চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম দ্রুত স্বাভাবিক করার আহ্বান ইউরোচ‍্যামের

বিশেষ সংবাদদাতা
বিশেষ সংবাদদাতা বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০২:৩৩ পিএম, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

চট্টগ্রাম বন্দরে চলমান অচলাবস্থা দ্রুত নিরসন করে স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরায় শুরু করার আহ্বান জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (ইউরোচ‍্যাম বাংলাদেশ)।

সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন দেশের রপ্তানি খাতের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, অর্থনৈতিক ক্ষতি বাড়াচ্ছে এবং বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের সরবরাহ ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।

শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) দেওয়া এক বিবৃতিতে ইউরোচ‍্যাম বাংলাদেশ জানায়, কাজ বন্ধ থাকার কারণে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরে রপ্তানি কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। এতে হাজার হাজার কনটেইনার আটকে আছে এবং রপ্তানির নির্ধারিত সময়সূচি ভেঙে পড়ছে।

চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের মোট আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ৯০ শতাংশের বেশি পরিচালনা করে এবং রপ্তানিনির্ভর শিল্পগুলোর প্রধান প্রবেশদ্বার। স্বাভাবিক সময়ে এ বন্দর দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ রপ্তানি কনটেইনার পরিবহন হয়। তবে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে কাজ বন্ধ থাকায় কনটেইনার চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।

ইউরোচ‍্যামের সদস্য প্রতিষ্ঠান ও বাংলাদেশ থেকে পণ্য সংগ্রহকারী ইউরোপীয় ব্র্যান্ডগুলো পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়, রপ্তানি সময়সূচি ভেঙে পড়ায় পণ্য সরবরাহে বিলম্ব হচ্ছে এবং অতিরিক্ত পরিবহন ও লজিস্টিক ব্যয় বাড়ছে। বর্তমানে বন্দরের টার্মিনাল, বেসরকারি ডিপো ও জাহাজে আটকে থাকা প্রায় ১৩ হাজার কনটেইনারে আনুমানিক ৬৬ কোটি মার্কিন ডলারের (প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা) রপ্তানি পণ্য আটকে আছে।

ইউরোচ‍্যাম বাংলাদেশ বলেছে, নিরবচ্ছিন্ন, পূর্বানুমানযোগ্য ও দক্ষ বন্দর কার্যক্রম রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে, বিদেশি চাহিদার সঙ্গে যুক্ত লাখো মানুষের কর্মসংস্থান সুরক্ষিত রাখতে এবং ইউরোপ ও বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের একটি নির্ভরযোগ্য সোর্সিং গন্তব্য হিসেবে সুনাম বজায় রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সংস্থাটি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছে, দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা বৈশ্বিক ক্রেতাদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে এমন সময়ে যখন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো সরবরাহ ব্যবস্থার ঝুঁকি ও সময়মতো ডেলিভারির বিষয়ে আরও সংবেদনশীল।

এ পরিস্থিতিতে ইউরোচ‍্যাম বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে— চট্টগ্রাম বন্দরের পূর্ণাঙ্গ ও স্বাভাবিক কার্যক্রম দ্রুত নিশ্চিত করা, জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষিত রেখে চলমান বিরোধগুলো গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা এবং দক্ষতা, নির্ভরযোগ্যতা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতাশীলতা বাড়াতে বন্দর আধুনিকায়ন কার্যক্রম জোরদার করা।

ইউরোচ‍্যাম বাংলাদেশ জানিয়েছে, তারা ব্যবসা সম্প্রসারণে সহায়তা এবং দেশের বাণিজ্য অবকাঠামো শক্তিশালী করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একই সঙ্গে একটি স্থিতিশীল, দক্ষ ও ভবিষ্যৎমুখী বন্দর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে কাজ করতে প্রস্তুত রয়েছে।

ইউরোচ‍্যামের তথ্যমতে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ৮ লাখ ৩১ হাজারের বেশি রপ্তানি কনটেইনার পরিবহন হয়েছে, যার মোট মূল্য ছিল ৪২ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশ আসে বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাত থেকে, যা দেশটিকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারকে পরিণত করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানি সম্প্রতি ৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরে ফের ধর্মঘটের ডাক

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা না দেওয়ার সুস্পষ্ট সরকারি ঘোষণাসহ চার দাবিতে ফের অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট ডেকেছে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। আগামীকাল (৮ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে পুনরায় ধর্মঘট শুরু হবে।

শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. ইব্রাহীম খোকন।

বাকি তিনটি দাবি হচ্ছে- ‘চট্টগ্রাম বন্দরের প্রধান সংকটের কারণ’ বর্তমান চেয়ারম্যান এসএম মনিরুজ্জামানকে বন্দরের চেয়ারম্যান পদ থেকে প্রত্যাহার করা। বিগত আন্দোলনে যেসব কর্মচারীর বিরুদ্ধে বদলি, চার্জশিট, সাময়িক বরখাস্ত, পদাবনতিসহ নানাবিধ শাস্তিমূলক যে ব্যবস্থা নিয়েছে তা বাতিল করে প্রত্যেক কর্মচারীকে চট্টগ্রাম বন্দরের স্ব স্ব পদে পুনর্বহাল করতে হবে। আন্দোলনরত শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে মামলাসহ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না।

এ সময় চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা পরিষদের সমন্বয়ক শ্রমিকদল নেতা মো. হুমায়ুন কবীর, ডক জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি মো. হারুন, সাধারণ সম্পাদক তসলিম হোসেন সেলিম, কার্যকরী সভাপতি আবুল কাসেম, মার্চেন্ট শ্রমিক ইউনিয়নের সমন্বয়ক ইয়াসিন রেজা রাজু, জাহিদ হোসেন, মো. হারুন, উইন্সম্যান সমিতির ইমাম হোসেন খোকন, শরীফ হোসেন ভুট্টো প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধের দাবিতে এর আগে গত ৩১ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি আট ঘণ্টা কর্মবিরতি পালন করে এবং ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি বিকেল পর্যন্ত টানা কর্মবিরতি পালন করেছে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। এ সময় বন্দর থেকে আমদানি পণ্য চালান ডেলিভারি, রপ্তানির পণ্য খালাস, কনটেইনার হ্যান্ডলিং এমনকি বন্দর জেটিতে জাহাজ আনা-নেওয়া বন্ধ হয়ে যায়।

৫ ফেব্রুয়ারি দুপুরে শ্রমিকদের সঙ্গে বৈঠকের পর নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেনের আশ্বাসে দুই দিনের জন্য কর্মবিরতি স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছিলেন শ্রমিক নেতারা।

পরে ৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় আন্দোলনে জড়িত মোংলা ও পায়রা বন্দরে সংযুক্ত আন্দোলনের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবীরসহ ১৫ জনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা এবং স্থাবর অস্থাবর সম্পদ তদন্তে দুদকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নৌ পরিবহন সচিবকে চিঠি দেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ।

আইএইচও/এমএমএআর/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।