মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিকে বাড়ছে বিজ্ঞান শিক্ষার্থী

আমিন ইসলাম জুয়েল আমিন ইসলাম জুয়েল , জেলা প্রতিনিধি ,পাবনা
প্রকাশিত: ০৯:২১ পিএম, ১০ মার্চ ২০২৩

পাবনায় বিজ্ঞান শিক্ষায় আগ্রহ ফিরছে শিক্ষার্থীদের। তবে বেশ ধীরগতিতে। জেলায় এবার মাধ্যমিক পর্যায়ে মানবিক বিভাগের চেয়ে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীর রেজিস্ট্রেশন বেশি হয়েছে। তবে এইচএসসি পর্যন্ত বিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও অনার্স লেভেলে গিয়ে অবশ্য কমে গেছে।

অভিজ্ঞ শিক্ষকরা জানিয়েছেন, এইচএসসি পর্যন্ত বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করলে পরবর্তী উচ্চশিক্ষায় যেকোনো বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি, চিকিৎসায় স্নাতক ও প্রকৌশল বিদ্যায় স্নাতক বা স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে অধ্যয়ন করা যায়। এজন্য শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের মধ্যে এমন ইতিবাচক মনোভাব গড়ে উঠছে।

আরও পড়ুন- বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের আপত্তি মানবিকের বিষয়ে

তাদের মতে, গ্রামাঞ্চল ও বে-সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে যদি আধুনিক ল্যাব গড়ে তোলা যায় তাহলে শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞানশিক্ষায় আরও আকৃষ্ট হবে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, জেলায় ২০১০ সাল পর্যন্ত বিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষার্থীর সংখ্যা লাগাতার কমেছে। এক দশক আগে পৌর সদরগুলোতে ৯ম-১০ম শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগে সন্তোষজনক ছাত্র-ছাত্রী থাকলেও প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞান বিভাগে তেমন শিক্ষার্থী ছিল না। এমনকি কোনো কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞান বিভাগ শিক্ষার্থীশূন্য থাকত। শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানভীতি, বিজ্ঞান বিভাগে অতিরিক্ত খরচের ভয়, আশানুরূপ ফলাফল অর্জনের ভয়, দক্ষ বিজ্ঞান শিক্ষকের অভাব ও পারিবারিক সচেতনতার অভাবসহ নানাবিধ সমস্যার কারণে শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞানকে ভয় পেতো বলে অভিজ্ঞ শিক্ষকরা জানিয়েছেন।

এছাড়া ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীর সাধারণ বিজ্ঞান বিষয়ের তাত্ত্বিক শিক্ষার পাশাপাশি ব্যবহারিক শিক্ষার প্রদর্শনগুলো করা সম্ভব হত না। মানসম্পন্ন শিক্ষক এবং বিজ্ঞানাগারের যন্ত্রপাতির অভাবও একটা কারণ ছিল।

তবে সরকারের নেওয়া নানামুখী পদক্ষেপ ও প্রকল্প হাতে নেওয়ার পর থেকে বিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। এখন পাবনা জেলা শহর থেকে শুরু করে ইউনিয়ন লেভেলের হাইস্কুলেও বিজ্ঞান নিয়ে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করছে। জেলায় বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসারে বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠেছে।

জেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলায় নিম্ন মাধ্যমিক হাইস্কুল, হাইস্কুল, সরকারি হাইস্কুল, কলেজিয়েট হাইস্কুল মিলিয়ে মোট হাইস্কুল রয়েছে ৩২৮টি। দাখিল মাদরাসা রয়েছে ১৯৩টি, আলিম মাদরাসা রয়েছে ২৬টি। এইচএসসি পর্যায়ের কলেজ রয়েছে ১৫টি, স্নাতক বা তদুর্ধ্ব (সরকারি) কলেজ রয়েছে ১১টি, স্নাতক বা তদুর্ধ্ব (বে-সরকারি) কলেজ রয়েছে ৩৫টি, বিএম বা কারিগরি কলেজ রয়েছে ২৯টি। এখন এসব হাইস্কুল বা কলেজে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ক্রমশ বাড়ছে।

আরও পড়ুন- পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগ : উদ্বেগজনক হারে ঝরে পড়ছে শিক্ষার্থী

এর কারণ হিসেবে জানা গেছে, এখন বিজ্ঞান বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা নেওয়ার জন্য সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বেড়েছে। এতে শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান শিক্ষায় আগ্রহী হয়ে উঠছে। আবার অভিভাবকরাও সন্তানের ভবিষ্যৎ চিন্তায় বিজ্ঞান বিষয়কে প্রাধান্য দিচ্ছেন।

দৈবচয়ন পদ্ধতিতে পাবনার বেশ কিছু মাধ্যমিক ও কলেজে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, মন্থর গতিতে হলেও বিজ্ঞান শিক্ষায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। এক্ষেত্রে শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে গ্রাম এলাকার প্রতিষ্ঠানগুলো পিছিয়ে রয়েছে।

সুজানগর উপজেলার কাশীনাথপুর মহিলা কলেজে এইচএসসি উচ্চ মাধ্যমিকে মানবিকে রয়েছে ৩৫০ জন, বিজ্ঞান বিভাগে রয়েছে ৭৫ জন আর বাণিজ্য বিভাগে রয়েছে ৬২ জন। একই উপজেলার কদিমালঞ্চি হাইস্কুলে ১০ম শ্রেণিতে মানবিকে রয়েছে ১০০ জন আর বিজ্ঞান বিভাগে ১১০ জন।

এখানকার প্রধান শিক্ষক হাফিজুর রহমান জানান, তার শিক্ষকতা জীবন প্রায় ২০ বছরের। আগে বিজ্ঞান বিভাগে খুবই কম শিক্ষার্থী ছিল। এখন ধীরে ধীরে বাড়ছে।

সুজানগর উপজেলার সরকারি ডা. জহুরুল কামাল ডিগ্রী কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে মানবিকে রয়েছে ৩০০ জন আর বিজ্ঞান বিভাগে ১৫০ জন। সাঁথিয়া উপজেলার মাহমুদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণিতে মানবিকে রয়েছে ৪২ জন আর বিজ্ঞান বিভাগে ১০ জন।

এখানকার প্রধান শিক্ষক হেলালুজ্জামান জানান, আগের চেয়ে বিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষার্থী সাংখ্যা ধীরে হলেও বাড়ছে।

সাঁথিয়া উপজেলার ধুলাউড়ি কলেজের অধ্যক্ষ জাভেদ বাবু জানান, ১২৯ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১১১ জন মানবিক আর ৯ জন বিজ্ঞান বিভাগের। আগে এখানে বিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষার্থীরা ভর্তিই হতে চাইত না। তবে এখন ধীর গতিতে হলেও বিজ্ঞান শিক্ষার্থী বাড়ছে।

আরও পড়ুন- বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষাকে জনপ্রিয় করছে ‘সায়েন্স বী’

পাবনা জেলা শিক্ষা অফিসার রোস্তম আলী হেলালি এবছর পাবনা সদর উপজেলার ৯ম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের রেজিস্ট্রেশনকৃত ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যার পরিসংখ্যান তুলে ধরেন।

তিনি জানান, সদর উপজেলায় ৫২০০ শিক্ষার্থী মানবিক বিভাগে রেজিস্ট্রেশন করেছে আর বিজ্ঞান বিভাগে করেছে ৫৩০০ জন। এক দশক আগে কিন্তু এ অবস্থা ছিল না। বিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে।

পাবনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার জন্য প্রাইমারি লেভেল থেকেই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এজন্য শিক্ষকদের বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এমনকি বিজ্ঞান সংশ্লিষ্ট গণিতভীতি কাটাতে গণিতকে সহজবোধ্য করা ও গণিত অলিম্পিয়াড প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে শিক্ষকদের। এটি এখনও চলমান রয়েছে। এতে আনন্দদায়ক পরিবেশে শিক্ষার্থীরা গণিত শিখতে পারছে।

শহর অঞ্চলে বিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি

পাবনার অন্যতম একটি ঐতিহ্যবাহী কলেজ শহীদ সরকারি বুলবুল কলেজে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এইচএসসি পর্যন্ত বিজ্ঞান বিভাগে ছাত্র-ছাত্রী বাড়ছে। এ কলেজে এইচএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তিকৃত মোট ছাত্র-ছাত্রী ১৩৬০ জন। এর মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগেই ৬৬৩ জন, মানবিক বিভাগে ৩৫৩ জন, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগে ৩৪৪ জন। বিগত কয়েক বছরে বিজ্ঞানাগারে এসেছে বিরাট পরিবর্তন। আইসিটি ল্যাব প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে বিজ্ঞানাগারে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষগুলোতে পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি ও ল্যাব সহায়ক রয়েছে। এতে শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে শেখার সুযোগ পাচ্ছে।

তবে অনার্সে ভর্তি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ১৩২৬ সিটের বিপরীতে উদ্ভিদ বিদ্যা, রসায়ন, গণিত ও প্রাণিবিদ্যা মিলিয়ে মোট ভর্তি হয়েছে ১৩১ জন।

পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার জোড়গাছা ডিগ্রী কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নাজনীন সোমা, বৃষ্টি খাতুন ও ফাতেমাতুজ্জোহরা বলেন, সরকারি কলেজগুলোতে সমৃদ্ধ বিজ্ঞানাগার রয়েছে। সে তুলনায় তাদের কলেজ পিছিয়ে। সরকার যদি তাদের কলেজেও পর্যাপ্ত উপকরণ প্রদান করত এবং আধুনিক ল্যাব স্থাপন করত তাহলে তারা আরও উপকৃত হতে পারতেন।

পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার জোড়গাছা ডিগ্রী কলেজের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শামীম আরা শিখা জানান, তিনি প্রায় ১৯ বছর ধরে চাকরি করছেন। চাকরির শুরুতে দেখেছেন খুব কম সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী সায়েন্সে ভর্তি হত। তবে এক দশক ধরে তিনি লক্ষ্য করছেন বিজ্ঞান বিভাগে ছাত্র-ছাত্রী বাড়ছে।

তিনি জানান, বিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষার্থীরা চাকরি না পেলেও টিউশনি করে জীবিকা নির্বাহী করতে পারে। আবার বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলে তারা পরবর্তীতে বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশানা করতে পারে।

তবে একই কলেজের শিক্ষক সালাউদ্দিন বাবু জানান, বর্তমান তথ্য প্রযুক্তির যুগে বিজ্ঞান বিষয়ে যেভাবে শিক্ষার্থীদের এগিয়ে আসা দরকার সেভাবে বাড়ছে না।

এর কারণ হিসেবে তিনি জানান, মাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞান বিষয়ে ছাত্র-ছাত্রী বাড়ছে মন্থর গতিতে। শহর এলাকার তুলনায় গ্রামের শিক্ষার্থীরা একটু পিছিয়ে থাকছে। তবে আগামী দিনের বিপ্লব হবে তথ্য প্রযুক্তির বিপ্লব। সেজন্য বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা আরও দ্রুত গতিতে বাড়া দরকার।

সরকারি শহীদ বলুবুল কলেজের অধ্যক্ষ বাহেজ আলী জানান, সরকার প্রতিবছর এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক, নিম্ন মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লাখ লাখ টাকা ব্যয়ে বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি দিয়ে থাকে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়। এর সুফল পৌঁছানো শুরু হয়েছে। ধীর গতিতে হলেও বিজ্ঞান শিক্ষার বিষয়ে শিক্ষার্থীরা আগ্রহী হয়ে উঠছে।

এফএ/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।