গরম মসলার দামে শীতল হাওয়া

ইকবাল হোসেন
ইকবাল হোসেন ইকবাল হোসেন , নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
প্রকাশিত: ০৮:১৯ এএম, ১০ এপ্রিল ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব বাজারে পড়েনি মসলার বাজারে/জাগো নিউজ গ্রাফিক্স

ঈদ কিংবা বড় কোনো উৎসব এলেই বাড়ে গরম মসলার দাম। তবে এবারের চিত্র ভিন্ন। ঈদুল ফিতরে কোনো মসলার দাম সেভাবে বাড়েনি। সামনে কোরবানির ঈদ কেন্দ্র করেও বাড়ার খুব একটা আশঙ্কা নেই। বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় গরম মসলার দামে বইছে শীতল হাওয়া।

বাংলাদেশে ভোগ্যপণ্যের দ্বিতীয় বৃহৎ পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ ঘুরে জানা যায়, গত বছরের তুলনায় এবার প্রায় সব ধরনের গরম মসলার দাম কম। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের আয়ে ভাটা পড়েছে। যে কারণে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব বাজারে পড়েনি। বিশেষ করে গরম মসলার বাজারে বেচাবিক্রি তেমন নেই। গত বছরের তুলনায় বাজারে গরম মসলার সরবরাহ বেশি। দামও কম।

রান্নায় মাংস উপাদেয় করতে মরিচ, হলুদ, ধনিয়ার মতো সাধারণ মসলার পাশাপাশি ব্যবহৃত চিকন জিরা, লবঙ্গ, এলাচ, দারুচিনি, গোল মরিচসহ নানান মসলাকে গরম মসলা হিসেবে ধরা হয়। বছরের অন্য সময়ের তুলনায় কোরবানিতে গরম মসলার চাহিদা থাকে বেশি।

খাতুনগঞ্জের ইলিয়াছ মার্কেট ও জাফর মার্কেট ঘিরে মসলার পাইকারি বাজার। কথা হলে মসলা ব্যবসায়ীরা জানান, দেশে গরম মসলার মোট চাহিদার ৯০ শতাংশই আমদানি করতে হয়। চিকন জিরা, লবঙ্গ, এলাচ, দারুচিনি, গোল মরিচ- এ পাঁচ ধরনের গরম মসলা বেশি ব্যবহৃত হয়।

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরুর আগেই গরম মসলা আমদানি হয়েছে বেশি। গত বছরের মসলাও বাজারে রয়ে গেছে। যে কারণে চাহিদার চেয়ে বাজারে সরবরাহ বেশি। ফলে প্রায় সব গরম মসলার দাম এবার কম। বিশেষ করে এলাচ ও জিরার দাম সবচেয়ে কম।-ব্যবসায়ী মো. বাদশা

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, এই পাঁচ পদের মধ্যে গত বছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরে লবঙ্গ ও জিরার আমদানি বাড়লেও এলাচ, দারুচিনি এবং গোল মরিচের আমদানি কমেছে।

গরম মসলা কোন দেশ থেকে আসে

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পরিমাণে কম হলেও সাধারণভাবে ব্যবহৃত মসলার মধ্যে এলাচের দাম সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি এলাচ আমদানি হয় গুয়াতেমালা থেকে। স্থলবন্দরগুলো দিয়ে ভারত থেকেও ব্যবহৃত এলাচের একটি অংশ বাংলাদেশে আসে। চায়না ও ভিয়েতনাম থেকে দারুচিনি আমদানি হয়।

গরম মসলা

বিভিন্ন ধরনের গরম মসলা

আগের বছরগুলোতে ইন্দোনেশিয়া ও মাদাগাস্কার থেকে আমদানি হলেও সাম্প্রতিক সময়ে ভারত থেকেও কিছু লবঙ্গ আমদানি হচ্ছে। ভিয়েতনাম থেকে আমদানি হয় গোলমরিচ। তবে চলতি বছর ভারত থেকে বেনাপোল স্থলবন্দর হয়ে অল্প গোলমরিচ এসেছে। সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হওয়া গরম মসলার মধ্যে চিকন জিরার বেশিরভাগ আমদানি হচ্ছে ভারত থেকে। পাশাপাশি আফগানিস্তান, চায়না থেকেও সামান্য পরিমাণে চিকন জিরা আমদানি হয়।

দুই অর্থবছরে আমদানি

এনবিআর সূত্রে জানা যায়, চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত প্রথম ৯ মাসে ২৩ হাজার ২১০ টন ৮৩৬ কেজি চিকন জিরা আমদানি হয়েছে। যার বেশিরভাগ দেশের বিভিন্ন স্থলবন্দর হয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে এসেছে। তবে গত ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসের তুলনায় ৩ হাজার ৬২৮ টন ১২৭ কেজি জিরা বেশি আমদানি হয়েছে।

একইভাবে গত অর্থবছরের তুলনায় এবার প্রায় দ্বিগুণ লবঙ্গ আমদানি হয়েছে। চলতি অর্থবছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত প্রথম ৯ মাসে ২ হাজার ২৬ টন ৩৩০ কেজি লবঙ্গ আমদানি হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছিল ১ হাজার ১০৯ টন ৩১৬ কেজি।

আরও পড়ুন

খাতুনগঞ্জে এবার গরম মসলার দামে উত্তাপ কম
বাজারে সয়াবিন তেল উধাও, দাম বাড়াতে চাপ কোম্পানিগুলোর
‘এত দামে মুরগি কোনোদিন কিনিনি’

চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত প্রথম ৯ মাসে এলাচ আমদানি হয়েছে ২ হাজার ৭১ টন ৮১২ কেজি। এর মধ্যে হিলি, বেনাপোল ও বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়েও এলাচ এসেছে বাংলাদেশে। তবে গত ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসের তুলনায় ৮৮৭ টন ৬৪১ কেজি কম আমদানি হয়েছে। ওই ৯ মাসে ৩ হাজার ৫৯৮ টন ৪৫২ কেজি এলাচ আমদানি হয়েছিল।

বাজারে গরম মসলার বেচাকেনা তেমন নেই। গত বছর এই সময়ে বেচাকেনা জমজমাট ছিল। এবার মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ বাদেও দেশের মানুষের মধ্যে আর্থিক টানাপোড়েন রয়েছে। যে কারণে বাজারে পণ্যের চাহিদা কমেছে। যার প্রভাব পড়েছে গরম মসলার বাজারে।-আমদানিকারক অমর কান্তি দাশ 

একইভাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে দারুচিনি আমদানি হয়েছে ৩২৫ টন ৭২০ কেজি। যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯৯ টন ১৩৫ কেজি কম। গত অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে আমদানি হয়েছিল ৪২৪ টন ৮৫৬ কেজি।

পাশাপাশি চলতি অর্থবছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত কালো ও সাদা মিলে গোলমরিচ আমদানি হয়েছে ৯৯২ টন ৫৭৫ কেজি। যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে গোলমরিচ আমদানি হয়েছিল ১ হাজার ৮৮২ টন ৩শ কেজি।

এখন যে দামে বিক্রি হচ্ছে

সরেজমিনে খাতুনগঞ্জে গিয়ে দেখা যায়, কোরবানির ঈদ সামনে রেখে পাইকারি বাজারটিতে গরম মসলার বেচাকেনা চলছে। মসলা ব্যবসায়ীরা বলছেন, তবে গত দুই বছরের চেয়ে এবার মসলার দাম কম।

এলাচ
তারা জানান, মানভেদে বাজারে কয়েক স্তরের এলাচ রয়েছে। এবছর গত বছরের তুলনায় এসব এলাচের দাম কেজিতে ৫-৭শ টাকা কমেছে। বাজারে বর্তমানে ভালো মানের ‘আরএস-জাম্বো’ এলাচ কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ৪৬শ টাকায়। এক মাস আগেও ছিল ৪৮শ টাকা। গত বছর একই সময়ে এসব এলাচ বিক্রি হয়েছিল ৫ হাজার ২শ টাকায়। একইভাবে মধ্যমানের ‘এলএমজি’ এলাচ বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৪১শ টাকায়। বাজারে এলএমজি এলাচ বেশি বিক্রি হয়। এক মাস আগেও কেজিপ্রতি দুইশ টাকা বেশি ছিল। গত বছর ছিল প্রতিকেজি ৪৭-৪৮শ টাকা।

অপেক্ষাকৃত কমমানের ‘এসএমজি’ এলাচ বিক্রি হচ্ছে প্রতিকেজি ৩৮শ টাকায়। একমাস আগে ছিলো কেজি ৪ হাজার টাকা। গত বছর এসব এলাচের দাম ছিল ৪ হাজার ৩শ টাকা।

লবঙ্গ
খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে ইন্দোনেশিয়ান ও মাদাগাস্কারের লবঙ্গ পাওয়া যাচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ানের চেয়ে মাদাগাস্কারের লবঙ্গ কেজিপ্রতি ১০ টাকা কমে বিক্রি হয়। সোমবার বাজারে ইন্দোনেশিয়ান লবঙ্গ বিক্রি হয়েছে প্রতিকেজি ১৩শ ২০ টাকা। একমাস আগে প্রতিকেজিতে ৪০ টাকার মতো দাম কম ছিল। তবে গত বছর এসব লবঙ্গ বিক্রি হয়েছিল ১৩শ ৫০ টাকায়।

গরম মসলা

দারুচিনি
বাজারে দুইভাবে দারুচিনি বিক্রি হয়। চায়না থেকে আসা দারুচিনি ২৫ কেজি বস্তা আকারে পাওয়া যায়। এসব বস্তার দারুচিনি ভাঙা থাকে। অন্যদিকে ভিয়েতনাম থেকে আসা ১০ কেজি প্যাকেটে আস্ত দারুচিনি পাওয়া যায় বাজারে। তবে ভাঙা দারুচিনির তুলনায় আস্ত দারুচিনির দাম কেজিতে ৬০-৮০ টাকা বেশি। সোমবার ২৫ কেজি প্যাকেটের চাইনিজ দারুচিনি প্রতিকেজি ৩৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গতবছর এসব দারুচিনি ৩৬০ টাকা মতো। তবে ভিয়েতনাম থেকে আসা আস্ত দারুচিনি ৪২০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। গত বছর এসব দারুচিনি ৪৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল।

গোলমরিচ
খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে কালো ও সাদা দুই ধরনেরই গোলমরিচ পাওয়া যায়। বর্তমানে ভিয়েতনাম থেকে প্রায় সব গোলমরিচ আমদানি হয়। গত বছরের তুলনায় শুধু গোলমরিচের দাম কিছুটা বেড়েছে। গত বছর কালো গোলমরিচ প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছিল ৯৫০ টাকা। একই গোলমরিচ এবার বিক্রি হচ্ছে ১০৩০ টাকায়। অন্যদিকে সাদা গোলমরিচের দাম গত বছরের তুলনায় কমেছে। এবার সাদা গোলমরিচ বিক্রি হচ্ছে প্রতিকেজি ১২শ ২০ টাকায়। এসব গোলমরিচ গত বছর বিক্রি হয়েছিল ১৩শ ৫০ টাকায়।

জিরা
ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমানে বাজারে পাওয়া প্রায় সব চিকন জিরা ভারত থেকে আসা। আফগানিস্তান থেকেও সামান্য জিরা আমদানি হয়েছে। বাজারে ভারতীয় চিকন জিরা বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৫৭০ টাকায়। গত বছর এসব জিরা বিক্রি হয়েছিল ৬শ টাকার কাছাকাছি। গরম মসলা হিসেবে জয়ত্রী, জায়ফলের চাহিদাও রয়েছে। জয়ত্রী ইন্দোনেশিয়া থেকে, জায়ফল শ্রীলংকা ও ভারত থেকে আমদানি হয়।

যা বলছেন ব্যবসায়ীরা

খাতুনগঞ্জের মসলা ব্যবসায়ী মেসার্স ইসহাক সওদাগরের স্বত্বাধিকারী মো. সেকান্দার জাগো নিউজকে বলেন, ‘এবার প্রায় সব ধরনের গরম মসলার দাম কমেছে। বাজারে আগের চেয়ে মসলা পণ্যের সরবরাহও বেশি।’

একই কথা বললেন আরেক ব্যবসায়ী মো. বাদশা। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরুর আগেই গরম মসলা আমদানি হয়েছে বেশি। গত বছরের মসলাও বাজারে রয়ে গেছে। যে কারণে চাহিদার চেয়ে বাজারে সরবরাহ বেশি। ফলে প্রায় সব গরম মসলার দাম এবার কম। বিশেষ করে এলাচ ও জিরার দাম সবচেয়ে কম।’

খাতুনগঞ্জের আমদানিকারক ব্যবসায়ী মেসার্স এবি দাশ অ্যান্ড ট্রেডিং কোং এর স্বত্বাধিকারী অমর কান্তি দাশ জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাজারে গরম মসলার বেচাকেনা তেমন নেই। গত বছর এই সময়ে বেচাকেনা জমজমাট ছিল। এবার মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ বাদেও দেশের মানুষের মধ্যে আর্থিক টানাপোড়েন রয়েছে। যে কারণে বাজারে পণ্যের চাহিদা কমেছে। যার প্রভাব পড়েছে গরম মসলার বাজারে।’

তিনি বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা ভালো নেই। এখন ব্যাংক থেকেও ঋণ পাওয়া যাচ্ছে না। যারা ব্যাংক ইন্টারেস্ট দিয়ে ব্যবসা চালাচ্ছে, তাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে।’

আরেক আমদানিকারক ব্যবসায়ী মেসার্স গুলিস্তান ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী আবদুর রাজ্জাক জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাজারে গরম মসলার কোনো সংকট নেই। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে বাজারে গরম মসলায় প্রভাব পড়েনি। বাজারে আগে থেকেই সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। শুধু ড্রাই ফুডস হিসেবে কাঠবাদাম, আখরোট এ ধরনের পণ্যের সরবরাহ কিছুটা কম।’

টিসিবির তথ্য যা বলছে

রাষ্ট্রীয় ভোগ্যপণ্য বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার বাজারগুলোতে পাইকারিতে বর্তমানে জিরা বিক্রি হচ্ছে ৫শ ৬০ থেকে ৬শ ৮০ টাকায়। একবছর আগেও এসব জিরা বিক্রি হয়েছিল ৬শ টাকা থেকে ৬শ ২০ টাকায়। বাজারে পাইকারিতে দারুচিনি বিক্রি হচ্ছে ৩৭০-৪০০ টাকা কেজিতে। গত বছর এসব দারুচিনি বিক্রি হয়েছিল ৪৪০-৪৬০ টাকা। একইভাবে লবঙ্গ বিক্রি হচ্ছে ১২০০-১৩২০ টাকায়। গত বছর দারুচিনি বিক্রি হয়েছিল ১৩২০-১৩৫০ টাকায়।

পাইকারিতে গোলমরিচ বিক্রি হচ্ছে ১০২০-১০৬০ টাকায়। গত বছর এসব গোলমরিচ বিক্রি হয়েছিল ১০০০-১১০০ টাকায়।

এমডিআইএইচ/এএসএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।