দেশীয় কাঁচামালে প্রস্তুত পণ্যে সিএমটি রপ্তানির অনুমোদন চায় বিকেএমইএ
বিদেশ থেকে ‘ফ্রি অব কস্ট’ বা বিনামূল্যে কাঁচামাল সরবরাহের বিদ্যমান সুবিধার পাশাপাশি স্থানীয় উৎস থেকেও একইভাবে কাঁচামাল সংগ্রহ ও সরবরাহের সুযোগ দিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে অনুমোদন চেয়েছে বিকেএমইএ।
গত ৯ এপ্রিল বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম এনবিআরের কাছে পাঠানো একটি চিঠিতে এ আহ্বান জানিয়েছেন।
চলমান বিধান অনুযায়ী বিদেশ থেকে বিনামূল্যে আমদানিকৃত উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদিত চূড়ান্ত পণ্য সিএমটি (কাট, মেইক অ্যান্ড ট্রিম) ভিত্তিতে বিদেশে রপ্তানির সুযোগ প্রদান করা হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক ক্রেতার সরবরাহকৃত কাঁচামাল ব্যবহার করে স্থানীয় প্রস্তুতকারকরা উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছেন।
কাট, মেইক অ্যান্ড ট্রিম অর্থাৎ কাটা, তৈরি ও সমাপ্তিকরণ, যা পোশাক উৎপাদনের একটি সহজ প্রক্রিয়া। এতে প্রথমে ডিজাইন অনুযায়ী কাপড় কাটা হয় (কাট), এরপর সেই কাটা কাপড় সেলাই করে পোশাক তৈরি করা হয় (মেইক) এবং সবশেষে বোতাম লাগানো, অতিরিক্ত সুতা কাটা ও ইস্ত্রি করার মতো ফিনিশিং কাজ করা হয় (ট্রিম), যাতে পোশাক সম্পূর্ণভাবে ব্যবহারের উপযোগী হয়।
অন্যদিকে, বিদেশি ক্রেতার মনোনীত স্থানীয় সরবরাহকারীর নিকট থেকে বিনামূল্যে সংগৃহীত উপকরণ বা উপাদান ব্যবহারের ক্ষেত্রে উৎপাদিত পণ্য সিএমটি ভিত্তিতে রপ্তানির বিষয় উক্ত এসআরও-তে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা পরিলক্ষিত হয় না এবং অনুমোদন দেওয়া হয় না।
স্থানীয় উৎস থেকে বিনামূল্যে সংগ্রহ করা উপকরণ ব্যবহার করে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্য সিএমটি ভিত্তিতে রপ্তানির ক্ষেত্রে নীতিগত অস্পষ্টতা ব্যবসা ও শিল্পখাতে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। তাই বিকেএমইএ দ্রুত সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়ার এবং অনুমোদন দেওয়ার দাবি জানিয়েছে, কারণ এতে রপ্তানি আরও গতিশীল হবে।
বর্ণিত প্রেক্ষাপটে স্থানীয় উৎস থেকে বিনামূল্যে সংগ্রহকৃত উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদিত চূড়ান্ত পণ্য সিএমটি ভিত্তিতে রপ্তানির বিষয়ে প্রয়োজনীয় নীতিগত স্পষ্টতা প্রদানপূর্বক প্রযোজ্য নির্দেশনা জারি করার জন্য সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে সরকারের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বিকেএমইএ’র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বর্তমানে বিদেশি ক্রেতা (বায়ার) যদি বিদেশ থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করে বিনামূল্যে সরবরাহ করেন, তবে তা ব্যবহার করে উৎপাদিত পণ্য ভিত্তিতে রপ্তানির অনুমতি রয়েছে এনবিআরের পক্ষ থেকে। তবে একই ক্রেতা যদি স্থানীয় কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করে বিনামূল্যে সরবরাহ করতে চান, সেক্ষেত্রে এ ধরনের সুবিধা স্পষ্টভাবে অনুমোদিত নয়।
তিনি জানান, বিদেশ থেকে বায়ার ফ্রি অব কস্ট কাঁচামাল দিলে সেটা অনুমোদিত। কিন্তু স্থানীয়ভাবে যদি একইভাবে কাঁচামাল সরবরাহ করা হয়, সেটি এনবিআর স্পষ্টভাবে অনুমোদন করে না। আমরা চাই, স্থানীয় উৎস থেকেও এ ধরনের সরবরাহকে অনুমোদন দেওয়া হোক।
খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এ ধরনের অনুমোদন দেওয়া হলে রপ্তানি প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসবে। তাদের মতে, ফ্রি অব কস্ট কাঁচামাল ব্যবহারের একটি বড় সুবিধা হলো—ক্রেতার সরাসরি বিনিয়োগ থাকায় অর্ডার বাতিল, মূল্যছাড় বা জরুরি এয়ার শিপমেন্টের ঝুঁকি কমে যায়।
‘এছাড়া অর্থায়নের দিক থেকেও এটি উদ্যোক্তাদের জন্য স্বস্তিদায়ক। সাধারণত কাঁচামাল আমদানির জন্য ফ্যাক্টরি এলসি খুলতে হয়, যার জন্য ব্যাংকের কাছ থেকে ঋণসীমা (লিমিট) নিতে হয় এবং এর বিপরীতে নগদ অর্থ বা সম্পদ জামানত রাখতে হয়। এতে সুদের চাপও তৈরি হয়।’ যোগ করেন বিকেএমইএ সভাপতি।
তিনি বলেন, ফ্রি অব কস্ট কাঁচামাল পেলে আমাদের ব্যাংক লিমিট, সুদ বা জামানতের ঝামেলায় যেতে হয় না। এতে উৎপাদন সহজ হয় এবং ছোট উদ্যোক্তারাও কাজের সুযোগ পায় বলে দাবি করেন এই ব্যবসায়ী নেতা।
মোহাম্মদ হাতেম দাবি করেন, এ ধরনের ব্যবস্থা চালু করা হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ বাস্তবায়নে লিড টাইম হ্রাস পাবে, উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং স্থানীয় পশ্চাৎপদ সংযোগ শিল্পের সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি রপ্তানি কার্যক্রমে নমনীয়তা বৃদ্ধি পাবে এবং বৈদেশিক বাজারে দেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান সুদৃঢ় হবে।
রপ্তানিকারকরা মনে করেন, স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল সরবরাহের এই মডেল অনুমোদন করা হলে দেশের পশ্চাৎপদ সংযোগ শিল্প আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং উৎপাদন সময়ও হ্রাস পাবে।
তাদের দাবি, বিদেশ থেকে যেভাবে ফ্রি অব কস্ট কাঁচামাল আমদানির সুযোগ রয়েছে, ঠিক একইভাবে স্থানীয় উৎস থেকেও কাঁচামাল সংগ্রহের সুযোগ দিলে তা হবে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। এতে রপ্তানি প্রক্রিয়া আরও নমনীয় হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা বাড়বে।
সার্বিকভাবে, স্থানীয় উৎস থেকে বিনামূল্যে কাঁচামাল ব্যবহার করে সিএমটি ভিত্তিতে রপ্তানির অনুমোদন দিলে শিল্পখাতের ব্যয় কমবে, ঝুঁকি হ্রাস পাবে এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন তারা।
আইএইচও/ইএ