বিদেশ ভ্রমণ ও বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে নতুন নির্দেশনা বাংলাদেশ ব্যাংকের

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:০৭ পিএম, ০৭ মে ২০২৬
বাংলাদেশ ব্যাংক, ফাইল ছবি

আন্তর্জাতিক ভ্রমণ, এয়ারলাইন্স, শিপিং, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং, ট্যুর অপারেশন ও বৈদেশিক পরিবহনসেবা খাতে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন আরও স্বচ্ছ, নিয়ন্ত্রিত ও সহজ করতে নতুন সমন্বিত নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ থেকে প্রকাশিত এ নির্দেশনায় টিকিট ইস্যু, বিদেশে অর্থ প্রেরণ, ফ্রেইট আদায়, ট্যুর প্যাকেজ বিক্রি, কুরিয়ার সেবা এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশি অফিস পরিচালনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত বিধান তুলে ধরা হয়েছে।

নির্দেশনা অনুযায়ী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগের অনুমোদন কিংবা অনাপত্তিপত্র (এনওসি) ছাড়া কোনো এয়ারলাইন্স বা ট্রাভেল এজেন্ট টিকিট ইস্যু করতে পারবে না। এছাড়া বিদেশে চাকরির উদ্দেশ্যে যাওয়া বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য বৈধ পাসপোর্ট, ভিসা এবং বিএমইটির ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

বিদেশি নাগরিক, কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রা হিসাব, ইনওয়ার্ড রেমিট্যান্স অথবা বিদেশ থেকে পাঠানো প্রিপেইড টিকিট অ্যাডভাইস (পিটিএ) ব্যবহার করে টিকিট ইস্যুর সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে মানি চেঞ্জারের এনক্যাশমেন্ট সনদ গ্রহণযোগ্য হবে না বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশি জাহাজ কর্মীদের বিদেশ যাত্রার ক্ষেত্রেও নতুন কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। টিকিট ইস্যুর আগে বৈধ সিডিসি, শিপিং মাস্টারের ছাড়পত্র এবং বিদেশি শিপিং কোম্পানির অর্থ পরিশোধের প্রমাণ যাচাই করতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশি টাকায় কেনা আন্তর্জাতিক টিকিটের অর্থ বিদেশে ফেরত দেওয়া যাবে না বলেও স্পষ্ট করা হয়েছে। টিকিট বাতিলের অর্থ দেশেই টাকায় পরিশোধ করতে হবে।

বিদেশি এয়ারলাইন্স ও শিপিং কোম্পানির বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের ক্ষেত্রেও নতুন নিয়ম আরোপ করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে নির্ধারিত ফরমে নিয়মিত আয়-ব্যয়ের হিসাব জমা দিতে হবে। বিদেশে মুনাফা পাঠানোর আগে স্থানীয় ব্যয়, কর, কমিশন ও সম্ভাব্য রিফান্ডের অর্থ সমন্বয় করতে হবে। অব্যবহৃত টিকিটের বিপরীতে অন্তত ১০ শতাংশ অর্থ সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

এছাড়া বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোকে প্রতি মাসে টিকিট বিক্রি, ফ্রেইট আদায়, রিফান্ড, নগদ বুকিং ও ব্যাংক স্টেটমেন্টসহ বিস্তারিত তথ্য জমা দিতে হবে। একইভাবে শিপিং কোম্পানিগুলোকে প্রতি তিন মাসে ফ্রেইট, কমিশন, আয়কর ও ব্যয়ের বিবরণ বাংলাদেশ ব্যাংকে দাখিল করতে হবে।

এফওবি ও সিএফআর ভিত্তিক আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে ফ্রেইট আদায়ের জন্য ওইএমএস ও ওআইএমএস সিস্টেমের মাধ্যমে বিশেষ সনদ গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি ডেমারেজ, ডিটেনশন ও হ্যান্ডলিং চার্জকেও বিদেশি শিপিং লাইনের আয় হিসেবে গণ্য করা হবে। কর ও কমিশন বাদ দিয়ে অবশিষ্ট অর্থ বিদেশে পাঠানো যাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রায় জ্বালানি ক্রয়, টিকিট বিক্রি ও ফ্রেইট আদায়ের সব তথ্য অনলাইন রিপোর্টিং ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে।

নতুন নির্দেশনায় বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন ও বাংলাদেশ বিমানের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিদেশি বন্দর বা স্টেশনে পরিচালন ব্যয় মেটাতে তারা পূর্বানুমতি ছাড়াই বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাতে পারবে। তবে নিয়মিত আয়-ব্যয়ের বিবরণী বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিতে হবে। একইভাবে আন্তর্জাতিক রুটে পরিচালিত বেসরকারি এয়ারলাইন্স ও শিপিং কোম্পানিকেও বিদেশে আয়, ব্যয় ও দেশে ফেরত আনা অর্থের হিসাব নিয়মিত দাখিল করতে হবে।

বিদেশি জাহাজ ও উড়োজাহাজ চার্টারের ক্ষেত্রেও কঠোর শর্ত আরোপ করা হয়েছে। চার্টার ভাড়া বিদেশে পাঠানোর আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন, চার্টার চুক্তি, ব্যাংক সনদ এবং আমদানি-রপ্তানির নথি যাচাই করতে হবে। অতিরিক্ত অর্থ পাঠানো হলে তা দেশে ফেরত আনার লিখিত অঙ্গীকারও নিতে হবে।

কুরিয়ার সার্ভিস, রেলওয়ে কোম্পানি ও বিদেশি এজেন্সি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও নতুন নিয়ম চালু করা হয়েছে। স্থানীয় এজেন্টদের কমিশন, কর ও পরিচালন ব্যয় বাদ দিয়ে অবশিষ্ট অর্থ বিদেশে পাঠানোর অনুমতি দেওয়া হবে। তবে তার আগে নির্ধারিত ফরমে আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের সনদ জমা দিতে হবে।

ফ্রেইট ফরওয়ার্ডারদের জন্য আলাদা নির্দেশনায় বলা হয়েছে, লাইসেন্সপ্রাপ্ত ফ্রেইট ফরওয়ার্ডাররা এফওবি ভিত্তিক রপ্তানির ক্ষেত্রে টাকায় ফ্রেইট পরিশোধ করতে পারবে। তবে বিদেশি ক্রেতার কাছ থেকে পাওয়া অর্থ বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে আনতে হবে এবং নির্ধারিত ‘ফর্ম এফএফ’ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

এ ছাড়া শিপিং কোম্পানি, এয়ারলাইন্স ও ফ্রেইট ফরওয়ার্ডারদের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা হিসাব পরিচালনার সুযোগ রাখা হয়েছে। এসব হিসাবে এফওবি রপ্তানি ও আমদানির বিপরীতে পাওয়া বৈদেশিক মুদ্রা জমা রাখা যাবে এবং বিদেশি ব্যয় মেটাতে ব্যবহার করা যাবে। তবে সব ধরনের লেনদেন নিয়মিতভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকে রিপোর্ট করতে হবে।

ট্যুর অপারেটরদের জন্যও নতুন বিধান যুক্ত করা হয়েছে। একজন ভ্রমণকারী তার বার্ষিক ভ্রমণ কোটার সর্বোচ্চ ৯০ শতাংশ ব্যবহার করে ট্যুর প্যাকেজ কিনতে পারবেন। বিদেশি পর্যটকদের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ ট্যুর অপারেটরদের এফসি হিসাবে জমা হবে এবং এর বড় অংশ টাকায় রূপান্তর করতে হবে। পাশাপাশি ট্যুর অপারেটরদের মোট বিক্রির অন্তত ২৫ শতাংশ ইনবাউন্ড ট্যুর প্যাকেজ হতে হবে বলে নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

বিদেশি প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশি শাখা, প্রতিনিধি বা লিয়াজোঁ অফিস খোলার ক্ষেত্রেও নতুন রিপোর্টিং বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। বিডা বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ৩০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংককে বিষয়টি জানাতে হবে এবং সব বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন অনুমোদিত ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালনা করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, নতুন এই সমন্বিত নির্দেশনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিবহন, পর্যটন, এয়ারলাইন্স, শিপিং ও বৈদেশিক সেবা খাতে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হবে।

ইএআর/এমএএইচ/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।