বন্দরে কর্মবিরতি

রপ্তানিতে ৩ হাজার কোটি টাকা ক্ষতির শঙ্কা

এমদাদুল হক তুহিন
এমদাদুল হক তুহিন এমদাদুল হক তুহিন , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৪:৩৬ পিএম, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
চট্টগ্রাম বন্দরে কর্মবিরতির ফলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ব্যবসায়ীরা, ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) ইজারা নিয়ে শ্রমিকদের সাত দিনের কর্মবিরতিতে দেশের আমদানি-রপ্তানিতে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এতে দেশের অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। সাত দিনের অচলাবস্থায় তিন হাজার কোটি টাকার প্রত্যক্ষ ক্ষতিসহ আট হাজার ৭২ কোটি টাকার রপ্তানি পণ্য বন্দরে আটকা পড়ে। একই সঙ্গে পোশাক রপ্তানিতেই প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা। তবে চূড়ান্ত ক্ষতির হিসাব কষছে তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

তথ্যমতে, এনসিটি চুক্তি বাতিল ও ১৫ কর্মচারীর বদলি আদেশ প্রত্যাহারসহ চার দফা দাবিতে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ ৩১ জানুয়ারি থেকে তিন দিন আট ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালন করে। পরে ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি পালন করে। ৫ ফেব্রুয়ারি নৌ-উপদেষ্টার বন্দর পরিদর্শনের পর দুই দিনের জন্য কর্মসূচি স্থগিত করা হয়। তবে সাময়িক বিরতির পরও বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক পদক্ষেপের কারণে উত্তেজনা আবার বাড়ে। ফলে রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকে শ্রমিকরা পুনরায় অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট শুরু করেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রমজানের পণ্য খালাস করার কথা বলে পরদিন সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কর্মসূচি স্থগিত করেন আন্দোলনরত কর্মচারীরা। এর মধ্যে তাদের পাঁচটি সমস্যা সমাধান না হলে ১৬ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ।

আরও পড়ুন

সোমবার থেকে বন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক হলেও এই অস্থিরতা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যাপক ক্ষতি করেছে। দেশের রপ্তানি আয়ে তা ব্যাপকভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন রপ্তানিকারকরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরের সাম্প্রতিক ধর্মঘটে দেশের অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। ছয় দিনের অচলাবস্থায় প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার প্রত্যক্ষ ক্ষতিসহ ৬৬ কোটি ডলারের (প্রতি ডলার ১২২.৩ টাকা হিসেবে আট হাজার ৭২ কোটি টাকা) রপ্তানি পণ্য আটকা পড়ে। প্রতিদিন প্রায় ১৯০ কোটি টাকা রাজস্ব হারানো ছাড়াও জাহাজ ও কনটেইনার জটে আমদানিকারকদের বিপুল ডেমারেজ গুনতে হচ্ছে। এই স্থবিরতা সরবরাহ চেইন ব্যাহত করে নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের বাণিজ্যিক ভাবমূর্তি নষ্ট করছে।’

চট্টগ্রাম বন্দরে অচলাবস্থ

২৫ কোটি ডলারের বেশি ক্ষতির আশঙ্কা 

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনে (বিকেএমইএ) বলছে, তৈরি পোশাক খাতে মাসে ৩০০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। সে হিসাবে দিনে রপ্তানি হয় ১০ কোটি ডলারের পণ্য। সংগঠনটির সভাপতির ধারণা, দিনে যে পরিমাণ পোশাক রপ্তানি হয় ক্ষতি হয়েছে তার অর্ধেক। সে হিসাবে দিনে ক্ষতি অন্তত পাঁচ কোটি ডলার। পাঁচ দিনে এই ক্ষতি দাঁড়ায় ২৫ কোটি ডলার, টাকার অঙ্কে যা তিন হাজার কোটি টাকার বেশি।

বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের বিশাল পরিমাণে ক্ষতি হয়েছে। আমরা যদি প্রতি মাসে আমাদের রপ্তানি ধরি অন্তত তিন বিলিয়ন ডলার, তাহলে দিনে যে পরিমাণ রপ্তানি হয় তার ফিফটি পারসেন্ট ক্ষতি হয়েছে।’

বিমানে পণ্য রপ্তানি করতে হয়েছে কিনা বা করে থাকলে ক্ষতি কেমন এমন এক প্রশ্নের উত্তরে মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘এয়ারে পাঠানো মানে হচ্ছে—আমাদের যা এক্সপোর্ট ভ্যালু, ওই ভ্যালুর ৬০ শতাংশ এয়ার ফ্রেইট বাবদ চলে যায়। যে পণ্যগুলো পোর্ট দিয়ে রপ্তানি করা যায়নি, সেগুলো এয়ারে এনে আমাদের পাঠাতে হয়েছে। পাঁচ দিনে যে পণ্য রপ্তানি হতো তার অন্তত ২৫ শতাংশ এয়ারে পাঠাতে হয়েছে। এতে আমাদের ৬০ শতাংশ বেশি খরচ হয়েছে।’

আরও পড়ুন

ক্ষতির প্রকৃত হিসাব কষছে বিজিএমইএ

ক্ষতির প্রকৃত হিসাব জানতে তথ্য সংগ্রহ করছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। জানতে চাইলে বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘ক্ষতির হিসাব এখনও করছি। ক্ষতি তো অনেক হয়েছে। ক্ষতির হিসাব তো ইন্সট্যান্টলি দেওয়া যাবে না। এখানে এক্সপোর্ট আছে, ইমপোর্ট আছে, কারেন্ট শিপমেন্ট আছে। ফ্যাক্টরি থেকে ডেটাগুলো আমরা কালেক্ট করছি। কার কার কতো শিপমেন্ট ছিলো, কার কতোটুকু আটকেছিলো, প্রত্যেক ফ্যাক্টরি থেকে আমরা সেই তথ্য সংগ্রহ করছি।’

জানতে চাইলে বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের (বিইএফ) সভাপতি ও বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান জাগো নিউজকে বলেন, ‘বন্দরের অস্থিরতা ও ধর্মঘটের কারণে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তার সঠিক কোনো ডাটা নেই। কিংবা চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কেউ পণ্য ফেরত এনে বিমানে পাঠিয়েছেন এমন তথ্যও জানা নেই।’

বন্দরের অস্থিরতায় সামগ্রিক ক্ষতির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এসব কারণে ক্রেতাদের কাছে আমাদের আস্থা নষ্ট হয়। ক্রেতারা পণ্য পাবে কিনা জানেন না, বিদেশি জাহাজগুলো তখন বাংলাদেশকে রিস্ক কান্ট্রি হিসেবে গণ্য করে। তখন জাহাজের ভাড়া ও বিমার খরচ বাড়িয়ে দেয়। এগুলো ইমেজে সমস্যার তৈরি করে। টাকার অঙ্কে ক্ষতি তো আছেই, তার চেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ইমেজের। টাকার সমস্যা না হয় ধীরে ধীরে কেটে যাবে, কিন্তু বদনাম একবার হয়ে গেলে তা কাটিয়ে উঠতে বহু সময় লাগে।’

আরও পড়ুন

বন্দরে এবারই প্রথম পণ্য খালাস বা ওঠানামা বন্ধ ছিলো কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাস বা ওঠানামা বন্ধ হওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। চট্টগ্রাম বন্দরের কয়েক দশকের ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা, শ্রমিক আন্দোলন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কার্যক্রম সম্পূর্ণ বা আংশিক বন্ধ থাকার একাধিক নজির রয়েছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং বেশ কিছুদিন পুরোপুরি বন্ধ ছিল। আশি ও নব্বইয়ের দশক এ দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ঘনঘন হরতালের কারণে বন্দরে পণ্য খালাস ও পরিবহন অসংখ্যবার স্থবির হয়ে পড়েছিল। ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বন্দরে বড় ধরনের সংস্কার কার্যক্রম চালানোর সময় কিছুদিনের জন্য স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয়েছিল।’

‘২০১৮-২০২২ সালের বিভিন্ন সময়ে লাইটারেজ জাহাজ শ্রমিক, বার্থ অপারেটর এবং প্রাইম মুভার ট্রেলার চালকদের ধর্মঘটের কারণে কয়েক দিন করে বন্দরে পণ্য ডেলিভারি বন্ধ ছিল। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় জুলাই ও আগস্ট মাসে ইন্টারনেট শাটডাউন এবং কারফিউর কারণে বন্দরের কনটেইনার খালাস ও অপারেশনাল কার্যক্রম কয়েক দফা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আগে সাধারণত ১-২ দিনের জন্য কার্যক্রম ব্যাহত হতো। কিন্তু বর্তমানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতি এবং রমজান মাসের আমদানির চাপের কারণে দীর্ঘমেয়াদি ধর্মঘট আগের চেয়ে অনেক বেশি মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। তাই এটি এবার বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।’ বলে জানান ডিসিসিআই সভাপতি।

ইএইচটি/এমএমএআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।