২৬ দিন বন্ধ থাকার পর উৎপাদনে ফিরলো ইস্টার্ন রিফাইনারি
ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত তেলের তীব্র সংকটে তিন সপ্তাহেরও বেশি সময় বন্ধ থাকা দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগারকেন্দ্র ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) মূল প্ল্যান্ট ফের চালু ফিরেছে।
শুক্রবার (৮ মে) সকাল ৮টায় শোধনাগারটিতে পূর্ণদমে উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু হয়।
ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী শরীফ হাসনাত জাগো নিউজকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘সকাল ৮টায় আমাদের প্ল্যান্ট চালু হয়েছে। তবে প্রসেস হতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে। এরপর উৎপাদন শুরু হবে।’
এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার শোধনাগারকেন্দ্রটি চালু করতে সৌদি আরব থেকে আসা এক লাখ টন ক্রুড অয়েল ট্যাংকে পৌঁছে। তখনই জানানো হয়েছিল, বৃহস্পতিবার রাতে অথবা শুক্রবার সকালে প্ল্যান্টটি চালু হবে।
গত বুধবার দুপুর ১২টার পর সৌদি আরব থেকে এক লাখ টন ক্রুড নিয়ে আসা ট্যাংকার জাহাজ ‘এমটি নিনেমিয়া’ কুতুবদিয়া অ্যাংকরে নোঙর করে। পরে রাত ১০টার দিকে জাহাজটি থেকে লাইটারিং শুরু হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ক্রুড অয়েলের চরম সংকটে পড়া রিফাইনারিটি এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত লো ফিডে চালু রাখা হয়। তবে গত ১২ এপ্রিল থেকে প্ল্যান্টটির উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
দৈনিক প্রায় ৪ হাজার টন ডিজেল উৎপাদনে সক্ষম ইস্টার্ন রিফাইনারিতে তেলের শেষ চালান আসে গত ফেব্রুয়ারিতে। ইরান যুদ্ধের কারণে মার্চের পর থেকে আমদানি জটিলতা তীব্র আকার ধারণ করে।

বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে বছরে প্রায় ৭২ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এরমধ্যে ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি পরিশোধন করে ইআরএল।
গত মঙ্গলবার ইআরএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরীফ হাসনাত জানিয়েছিলেন, আরও এক লাখ টন ক্রুড নেওয়ার জন্য ‘এমটি ফসিল’ নামের আরেকটি জাহাজ ফুজাইরার পথে রয়েছে। এটিও ১১ মে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মালিকানাধীন একমাত্র পেট্রোলিয়াম রিফাইনারি ইআরএল। এতে পরিশোধনে ব্যবহৃত শতভাগ ক্রুড অয়েল আমদানি করতে হয়। বাংলাদেশ জি টু জি পদ্ধতিতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এসব ক্রুড আমদানি করে। আমদানি করা ক্রুডের শতভাগ পরিবহন করে সরকারি পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠান বিএসসি। এসব ক্রুড পরিবহনের জন্য বর্তমানে আমেরিকান প্রতিষ্ঠান নর্ডিক এনার্জি থেকে চার্টারে জাহাজ ভাড়া নেয় বিএসসি।
আরও পড়ুন
ক্রুড সংকটে বন্ধ ইস্টার্ন রিফাইনারির মূল প্ল্যান্ট
এক লাখ টন ক্রুডবাহী ‘এমটি নিনেমিয়া’ ৬ মে বাংলাদেশে আসছে
সৌদি থেকে এক লাখ টন ক্রুড নিয়ে বাংলাদেশের পথে ‘এমটি নিনেমিয়া’
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিএসসির চার্টারার প্রতিষ্ঠান আমেরিকান কোম্পানি হওয়ায় মার্চ মাসে দুই লাখ টন ক্রুড পরিবহনে ঝুঁকি তৈরি হয়। এরমধ্যে সৌদি আরবের রাস তানুরা থেকে এক লাখ টন ক্রুড লোড করে হরমুজ প্রণালিতে হামলার আশঙ্কায় গত ৫ এপ্রিল থেকে আটকা পড়ে নর্ডিক পোলাক্স নামের ট্যাংকার জাহাজ। দুই মাস পেরিয়ে গেলেও কখন জাহাজটি বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবে তার নিশ্চয়তা এখনো মেলেনি।
পাশাপাশি গত ২২ এপ্রিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবল দানা বন্দর থেকে এক লাখ টন ক্রুড আনার কথা ছিল। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সূচি পাল্টে ৩১ মার্চ শিডিউল নির্ধারণ করা হয়। তবে যুদ্ধ এলাকায় মালিকপক্ষের জাহাজ পাঠানোর অনীহার কারণে ‘ওমেরা গ্যালাক্সি’ নামের ট্যাংকার জাহাজটির যাত্রা বাতিল হয়। ফলে ক্রুড অয়েল সংকটে গত ১২ এপ্রিল ইস্টার্ন রিফাইনারির মূল প্ল্যান্ট ক্রুড ডিস্টিলেশন ইউনিট (সিডিইউ) পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে সিডিইউনির্ভর অন্য প্ল্যান্টগুলোও বন্ধ হয়ে যায়।

বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি। এ প্রণালি মধ্যপ্রাচ্যের পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল এ জলপথকে বিশ্ব অর্থনীতির লাইফলাইন বলা হয়।
বিশ্বের মোট ব্যবহৃত তেলের প্রায় এক চতুর্থাংশ, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বড় অংশ হরমুজ প্রণালি হয়েই পরিবাহিত হয়। প্রধান রপ্তানিকারক সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, ইরাক এবং ইরানের মতো তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো এই জলপথ ব্যবহার করে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ করে। দৈনিক প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেলের মতো অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্য সংকটে হরমুজ প্রণালিতে ইরানি নিষেধাজ্ঞা ও ঝুঁকি এড়াতে ফুজাইরা বন্দরকে নিরাপদ বিকল্প রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আমিরাতের হাবসান তেলক্ষেত্র থেকে পাইপলাইনে ফুজাইরা বন্দরে ক্রুড অয়েল আসে। অন্যদিকে বর্তমানে সৌদি আরবের লোহিত সাগর এলাকায় অবস্থিত ইয়ানবু বন্দরও রাস তানুরা বন্দরের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করছে বাংলাদেশ।
২৮ ফেব্রুয়ারি যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এর বিপরীতে ইসরায়েলসহ আশপাশের আরব দেশগুলোর বিভিন্ন মার্কিন স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালায় ইরান। যুদ্ধের মধ্যে ইরান এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করলে বিশ্ববাজারে তেলের দামে প্রভাব পড়ে। এ জলপথ বন্ধ হওয়ার পর বাংলাদেশে জ্বালানি তেল, এলএনজি ও এলপিজি নিয়ে অস্থিরতা তৈরি হয়।
এমডিআইএইচ/এমকেআর