অপহরণকারীরা। এখনো জনপ্রতি ৩ লাখ টাকা মুক্তিপণে অনড় থেকে বেশি বাড়াবাড়ি করলে অপহৃতদের প্রাণে মারার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে দাবি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর।
এর আগে রোববার (১৮ ডিসেম্বর) বিকেলে টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের জাহাজপুড়া পাহাড়ের ভেতর পানির ছড়া থেকে তাদেরকে অপহরণ করে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা। সেদিন রাত থেকে সোমবার ও মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত অভিযান চালিয়েও তাদের হদিস পায়নি শৃংখলা বাহিনী।
অপহৃতরা হলেন, বাহারছডা ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের জাহাপুড়া এলাকার রশিদ আহামদের ছেলে মোহাম্মদ উল্লাহ, ছৈয়দ আমিরের ছেলে মোস্তফা কামাল, মমতাজ মিয়ার ছেলে মো. রিদুয়ান, রুস্তম আলীর ছেলে সেলিম উল্লাহ, ছৈয়দ আমিরের ছেলে করিম উল্লাহ, কাদের হোসনের ছেলে নুরুল হক, তার ছেলে নুর মোহাম্মদ ও রশিদ আহমদের ছেলে আবছার।
অপহরণের শিকার রিদুয়ানের বাবা মমতাজ জানান, আমার ছেলেসহ ৮ জন পাহাড়ি খালে মাছ শিকারে গেলে পাহাড় থেকে নেমে আসা সন্ত্রাসীরা অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে পাহাড়ে নিয়ে যায়। স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে এলাকার মেম্বার ও চেয়ারম্যানসহ থানা পুলিশকে বিষয়টি অবহিত করলে পুলিশ অভিযান চালায়। রোববার রাত এবং সোম ও মঙ্গলবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকায় তল্লাশি করেও তাদের খোঁজ পাওয়া যায়নি।
তিনি আরো জানান, অপহরণকারীরা রোববার রাতে কল করে জনপ্রতি ৩ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। পরের দিনও একইভাবে তারা টাকা দাবি করে। মঙ্গলবার কল করে টাকা না দিয়ে পাহাড়ে পুলিশ পাঠানো এবং লোকজন মিলে কেন তাদের খোঁজা হচ্ছে এসব বিষয়ে প্রশ্ন তোলে। বাড়াবাড়ি করলে পরিণাম ভালো হবে না বলেও শাসিয়েছে অপহরণকারী চক্র।
বাহারছড়ার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, কলেজ শিক্ষার্থীসহ ৮ জন পাহাড়ী ছড়ায় সখ করে মাছ শিকারে গিয়ে অস্ত্রধারীদের কবলে পড়েন। পাহাড়ি এ এলাকা দিন দিন ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। কাউকে একা পেলে সুযোগ বুঝে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা অপহরণ করতো। কিন্তু এবারের মতো এতগুলো লোক একসঙ্গে নিয়ে যায়নি।
বাহারছড়া ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন খোকন জানান, এ ঘটনা চরম আতংকের। অপহরণকারিরা শুধু রোহিঙ্গা হতে পারে না। তাদের সঙ্গে স্থানীয় দুর্বৃত্তদের যোগসাজশ না থাকলে এলাকার লোকজনের নাম ঠিকানা এত ক্লিয়ারলি রোহিঙ্গারা জানার কথা নয়। কারা পুলিশের সঙ্গে হাঁটতেছে, প্রশাসনের সঙ্গে কারা যোগাযোগ করছে অপহরণকারীরা তাদের মোবাইলে ফোন করে তার সবিশেষ বলে হুমকি দিচ্ছে, রোহিঙ্গাদের দ্বারা এটা কখনোই সম্ভব নয়।

চেয়ারম্যান খোকন আরো জানান, মঙ্গলবার ভোরে অপহরণকারীরা অপহৃত রিদুয়ানের বাবাকে ফোন করে জিম্মি থাকা একেক জনের কাছ থেকে একেক পরিমাণ টাকা তুলে তাদের (অপহরণকারী) দেখিয়ে দেওয়া জায়গায় টাকাটি পৌঁছে দেওয়ার জন্য নির্দেশনাও দেয়। সেভাবে অপহৃতদের পরিবার টাকাও জমা করেছিল, কিন্তু পরক্ষণে টাকা জমা নেওয়া মমতাজ আবার টাকা ফেরত দিয়ে দেয়। অপহৃত কার পরিবারের আর্থিক অবস্থা কেমন তা অপহরণকারীরা কিভাবে জানলো তাও নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। ফিল্মি স্টাইলে এভাবে অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবি কতটুকু দুঃসাহসিক ঘটনা তা কেবল ভুক্তভোগীরাই জানি। অতীতে মুক্তিপণ না পেয়ে অপহৃতকে হত্যার রেকর্ডও রয়েছে। আমরা আতংকিত।
এদিকে এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে অপহরণের শিকার পরিবারগুলোতে আতংক ও আহাজারি চলছে। কোনো কোনো পরিবার টুকটাক কথা বললেও অজানা শংকায় অনেকে কোনো কথাই বলছেন না।
অপহৃত রিদুয়ানের মা রোকেয়া বেগম বলেন, অপহরণকারীদের দাবিকৃত এত টাকা আমরা কী করে দেব? এত টাকা দেওয়ার সামর্থ্য আমাদের নেই।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, অপহরণের বিষয়টি অনভিপ্রেত। আমরা খবর পেয়েই নানাভাবে কয়েকটি টিম পাহাড়ে কাজ করছি। কিন্তু অপহৃতদের স্বজনরা আমাদের কোনো তথ্য দিয়েই সহযোগিতা না করায় আমাদের বেগ পেতে হচ্ছে। অপহরণকারিদের তথ্যের আদান-প্রদান বিষয়ে তথ্য দিলে আমরা আরেকটু এগুতে পারতাম। এরপরও আমরা থেমে নেই, সবার সহযোগিতায় অপহৃতদের অক্ষতভাবে রিকভারির একটি ভালো খবর সবাইকে জানাতে পারবো আশা করছি। অভিযান অব্যাহত রেখেছি আমরা।
সায়ীদ আলমগীর/এফএ/এমএস