শেয়ারবাজারে ফের কমছে বিদেশি-প্রবাসী বিনিয়োগকারী
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর কিছুদিন দেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের সংখ্যা বাড়তে দেখা গেলেও, এখন আবার তা কমতে দেখা যাচ্ছে। তবে স্থানীয় বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। এপ্রিল মাসে শেয়ারবাজারে বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাব বেড়েছে সাড়ে ৬ হাজারের বেশি। বিপরীতে বিদেশি ও প্রবাসীদের নামে থাকা বিও হিসাব কমেছে ২৬টি।
বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীর সংখ্যা কমলেও, মার্চ মাসে এবং এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে বাড়তে দেখা যায়। অবশ্য তার আগে দীর্ঘদিন ধরে দেশের শেয়ারবাজার থেকে ধারাবাহিকভাবে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিচ্ছিলেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। ফলে বাজারে আস্থার সংকট তৈরি হয় এবং লেনদেনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বিও হিসাবে কমার কারণে বাজারে নেই আইপিও
বিও হল শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য ব্রোকারেজ হাউস অথবা মার্চেন্ট ব্যাংকে একজন বিনিয়োগকারীর খোলা হিসাব। এই বিও হিসাবের মাধ্যমেই বিনিয়োগকারীরা শেয়ারবাজারে লেনদেন করেন। বিও হিসাব ছাড়া শেয়ারবাজারে লেনদেন করা সম্ভব না। বিও হিসাবের তথ্য রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করে সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল)।
সিডিবিএল এর হিসাবে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের সংখ্যা কমলেও শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের সংখ্যা কমছে। প্রকৃত বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সংখ্যা কমেনি। তবে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেনের পরিমাণ কমতে পারে। আর প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব কমার কারণ দীর্ঘদিন বাজারে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) নেই। প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের নামে থাকা বিও হিসাবগুলো মূলত আইপিওকেন্দ্রিক। যেহেতু আইপিও নেই, সেহেতু অনেকেই হিসাব বন্ধ করে দিচ্ছেন। আইপিও এলে আবার প্রবাসীদের বিও হিসাব বেড়ে যাবে।
যে হিসাবটা কমেছে সেটি এনআরবি (প্রবাসী) হিসাব। আমাদের দেশে এনআরবি বিনিয়োগকারীরা মূলত আইপিও নির্ভর। অনেকদিন ধরে আইপিও নেই, এই কারণে হয় ওনারা বাজার থেকে সরে যাচ্ছেন।- ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলাম
সিডিবিএল-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে (৩০ এপ্রিল পর্যন্ত) শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৬১ হাজার ১২৩টি। যা মার্চ শেষে ছিল ১৬ লাখ ৫৪ হাজার ৪৬২টি। এ হিসেবে এপ্রিল মাসে শেয়ারবাজারে বিও হিসাব বেড়েছে ৬ হাজার ৬৬১টি।
আরও পড়ুন
- বিমায় আগ্রহ নেই বিদেশি বিনিয়োগকারীদের, নেপথ্যে ‘আস্থার সংকট’
থামছে না বিদেশিদের শেয়ারবাজার ছাড়ার প্রবণতা, এক মাসে বন্ধ ৭৮১ বিও
এদিকে, বর্তমানে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব আছে ৪৩ হাজার ২০৪টি। যা গত ৬ এপ্রিল ছিলো ৪৩ হাজার ২৩০টি। অর্থাৎ এপ্রিলের শেষ ২৪ দিনে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাবে কমেছে ২৬টি। অথচ, এর আগে মার্চ এবং এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব বাড়তে দেখা যায়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস শেষে বিদেশি ও প্রবাসীদের নামে বিও ছিল ৪৩ হাজার ১৪২টি। অর্থাৎ মার্চ মাস ও এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ৮৮টি বিও হিসাব বাড়ে।
কমছে বিদেশি বিনিয়োগকারীর সংখ্যা
অবশ্য তার আগে দীর্ঘদিন ধরেই ধারাবাহিকভাবে দেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীর সংখ্যা কমছিল। ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীরা ধারাবাহিকভাবে শেয়ারবাজার ছাড়তে থাকেন। যা অব্যাহত থাকে চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসেও।

২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবর বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব ছিল ৫৫ হাজার ৫১২টি। সেখান থেকে ধারাবাহিকভাবে কমে চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি ৪৩ হাজার ১০১টিতে নেমে আসে। অর্থাৎ, বিদেশি ও প্রবাসীদের বিও হিসাব ১২ হাজার ৪১১টি কমে যায়। এরপর কিছুটা বাড়লেও এখন আবার কমতে দেখা যাচ্ছে।
প্রাবাসী ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব কমার বিষয়ে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ)-এর সভাপতি সাইফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, বলেন, যে হিসাবটা কমেছে সেটি এনআরবি (প্রবাসী) হিসাব। আমাদের দেশে এনআরবি বিনিয়োগকারীরা মূলত আইপিও নির্ভর। অনেকদিন ধরে আইপিও নেই, এই কারণে হয় ওনারা বাজার থেকে সরে যাচ্ছেন। যদি বাজারে আইপিও আসা শুরু করে, দেখবেন এনআরবিদের হিসাব বাড়া শুরু হবে। আমাদের বাজারে এনআরবিদের অংশগ্রহণ খুবই সামান্য।
তিনি বলেন, নির্বাচনের পর গত দুই-তিন মাস বিদেশিরা শেয়ারবাজারে মোটামুটি ভাবে অ্যাকটিভ আছেন। আমাদের তথ্যমতে নির্বাচনের পর কোনো বিদেশি হিসাব বন্ধ হয়নি। হয়তো লেনদেনে তাদের অংশগ্রহণ কমেছে। ওরা দেখছে নতুন সরকারে কী বলছে এবং কী করছে। কিন্তু বিদেশিরা মোটামুটিভাবে অ্যাকটিভ আছে।
বিদেশি পোটফোলিও নিয়ে কাজ করা একটি ব্রোকারেজ হাউসের শীর্ষ এক কর্মকর্তা বলেন, নির্বাচনের পর শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়তে দেখা যায়। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং আমাদের শেয়ারবাজারে মাত্রাতিরিক্ত অস্থিরতার কারণে তারা আবার কিছুটা সাইডলাইনে চলে গেছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ এখন পরিস্থিতি মনিটরিং করছেন। তবে বিদেশিদের এখন তেমন সেল প্রেশার (বিক্রির চাপ) বেশি নেই।
স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের চিত্র
বিদেশি ও প্রবাসীদের শেয়ারবাজার ছাড়ার প্রবণতা দেখা গেলেও দেশের শেয়ারবাজারে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়তে দেখা যাচ্ছে। সিডিবিএল এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশি বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব আছে ১৫ লাখ ৯৯ হাজার ৭৩৮টি, যা মার্চ শেষে ছিল ১৫ লাখ ৯৩ হাজার ২২২টি। আর ২০২৫ সাল শেষে ছিল ১৫ লাখ ৭৯ হাজার ২৩টি। অর্থাৎ, চলতি বছরে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব বেড়েছে ২০ হাজার ৭১৫টি। এর মধ্যে এপ্রিল মাসে বেড়েছে ৬ হাজার ৫১৬টি।
এখন শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের সংখ্যা বাড়লেও এর আগে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগকারী শেয়ারবাজার ছেড়েছেন। ২০২৪ সালের শুরুতে শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব ছিল ১৭ লাখ ৭৩ হাজার ৫৫১টি। আর বর্তমানে বিও হিসাব আছে ১৬ লাখ ৬১ হাজার ১২৩টি। অর্থাৎ, ২০২৪ সালের শুরুর তুলনায় বর্তমানে বিও হিসাব কম আছে ১ লাখ ১২ হাজার ৪২৮টি।
নারী-পুরুষ উভয় বিনিয়োগকারী বাড়ছে
এদিকে বর্তমানে শেয়ারবাজারে যে বিনিয়োগকারীরা আছেন, তার মধ্যে পুরুষ বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব আছে ১২ লাখ ৫০ হাজার ৫৮৭টি। গত বছর শেষে এই সংখ্যা ছিল ১২ লাখ ৩৩ হাজার ৭৪৩টি। অর্থাৎ, চলতি বছরে পুরুষ বিনিয়োগকারীদের হিসাব বেড়েছে ১৬ হাজার ৮৪৪টি। এর মধ্যে চলতি এপ্রিল মাসে বেড়েছে ৫ হাজার ৩৮৫টি। মার্চ শেষে পুরুষ বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব ছিল ১২ লাখ ৪৫ হাজার ২০২টি।
আরও পড়ুন
- প্রতি কার্যদিবসে বাড়ছে ১৫৯ বিও, বিদেশিরা শেয়ারবাজার ছাড়ছেই
রাজস্ব ব্যবস্থায় পূর্বানুমানযোগ্য করনীতি চান বিদেশি বিনিয়োগকারীরা
অন্যদিকে, বর্তমানে নারী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৯২ হাজার ৩৫৫টি। ২০২৫ সাল শেষে এই সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৮২৯টি। এ হিসেবে চলতি বছরে নারী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব বেড়েছে ৩ হাজার ৫২৬টি। এর মধ্যে এপ্রিল মাসে বেড়েছে ১ হাজার ১৩৫টি। মার্চ মাস শেষে নারী বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব ছিল ৩ লাখ ৯১ হাজার ২২০টি।
বেড়েছে কোম্পানির বিও হিসাবও
নারী-পুরুষ বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি চলতি বছরে কোম্পানির বিও হিসাবও বেড়েছে। বর্তমানে কোম্পানি বিও হিসাব রয়েছে ১৮ হাজার ১৮১টি। ২০২৫ সাল শেষে এই সংখ্যা ছিল ১৭ হাজার ৮০৩টি। এ হিসাবে চলতি বছরে কোম্পানি বিও হিসাব বেড়েছে ৩৭৮টি। এর মধ্যে চলতি এপ্রিল মাসে বেড়েছে ১৪১টি। মার্চ মাস শেষে কোম্পানির বিও হিসাব ছিল ১৮ হাজার ৪০টি।

বর্তমানে বিনিয়োগকারীদের যে বিও হিসাব আছে তার মধ্যে একক নামে আছে ১২ লাখ ১ হাজার ৩১০টি, যা ২০২৫ সাল শেষে ছিল ১১ লাখ ৮২ হাজার ৭১৫টি। অর্থাৎ, চলতি বছরে একক নামে বিও হিসাবে বেড়েছে ১৮ হজার ৫৯৫টি। এর মধ্যে এপ্রিল মাসে বেড়েছে ৬ হাজার ৫টি। মার্চ শেষে একক নামে বিও হিসাব ছিল ১১ লাখ ৯৫ হাজার ৩০৫টি।
অন্যদিকে, বিনিয়োগকারীদের যৌথ নামে বিও হিসাব আছে ৪ লাখ ৪১ হাজার ৬৩২টি। ২০২৫ সাল শেষে যৌথ বিও হিসাব ছিল ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৮৫৭টি। অর্থাৎ, চলতি বছরে যৌথ বিও হিসাব বেড়েছে ১ হাজার ৭৭৫টি। এর মধ্যে চলতি এপ্রিল মাসে বেড়েছে ৫১৫টি। মার্চ শেষে যৌথ নামে বিও হিসাব ছিল ৪ লাখ ৪১ হাজার ১১৭টি।
নতুন সরকার আসায় বেড়েছে স্থানীয় বিনিয়োগকারী
স্থানীয় বিনিয়োগকারী বাড়ার বিষয়ে ডিবিএর সভাপতি সাইফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, আমরা অনেকদিন আগে থেকেই বলে আসছি নতুন সরকার এলে ধারাবাহিকভাবে বিনিয়োগকারীদের আস্থাটা ফিরে আসবে। কারণ, অন্তর্বর্তীকালীন সরাকরের সময় আস্থাটা ফিরিয়ে আনা যায়নি। এখন যে সরকার আসছে ওনারা তো আসার আগে থেকে বলে আসছেন পুঁজিবাজারে স্পেশাল কেয়ার নেবেন।
তিনি বলেন, এই পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে যে, সংসদ এবং সংসদের বাইরে অর্থমন্ত্রী থেকে শুরু করে সবাই পুঁজিবাজার নিয়ে কথা বলছেন। পুঁজিবাজারকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। সরকার পুঁজিবাজারের প্রতি মনোযোগ দেওয়ায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ছে। যে কারণে বাজারে স্থানীয় বিনিয়োগকারী বাড়তে দেখা যাচ্ছে। আর একটা বিষয় হলো এই সময়টা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর লভ্যাংশ ঘোষণা আসার সময়। সেই সঙ্গে প্রথম প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ হয়।
তিনি আরও বলেন, এখনো পর্যন্ত যেটা দেখা যাচ্ছে কয়েকটি ব্যাংক ভালো লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। এটা বিনিয়োগকারীদের আশার আলো দেখাচ্ছে। এটা যদি আমরা ধরে রাখতে পারি কয়েক মাস এবং এটা যদি গ্রাজুয়ালি আমরা বাড়াতে পারি তাহলে আমরা আশা করতে পারি যে, পুঁজিবাজারের লোকজন ফিরে আসবে।
এমএএস/এএমএ