লেনদেনভিত্তিক রেফারেন্স রেট যুগে প্রবেশ করছে বাংলাদেশ
দেশের আর্থিক বাজারের স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা নিশ্চিত করতে বড় ধরনের সংস্কারে হাত দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে কেবল ব্যাংকগুলোর দেওয়া তথ্যের (ঢাকা ইন্টারব্যাংক অফার রেট বা ডিবোর) ওপর ভিত্তি করে নয়; বরং প্রকৃত লেনদেনের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হবে মানি মার্কেটের সুদের হার। বৈশ্বিক ‘এসওএফআর’র (সিকিউরড ওভারনাইট ফাইন্যান্সিং রেট) আদলে দেশে প্রবর্তিত হচ্ছে প্রকৃত লেনদেনভিত্তিক নতুন রেফারেন্স রেট।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) দুপুরে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে ঋণ ব্যবস্থাপনা বিভাগ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়। ১৫ এপ্রিল থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে এই নতুন রেফারেন্স রেট নিয়মিত প্রকাশ করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০১০ সাল থেকে দেশে ‘ঢাকা ইন্টারব্যাংক অফার রেট’ বা ডিবোর প্রচলিত ছিল। তবে এটি ছিল ব্যাংকগুলোর দেওয়া অফার রেটের ভিত্তিতে। অর্থাৎ ব্যাংকগুলো যে দরে লেনদেন করতে চায়, তার ওপর ভিত্তি করে এটি নির্ধারিত হতো। কিন্তু অনেক ব্যাংক নিয়মিত তথ্য দিত না, ফলে বাজারের প্রকৃত চিত্র ফুটে উঠত না।
এ সময় বলা হয়, এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার মাধ্যমে সরাসরি লেনদেনের তথ্য নিয়ে নতুন দুটি মানদণ্ডভিত্তিক রেট প্রবর্তন করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক মূলত দুটি রেট প্রকাশ করবে। প্রথমটি বাংলাদেশ ওভারনাইট ফাইন্যান্সিং রেট (বিওএফআর)। এটি একটি ঝুঁকিমুক্ত বা জামানতনির্ভর রেট, যা আন্তঃব্যাংক রেপো লেনদেনের তথ্যের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। দ্বিতীয়টি ঢাকা ওভারনাইট মানি মার্কেট রেট (ডিওএমএমআর)। এটি হবে জামানতবিহীন (কলমানি) লেনদেনের ভিত্তিতে নির্ধারিত রেট।
যেভাবে নির্ধারিত হবে সুদের হার
বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ ব্যবস্থাপনা বিভাগ জানায়, এই রেটগুলো কোনো ব্যাংক বা ব্যক্তির ইচ্ছামতো নির্ধারিত হবে না। এগুলো হবে লেনদেনের পরিমাণভিত্তিক গড়ের ওপর ভিত্তি করে। বিওএফআরের ক্ষেত্রে ওভারনাইট ও এক সপ্তাহ মেয়াদি রেট প্রকাশ করা হবে। ডিওএমএমআর’র ক্ষেত্রে ওভারনাইট, এক সপ্তাহ, এক মাস এবং তিন মাস মেয়াদি রেট পাওয়া যাবে।
অস্বাভাবিক কোনো লেনদেন যাতে রেটকে প্রভাবিত করতে না পারে, সেজন্য পরিসংখ্যানভিত্তিক বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে। যদি কোনো নির্দিষ্ট দিনে পর্যাপ্ত লেনদেন না থাকে, তবে ধারাবাহিক সময় পদ্ধতিতে পূর্ববর্তী কার্যদিবসের তথ্য যোগ করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক আশা করছে, এই উদ্যোগের ফলে দেশের আর্থিক বাজারে সুদের হারের একটি নির্ভরযোগ্য মানদণ্ড তৈরি হবে। এতে বিভিন্ন ঋণচুক্তি, বন্ড ও ভাসমান সুদভিত্তিক পণ্যের মূল্য নির্ধারণ সহজ হবে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন নতুন বিনিয়োগ পণ্য বাজারে আনতে পারবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের বাজার সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা পাবেন।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, চলতি (মার্চ) মাস থেকেই পরীক্ষামূলকভাবে এই রেটগুলো প্রস্তুত করা হচ্ছে। ১৫ এপ্রিল ২০২৬ থেকে সাধারণ মানুষ ও বিনিয়োগকারীরা প্রতিদিন সকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে এই রেফারেন্স রেট দেখতে পাবেন। নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও বার্ষিক পর্যালোচনার মাধ্যমে এই পদ্ধতি আরও আধুনিক করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী, ডেট ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্টের পরিচালক ইস্তেকমালসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
ইএআর/এসএইচএস