বারি-২০ সরিষায় নতুন দিশা
আমন ও বোরো ধানের দুই মৌসুমের মধ্যবর্তী সময় অল্প। পতিত থাকতো অধিকাংশ জমি। এখন দুই ফসলের মধ্যবর্তী সময়ে দেশজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে সরিষার চাষাবাদ। বিষয়টি মাথায় রেখেই স্বল্পমেয়াদি সরিষার জাত উদ্ভাবনের চেষ্টা করছেন কৃষি বিজ্ঞানীরা। যার নতুন দিশা বারি সরিষা-২০।
বারি সরিষা-২০ স্বল্পমেয়াদি ও উচ্চ ফলনশীল, যা বিদ্যমান জাতের তুলনায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেশি ফলন দেয়। পাশাপাশি এ সরিষার জাতটি লবণাক্ততা ও খরা সহনশীল। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) উদ্ভাবিত এ জাতটি দেশের অন্যতম সরিষা উৎপাদনকারী এলাকা সিরাজগঞ্জে সম্প্রসারণে সহায়তা করছে পার্টনার (প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্ট্রারপ্রেনারশিপ অ্যান্ড রেসিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ) প্রকল্প।
সরেজমিনে সিরাজগঞ্জের কয়েকটি এলাকায় দেখা যায়, কম সময়ে ভালো ফলন দিতে সক্ষম এবং বারি-১৪ কিংবা আগের অন্য জাতের তুলনায় উন্নত হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে এ নতুন জাত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।
এছাড়া আগে যেখানে আমন চাষের পরে প্রচুর জমি বোরো পর্যন্ত অনাবাদি থাকতো, এখন সেগুলোতে বারি-২০ সরিষা চাষাবাদ সম্প্রসারণের চেষ্টা করা হচ্ছে।

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার সয়দাবাদ ইউনিয়নের যমুনার চরপূর্ব মোহনপুর গ্রামে সরিষার নতুন এ জাতের একশ বিঘার একটি বিশাল প্রদর্শনী করা হয়েছে। যেখানে আগে অন্য জাতের সরিষা আবাদ হলেও এখন বারি-২০ এ ঝুঁকেছেন কৃষক। পার্টনার প্রকল্পের আওতায় ৩৫ জন কৃষকের জমিতে নতুন এ জাতের সরিষার প্রদর্শনী দেওয়া হয়েছে।
সরিষা উৎপাদন দিন দিন বাড়ার কারণে এখন মধু উৎপাদনেও দেশের একক সেরা উপজেলা এ উল্লাপাড়া। এখানে সরিষা ও মধু চাষে শত শত বেকারের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে। গত বছর এ উপজেলায় ১৮৩ টন মধু উৎপাদন হয়েছে, এবার ১৯৫ টন হবে বলে আশা করছি।- উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুবর্ণা ইয়াসমিন
প্রদর্শনী এলাকায় বারির সরেজমিনে গবেষণা বিভাগের সহকারী বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘ওইসব জমিতে পাইলট প্রোডাকশন হিসেবে কৃষকদের বীজ, সারসহ নানান প্রযুক্তি সরবরাহ করা হয়েছে। ৭৫ থেকে ৮০ দিনের মধ্যেই এ সরিষা তোলা যায়। এখন প্রায় দুই মাসের কাছাকাছি সময় সরিষাগুলো মাঠে রয়েছে। এবার উৎপাদন খুব ভালো। সরিষার পরই এ মাঠে বোরো চাষ হবে। এ জাতটি প্রতি বিঘায় ছয় থেকে সাত মণ ফলন হবে। এতে তেলেরও পরিমাণ বাড়বে, কৃষকরা লাভবান হবেন।’
কৃষক আব্দুল আউয়াল বলেন, ‘প্রদর্শনীর মধ্যে আমার সাড়ে তিন বিঘা জমি রয়েছে। আগে আমন কাটার পরে জমিটা পতিত থাকতো। এবার কৃষি বিভাগের পরামর্শে বারি সরিষা-২০ চাষ করেছি। আশা করছি, ভালো ফলন পাবো।’
সিরাজগঞ্জ জেলা দেশের শীর্ষ সরিষা উৎপাদনকারী জেলাগুলোর অন্যতম। বিগত কয়েক বছর সেখানে প্রায় ৯০ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে সরিষার আবাদ হচ্ছে। ভোজ্যতেল উৎপাদনের পাশাপাশি এ এলাকা দেশের মধু উৎপাদনের একটি বড় হাবে পরিণত হয়েছে এ সময়। শীতকালে অনুকূল আবহাওয়ায় গত কয়েক বছর এ এলাকার চাষিরা সরিষায় বাম্পার ফলন পেয়েছেন। সরিষার পাশাপাশি ক্ষেতের সঙ্গে মধুচাষেও বাড়তি আয় করতে পারছেন অনেক চাষি।
আরও পড়ুন
যে কারণে সরিষা চাষ করে লাভবান হচ্ছেন চাষিরা
ঝিনাইদহে মাঠজুড়ে হলুদ ঢেউ, ভালো ফলনের আশা
বিনা চাষে সরিষার নতুন সম্ভাবনা, বাড়বে উৎপাদন
নড়াইলে রেকর্ড পরিমাণ সরিষা আবাদে ভাগ্য খুলেছে মৌচাষিদের
এর মধ্যে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলায় এবার প্রায় ৯ হাজার হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাসিম হোসেন জানান, গত বছরের চেয়ে এবার প্রায় ২০০ হেক্টর জমিতে আবাদ বেড়েছে। প্রতি বছরই এ উপজেলায় সরিষা বাড়ছে।
একক উপজেলা হিসেবে সিরাজগঞ্জের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সরিষা হয় উল্লাপাড়া উপজেলায়। সেখানকার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুবর্ণা ইয়াসমিন বলেন, ‘সরিষা উৎপাদন দিন দিন বাড়ার কারণে এখন মধু উৎপাদনেও দেশের একক সেরা উপজেলা এ উল্লাপাড়া। এখানে সরিষা ও মধু চাষে শত শত বেকারের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে। গত বছর এ উপজেলায় ১৮৩ টন মধু উৎপাদন হয়েছে, এবার ১৯৫ টন হবে বলে আশা করছি।’

তিনি বলেন, ‘আগে এ এলাকায় কিছু পুরোনো ও অঞ্চলিক জাতের সরিষা চাষ হতো। এর বাইরে গত কয়েক বছর বারি-১৪, বারি-১৫ ও বারি-১৭ চাষ জনপ্রিয় হয়েছে। এখন সেগুলোর চেয়ে আরও উন্নত বারি-২০ জাতের সম্প্রসারণের কাজ হচ্ছে।’
বাংলাদেশে বছরে ২৪ লাখ টন ভোজ্যতেলের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র দুই থেকে আড়াই লাখ টন তেল দেশে উৎপাদন হচ্ছে। আমদানির মাধ্যমে বাকি তেলের চাহিদা মেটাতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। আমরা চাই সরিষা চাষাবাদের মাধ্যমে ভোজ্যতেলের চাহিদার বড় অংশ পূরণ করতে। যে কারণে উন্নত জাতের চাষাবাদ প্রয়োজন।- পার্টনার প্রকল্পের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর (পিসি) আবুল কালাম আজাদ
সদরের মতো উল্লাপাড়ায় পার্টনার প্রকল্পের আওতায় বারি-৩ এর তিনটি প্রদর্শনী দেওয়া হয়েছে উল্লাপাড়ায়। সেসব মাঠে গিয়েও দিগন্তজুড়ে সরিষার হলুদ ফুল দেখা যায়।
জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক একে মনজুরে মওলা জাগো নিউজকে বলেন, ‘বারির অন্য জাতগুলো প্রতি বিঘায় চার থেকে পাঁচ মণ সরিষার ফলন হয়। সেগুলোর চেয়ে বারি-২০ এর ফলন বেশি। এছাড়া স্বল্পমেয়াদি, যা বোরোর আগে আরেকটি ফসল করার জন্য কৃষকদের উৎসাহিত করছে। সেজন্য আমরা আগামীতে নতুন জাতটি মাঠে সম্প্রসারণ করতে চাই।’

এ কর্মকর্তা জানান, এ বছর সিরাজগঞ্জে ৯০ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে সরিষার চাষ হচ্ছে। যেটা গত বছর ছিল ৮৭ হাজার হেক্টর। কোনো ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় না ঘটলে প্রায় ১ লাখ ৪৬ হাজার টন সরিষা উৎপাদন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এছাড়া এ এলাকায় সরিষার বিস্তৃতির কারণে মধু চাষ সমৃদ্ধ হচ্ছে। এবছর পুরো জেলায় ৪ লাখ ৪ হাজার কেজি মধু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। গত বছর প্রায় ২৫৮ জন মৌচাষি এ এলাকায় মধুচাষ করেন। এ মৌসুমে এখন পর্যন্ত ২২০ জন এসে পৌঁছেছেন বলে তথ্য দেন এ কৃষি কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, ‘সরিষা ও মধু বিবেচনা করলে সিরাজগঞ্জে ১২শ কোটি থেকে ১২শ ৫০ কোটি টাকার বাজারমূল্য রয়েছে। আমরা যদি আধুনিক জাত সম্প্রসারণ করতে পারি এ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হবে।’

এদিকে পার্টনার প্রকল্পের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর (পিসি) আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘বাংলাদেশে বছরে ২৪ লাখ টন ভোজ্যতেলের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র দুই থেকে আড়াই লাখ টন তেল দেশে উৎপাদন হচ্ছে। আমদানির মাধ্যমে বাকি তেলের চাহিদা মেটাতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। আমরা চাই সরিষা চাষাবাদের মাধ্যমে ভোজ্যতেলের চাহিদার বড় অংশ পূরণ করতে। যে কারণে উন্নত জাতের চাষাবাদ প্রয়োজন। সে চিন্তা থেকে পার্টনার প্রকল্প থেকে এবার সারাদেশে ৬৫৭টি সরিষার প্রদর্শনী দিয়েছে। এর মধ্যে বারি-২০ এর নতুন নতুন প্রদর্শনী যুক্ত করা হয়েছে।’
এনএইচ/এএসএ/এমএফএ/এএসএম