আসন্ন বাজেটে যেসব প্রস্তাব দিলেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫:২০ পিএম, ০৫ মে ২০২৬
ছবি: জাগো নিউজ গ্রাফিক্স

আগামী বাজেটে স্থিতিশীল, স্বচ্ছ ও সহজ বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। তারা দীর্ঘমেয়াদি নীতি সহায়তা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত দ্রুতসেবা, উন্নত অবকাঠামো, টেকসই বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং কর ও শুল্ক কাঠামোতে সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন। এক মাসব্যাপী প্রাক-বাজেট আলোচনায় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের একাধিক সংগঠন অংশ নিয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছে।

এর মধ্যে ফরেইন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ফিকি) দেশে স্বচ্ছ, পূর্বানুমানযোগ্য ও বিনিয়োগবান্ধব কর ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে। বাজেট প্রস্তাবনায় ফিকি ব্যক্তিগত কর ব্যবস্থায় করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো এবং নিম্ন আয়ের স্তরের কর কাঠামো পুনর্বিন্যাসের সুপারিশ করেছে।

ফিকি জানায়, উচ্চ হারে উৎসে কর এবং ব্যয়ের বড় অংশ অগ্রহণযোগ্য ঘোষণার কারণে প্রকৃত করহার অনেক ক্ষেত্রে আইনগত হারের চেয়েও বেড়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে উৎসে কর হার যৌক্তিক করা এবং প্রকৃত করদায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনার সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।

এছাড়া প্রশাসনিক জটিলতা ও বিধির কঠোর ব্যাখ্যার কারণে অনেক ক্ষেত্রে বৈধ ভ্যাট ইনপুট ক্রেডিট পাওয়া যাচ্ছে না, যা নিয়ম মেনে চলা ব্যবসার কার্যকর মূলধনে চাপ সৃষ্টি করছে বলে উল্লেখ করা হয়। এ প্রেক্ষাপটে ভ্যাট ক্রেডিট ব্যবস্থা সহজ করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক হিসাব মান অনুসরণকারী ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে মুশক-৪.৩ জমা দেওয়া থেকে অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে ফিকি।

কাস্টমস ব্যবস্থায় ২০০০ সালের ভ্যালুয়েশন রুলস অনুযায়ী লেনদেনমূল্য কঠোরভাবে অনুসরণের আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে পণ্য ছাড়ে বিলম্ব কমাতে ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে প্রভিশনাল অ্যাসেসমেন্টের ব্যবহার বাড়ানোর সুপারিশ করেছে সংগঠনটি। অথরাইজড ইকোনমিক অপারেটর (এইও) কার্যক্রম সহজ করা এবং এতে অংশগ্রহণ বাড়াতে সুস্পষ্ট সুবিধা নিশ্চিত করার প্রস্তাবও দিয়েছে ফিকি।

ফিকি সভাপতি রুপালী হক বলেন, এলডিসি উত্তরণের প্রাক্কালে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিক্রম করছে। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে একটি মানসম্মত, পূর্বানুমানযোগ্য এবং স্বয়ংক্রিয় করব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এদিকে, ডিজিটাল লেনদেন সম্প্রসারণে কার্ডভিত্তিক পেমেন্টে ৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনা দেওয়ার প্রস্তাব করেছে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম)। সংগঠনটির প্রস্তাব অনুযায়ী, এই প্রণোদনার মধ্যে ৩ শতাংশ গ্রাহক এবং ২ শতাংশ ব্যবসায়ীরা পেতে পারেন।

এছাড়া দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি (ডিটিএ) অনুযায়ী সরাসরি করহার প্রয়োগের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করেছে সংগঠনটি। তাদের মতে, এ ব্যবস্থা কার্যকর হলে ব্যাংকগুলোকে আলাদাভাবে ডিটিএএ সনদ সংগ্রহ করতে হবে না। তবে সনদ প্রয়োজন হলে আবেদন জমার সাত দিনের মধ্যে তা প্রদানের ব্যবস্থা রাখারও সুপারিশ করা হয়েছে।

উৎসে কর কর্তনের ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি। তারা বলছে, রুল ৩৯ অনুযায়ী করপোরেট কর নির্ধারণ করা হলে উৎসে কর ৪ দশমিক ১২৫ শতাংশ এবং অন্যথায় ৫ দশমিক ২৫ শতাংশ নির্ধারণ করা যেতে পারে। এছাড়া বিদেশি ও স্থানীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকের জন্য সমান করহার ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ বজায় রাখার সুপারিশও করা হয়েছে।

ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে স্মার্টকার্ড ও পয়েন্ট অব সেল (পিওএস) মেশিনের ওপর শুল্ক ১৫ শতাংশের নিচে নামানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক কাঠামোয় পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে কার্বনেটেড পানীয়র ওপর সম্পূরক শুল্ক ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।

এছাড়া তৈরি পোশাক খাতের বর্জ্য সংগ্রহ ও সরবরাহ সেবাকে ভ্যাট অব্যাহতির আওতায় আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যেন পুনর্ব্যবহার শিল্প শক্তিশালী হয়। বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগ বাড়াতে অ-বাসিন্দা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য করহার কমানোর সুপারিশ করেছে।

অ্যামচেম যুগ্ম সচিব সানোয়ার হোসেন বলেন, ব্যাংকিং খাতে সমতা নিশ্চিত করতে অ্যামচ্যাম দেশীয় ও বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের জন্য একই করহার (৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ) বজায় রাখার সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটর জন্য শূন্য থেকে ২০ শতাংশ হারে প্রাধান্যমূলক কর সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপ সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জাতীয় রাজস্ব বাড়াতে সহায়ক হবে।

বাংলাদেশ চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিসিসিসিআই) ব্যক্তিগত আয়করের সর্বোচ্চ হার ২০ শতাংশ নির্ধারণ এবং ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত সম্পদের ওপর সারচার্জ মওকুফের প্রস্তাব দিয়েছে। তারা গার্মেন্টস শিল্পে ৫০ শতাংশ কাঁচামাল দেশীয় উৎস থেকে সংগ্রহ বাধ্যতামূলক করার সুপারিশও করেছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ব্যবসায়ী সংগঠন ইউরোচ্যাম বিনিয়োগবান্ধব করনীতি, প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সই ওপর জোর দিয়েছে। তারা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ডিজিটালাইজেশন উদ্যোগের প্রশংসা করলেও নীতিমালা ও বাস্তবায়নের মধ্যে ব্যবধান দূর করার প্রস্তাব করেছে। 

এদিকে, সিম ও ই-সিম সরবরাহ এবং প্রতিস্থাপনের ওপর থাকা ৩০০ টাকা ভ্যাট প্রত্যাহার এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্মের ওপর ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে দেশের মোবাইল অপারেটরগুলোর সংগঠন অ্যামটব।

তরঙ্গ বরাদ্দের সময় ভ্যাট আরোপ ও পরবর্তীতে সেই তরঙ্গ ব্যবহার করে সেবা দেওয়ার সময় আবারও ভ্যাট প্রদানকে ‘দ্বৈত কর’ হিসেবে অভিহিত করেছে সংগঠনটি। এ নীতির অবসান চেয়েছে সংগঠনটি। মোবাইল অপারেটরদের জন্য করপোরেট কর যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করেছে সংগঠনটি।

সংগঠনটি বলছে, মোবাইল অপারেটরদের মোট আয়ের প্রায় ৫৬ শতাংশই বিভিন্ন ভ্যাট ও কর হিসেবে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হয়। স্পেকট্রাম বা তরঙ্গ নিলামের বছরগুলোতে এই করের চাপ আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। বাংলাদেশে মোবাইল খাতে বিপুল বিনিয়োগের তুলনায় আয় ও মুনাফা সন্তোষজনক নয়। বর্তমানে বাংলাদেশে গ্রাহকপ্রতি গড় আয় ১৫০ টাকার নিচে, যা প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বর্তমানে টেলিযোগাযোগ সেবায় ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক (এসডি) এবং ১ শতাংশ সারচার্জ রয়েছে। ডিজিটাল কানেক্টিভিটি বাড়াতে এই অতিরিক্ত শুল্ক ও সারচার্জ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করেছে সংগঠনটি।

গত এক দশকে বাংলাদেশ বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে দক্ষিণ এশিয়ার এক সম্ভাবনাময় অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। ২০১০ সালে যেখানে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) ছিল মাত্র ৯১৩ মিলিয়ন ডলার, সেখানে ২০১৯ সাল নাগাদ তা ছাড়িয়ে যায় ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে। 

গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫৫ কোটি ডলারের নতুন বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। করোনাকালে ২০২০-২১ অর্থবছরে নতুন বিনিয়োগ এসেছিল ৭২ কোটি ডলার। পরের বছর তা বেড়ে হয় ১১৪ কোটি ডলার। ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নতুন বিনিয়োগ আসে যথাক্রমে ৭১ ও ৬৭ কোটি ডলার।

এসএম/এমএএইচ/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।