দ্বিতীয় রিফাইনারি হলে আমাদের জ্বালানি সংকট আরও ৩-৪ মাস পরে আসতো
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। ইরান যুদ্ধে সারা বিশ্বে জ্বালানি সংকট তৈরি হলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার করুণ চিত্র সামনে আসতে থাকে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই পেট্রোলিয়াম জ্বালানি নিয়ে সারাদেশে চলছে টানাপোড়েন।
দেশে চলমান জ্বালানি সংকটের কারণ ও উত্তরণের উপায় নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেন দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের সাবেক মহাব্যবস্থাপক ইঞ্জিনিয়ার মনজারে খোরশেদ আলম। বর্তমানে তিনি যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের পর্ষদে পরিচালক ও ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ (ইআইবি) চট্টগ্রামের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক ইকবাল হোসেন।
জাগো নিউজ: বাংলাদেশের জ্বালানি সেক্টরে আপনার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় রিফাইনারিতে আপনি সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। পেট্রোলিয়াম জ্বালানি উৎপাদনের অভিজ্ঞতা আপনার রয়েছে। বর্তমানে জ্বালানি নিয়ে দেশে বহুমুখী সংকটে। এ সংকট কেন?
প্রকৌশলী মনজারে খোরশেদ আলম: জ্বালানি নিরাপত্তা দেশের নিরাপত্তার চেয়ে কম নয়। জ্বালানি নিরাপত্তা একটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করে। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ইস্যুতে আমাদের চোখের সামনে অনেকগুলো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রথমত, আন্তর্জাতিক রীতি অনুসারে একটি দেশের জ্বালানি মজুত থাকা উচিত অন্তত তিন থেকে ছয় মাস। আমাদের দেশে বর্তমানে এক থেকে দেড় মাসের বেশি রিজার্ভ রাখার সক্ষমতা নেই। কৌশলগত রিজার্ভ কমপক্ষে তিন মাসের গড়ে তোলা প্রয়োজন।’
জ্বালানির কৌশলগত মজুত বাড়ানোর জন্য বেশি টেকনোলজিও দরকার নেই, বিশেষজ্ঞও দরকার নেই। শুধু সরকারের সদিচ্ছা, বাজেট ও জমি- সবগুলোই আমাদের কাছে বিদ্যমান। শুধু ট্যাংক ফার্ম নির্মাণ করলেই জ্বালানি মজুত রাখা সহজ হবে
জাগো নিউজ: জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বিপিসি ৪৫ দিনের কৌশলগত মজুত রাখার কথা বলে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের পর দেখা গেলো বাংলাদেশে ১৪-১৫ দিনের জ্বালানি মজুত রয়েছে। এমন পরিস্থিতি কেন? মজুত বাড়াতে কেমন পদক্ষেপ নিতে হবে?
প্রকৌশলী মনজারে খোরশেদ আলম: আমরা কি জানতাম না? বিশ্বে কি এরকম যুদ্ধ হতো না? আমরা কোনোদিন এ ধরনের ঘটনার মুখোমুখি হবো সেটা কি বুঝতাম না? এটা আমরা বুঝতাম। কিন্তু যে কোনো কারণে এটা করা হয়নি। আমাদের রিজার্ভ সক্ষমতা তিন থেকে ছয় মাসের বাড়ানো উচিত।’
জ্বালানির কৌশলগত মজুত বাড়ানোর জন্য বেশি টেকনোলজিও দরকার নেই, বিশেষজ্ঞও দরকার নেই। শুধু সরকারের সদিচ্ছা, বাজেট ও জমি- সবগুলোই আমাদের কাছে বিদ্যমান। শুধু ট্যাংক ফার্ম নির্মাণ করলেই জ্বালানি মজুত রাখা সহজ হবে।
ইস্টার্ন রিফাইনারি যে এসপিএম প্রজেক্ট করেছে, সেখানে মহেশখালীতেও আমাদের একটি ট্যাংক ফার্ম রয়েছে। সেখানেও নতুন ট্যাংক ফার্ম তৈরির আরও জায়গা রয়েছে। সেগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে। সুতরাং, দেরিতে হলেও কৌশলগত জ্বালানি মজুতের পদক্ষেপ দ্রুত নেওয়া দরকার।
জাগো নিউজ: ইআরএল-২ প্রকল্পটি দীর্ঘদিন ধরে বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এটি বিলম্বিত হওয়ার কারণ কী?
প্রকৌশলী মনজারে খোরশেদ আলম: ইস্টার্ন রিফাইনারিতে আমি দীর্ঘদিন কাজ করেছি। আমরা যখন মাঝারি পর্যায়ের প্রকৌশলী ছিলাম তখন থেকেই দ্বিতীয় রিফাইনারি সম্পর্কে কথাবার্তা শুনে আসছি। দ্বিতীয় রিফাইনারি করার জন্য যেসব জায়গা দরকার, সেজন্য পাশের জিএম প্ল্যান্ট থেকে প্রচুর জায়গা নেওয়া হয়েছে।
যদি দ্বিতীয় রিফাইনারি করতে পারতাম, তাহলে জ্বালানির চলমান সংকটটা আমাদের আরও তিন-চার মাস পরে আসতো। বিশ্বের সংকটের মধ্যেও আমরা তিন-চার মাস স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে পারতাম। আমরা সে সুযোগটা বারবার নষ্ট করি
আওয়ামী লীগ আমলে ২০০৮ সালে তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথমবার চট্টগ্রামে এসে ঘোষণা করেছিলেন দ্বিতীয় রিফাইনারি চালু করবেন। তিনি ১৫ বছর দেশ শাসন করেছেন, আমরা দ্বিতীয় রিফাইনারির মুখ দেখিনি।
আমরা আশা করেছিলাম, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেই কাজটা (ইআরএল-২) দ্রুত শুরু করবেন। আমরা আশ্বস্ত হয়েছিলাম। কিন্তু জানি না, একবার সিদ্ধান্ত নেয়- আমরা আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে রিফাইনারিটি করবো, পরক্ষণেই কথা হয় আমরা বাইরের ঋণে করবো। আওয়ামী লীগ আমলেও একই বিষয় আমরা দেখেছি। এখান থেকে ফান্ড নেবো, ওইখান থেকে ফান্ড নেবো, কন্ট্রাক্টে (পিপিপি) দেবো। এই কাহিনির যেন শেষ হয় না।
আরও পড়ুন
জ্বালানি মজুত সক্ষমতা না বাড়ালে ঝুঁকিতে পড়বে বাংলাদেশ
৮ এপ্রিল শেষ হতে পারে ক্রুডের মজুত, বন্ধের হুমকিতে ইস্টার্ন রিফাইনারি
আমরা চাই, আজ যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, যদি দ্বিতীয় রিফাইনারি করতে পারতাম, তাহলে জ্বালানির চলমান এ সংকট আমাদের আরও তিন-চার মাস পরে আসতো। বিশ্বের সংকটের মধ্যেও আমরা তিন-চার মাস স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে পারতাম। আমরা সে সুযোগটা বারবার নষ্ট করি। আমার মনে হয়- আমাদের সরকারের অভ্যন্তরে কোনো চক্র, অথবা কোনো অদৃশ্য শক্তি কাজ করে, যারা আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর দাঁড়াতে দিচ্ছে না।
জাগো নিউজ: বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন আমলা নিয়ন্ত্রিত। সরকার সময়ে সময়ে চেয়ারম্যান ও পরিচালক নিয়োগ দেয় বিপিসিতে। কোনো একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর একই কর্মকর্তা বাস্তবায়ন পর্যায়ে থাকেন না। কোনো বিষয়ে জ্ঞান নেওয়ার পর অন্যত্র বদলি হয়ে যান। এতে জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয় কি না? হলে এটি পুরো জ্বালানি সেক্টরকে প্রভাবিত করে কি না?
প্রকৌশলী মনজারে খোরশেদ আলম: এই জ্বালানি সেক্টরটা পুরোটাই প্রযুক্তিনির্ভর। এখানে যারা লিডিং পজিশনে থাকবেন, তাদেরও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যক্তিত্ব হওয়া উচিত। আমরা দেখি সেখানে যারা সিদ্ধান্ত দেবেন, যারা চিন্তা-ভাবনা করবেন, যারা পরিকল্পনা করবেন, সেই লিডিং পজিশনে তারা কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর ব্যক্তি নন। এটা একটা সমস্যা। এটা আমাদের রিভিউ করা দরকার। সঠিক পদে সঠিক মানুষ পদায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
এলপিজি বলতে গেলে পুরোটাই বেসরকারি। সরকার মোট চাহিদার মাত্র এক শতাংশ জোগান দেয়। বাকি ৯৯ শতাংশ বেসরকারি। জ্বালানির মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যেটা মানুষের জীবনযাত্রার ওপর ব্যাপকভাবে প্রভাব সৃষ্টি করে, সেটাতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকা দরকার
এখানে যারা আসেন, বিশেষ করে বিপিসিতে ওনারা আসার পরে দেখা যায় জ্বালানি সেক্টর নিয়ে ওনাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকে না। এখানে (বিপিসি) আসার পর কিছুদিন শিখতে শিখতে তারা আবার পদোন্নতি পেয়ে অন্যখানে চলে যান। তাহলে আমাদের এখানে দীর্ঘমেয়াদি কাজ করার সুযোগ কোথায় থাকলো? পরিকল্পনা নেওয়ার সুযোগ কোথায় থাকলো? আমাদের এমন ব্যবস্থা করা উচিত যাতে সঠিক ব্যক্তি এসে অন্তত একটি পরিকল্পনা নিয়ে সুষ্ঠুভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। এখন এলাম, এখন চলে গেলাম, এরকম সিস্টেম যাতে না থাকে। এটা আমাদের ভেবে দেখা দরকার।
জাগো নিউজ: বাংলাদেশে এলএনজি এবং এলপিজির প্রায় পুরোটাই আমদানি করতে হয়। এলএনজি সরকারিভাবে আমদানি ও ব্যবস্থাপনা হলেও এলপিজির নিয়ন্ত্রণ প্রাইভেট সেক্টরের হাতে। সংকট মোকাবিলায় সরকারকে কেমন পদক্ষেপ নিতে হবে?
প্রকৌশলী মনজারে খোরশেদ আলম: এলপিজি বলতে গেলে পুরোটাই বেসরকারি। সরকার মোট চাহিদার মাত্র এক শতাংশ জোগান দেয়। বাকি ৯৯ শতাংশ বেসরকারি। জ্বালানির মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যেটা মানুষের জীবনযাত্রার ওপর ব্যাপকভাবে প্রভাব সৃষ্টি করে, সেটাতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকা দরকার। অন্তত ৫০ শতাংশ হলেও সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত।
আরও পড়ুন
এলএনজি নিয়ে আপাতত ‘চিন্তা নেই’, ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা
বিপিসির মোংলা জেটিতে ভেড়ে না জাহাজ, ফাঁকা তেলের ট্যাংক
সে হিসেবে সরকারের উচিত ছিল দেশে সরকারি উদ্যোগে কিছু এলপিজি প্ল্যান্ট করা, কিছু এলপিজি স্টোরেজ গড়ে তোলা। বিগত সময়ে সরকার নানান কারণে সেটি করেনি। হয়তো বা বেসরকারি লেভেলে যারা আছেন তাদের প্রভাবের কারণে, হয়তো তদবিরের কারণে সেটা করে উঠতে পারেনি। আমার জানা মতে, বিগত অন্তর্বর্তী সরকার শেষ সময়ে কিছু তৎপরতা চালিয়েছিল। বিভিন্ন এলপিজি প্ল্যান্টে নিজেদের মজুত গড়ে তোলা- সেটা এখন কী অবস্থায় আছে, সেটা জানি না।
জাগো নিউজ: বাংলাদেশ ২০২৩ সালে বেসরকারি জ্বালানি নীতিমালা করে। অভিযোগ আছে- পছন্দের শিল্পগ্রুপকে বিগত সময়ে সুবিধা দেওয়ার জন্য এ নীতিমালা করা হয়েছিল। সত্যিকার অর্থে জ্বালানি বেসরকারীকরণে এ নীতিমালা কতটুকু কাজে আসছে? দেশের স্বার্থ রক্ষায় এ নীতিমালা সংশোধন প্রয়োজন কি না?
প্রকৌশলী মনজারে খোরশেদ আলম: সরকার সময়ে সময়ে নীতিমালা তৈরি করে। ২০২৩ সালে একটি করেছে, ২০১৭ সালেও একটি করেছিল। এই নীতিমালাগুলো করার সময় সংশ্লিষ্ট অংশীজন সবার সঙ্গে খোলা মনে আলোচনা করা উচিত, যারা ব্যবহার করেন, যারা তৈরি করেন, যারা পলিসি নির্ধারণ করেন, যারা এ খাতে অভিজ্ঞ ব্যক্তি সবাইকে নিয়ে আলাপ-আলোচনা করে একটি নীতিমালা করা হলে সেটি যুক্তিসঙ্গত হবে।
বেসরকারিতে রিফাইনারি করার ব্যাপারে ওই নীতিমালায় যেটা করা হয়েছে- এটা নিয়েও অনেক কথা (সমালোচনা) আছে। একজন ব্যবসায়ী একটি রিফাইনারি করতে টাকা বিনিয়োগ করবেন, সেখান থেকে তিনি কিছু মুনাফা চাইবেন, এটা স্বাভাবিক। বেসরকারি বিনিয়োগ আসবে, কিন্তু শতভাগ সরকারের মতো চলতে হবে, সেটা চিন্তা করলে তারা (বেসরকারি উদ্যোক্তা) এগিয়ে আসবে না। আমাদের এ দুটোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। বেসরকারি উদ্যোক্তারাও যাতে ব্যবসা করতে পারেন। তবে তারা যাতে পুরো দেশকে জিম্মি করতে না পারেন, দুটোর মধ্যে ভারসাম্য এনে নীতিমালা করলে এটি ফলপ্রসূ হবে। আমার মনে হয়, বর্তমান বেসরকারি নীতিমালাটি রিভিউ করা উচিত।
জাগো নিউজ: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
প্রকৌশলী মনজারে খোরশেদ আলম: আপনাকেও ধন্যবাদ।
এমডিআইএইচ/এএসএ/ এমএফএ