বাজেট ২০২৬-২৭

ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই

সাইফুল হক মিঠু
সাইফুল হক মিঠু সাইফুল হক মিঠু
প্রকাশিত: ১০:৩৪ এএম, ১১ মে ২০২৬
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের নির্ধারণ করে যাওয়া কর কাঠামো অনুসরণ করতে পারে বর্তমান সরকার/ছবি: এআই নির্মিত

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমায় নতুন বিএনপি সরকার পরিবর্তন নাও আনতে পারে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের নির্ধারণ করে যাওয়া কাঠামো মেনেই সামনে নাগরিকদের আয়কর দিতে হবে। যদিও করহার ও আয়ের স্ল্যাব বা স্তর পরিবর্তনের কারণে করের চাপ বাড়তে পারে।

এছাড়া, আয়কর রিটার্নের মতো সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) রিটার্ন অনলাইনে জমা বাধ্যতামূলক হতে পারে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

বাজেট অধিবেশন ঘিরে প্রস্তুতি

জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন বসতে যাচ্ছে আগামী ৭ জুন। ওইদিন বেলা ৩টায় সংসদের অধিবেশন আহ্বান করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।

মূল্যস্ফীতি এবং নিম্ন আয়ের মানুষের প্রকৃত আয় বিবেচনায় নিয়ে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়ের সীমা পাঁচ লাখ টাকা, সিনিয়র সিটিজেন ও নারীদের জন্য পাঁচ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ করহার ২৫ শতাংশ নির্ধারণ করার সুপারিশ করছি আমরা।- এফবিসিসিআই প্রশাসক মো. আবদুর রহিম খান

এনবিআর ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখন বাজেটের প্রস্তুতি চলছে জোরেশোরে। বিভিন্ন প্রাক-বাজেট আলোচনায় পাওয়া অংশীদারদের প্রস্তাব ও সরকারের সীমাবদ্ধতা- সবকিছু মাথায় রেখে সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হচ্ছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে আরও আলাপ-আলোচনা করে।

করমুক্ত আয়ের সীমা

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে করমুক্ত আয়ের সীমা রয়েছে তিন লাখ ৫০ হাজার টাকা। আগের অর্থবছরের এই সীমাই চলতি বছরের জন্য রেখে দেয় বিগত অন্তর্বর্তী সরকার। সেই সঙ্গে আগামী অর্থবছরে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের কী হারে কর দিতে হবে, তা নির্ধারণ করে যায়।

অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরের জন্য ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়ের সীমা সাড়ে তিন লাখ থেকে বাড়িয়ে তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকা করে। গত বছরের ২ জুন জাতির সামনে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপনের সময় এই ঘোষণা দেন ওই সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।

ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই
দুই অর্থবছরের তুলনামূলক চিত্র/ছবি: এআই নির্মিত

পরবর্তী ধাপের করহার

এনবিআরের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে করমুক্ত সীমার পরের এক লাখ টাকায় ৫ শতাংশ, এরপরের চার লাখ টাকায় ১০ শতাংশ, তারপরের পাঁচ লাখ টাকায় ১৫ শতাংশ, সেটার পরের পাঁচ লাখ টাকায় ২০ শতাংশ, তারও পরের ২০ লাখ টাকায় ২৫ শতাংশ এবং অবশিষ্ট আয়ের ওপর ৩০ শতাংশ হারে কর আরোপ করা হতো।

অন্যদিকে, সামনে পৌনে চার লাখ টাকার বেশি আয়ের ক্ষেত্রে পরবর্তী তিন লাখ টাকায় ১০ শতাংশ, এরপরের চার লাখ টাকায় ১৫ শতাংশ, তারপরের পাঁচ লাখ টাকায় ২০ শতাংশ, সেটার পরের ২০ লাখ টাকায় ২৫ শতাংশ এবং অবশিষ্ট আয়ের ওপর ৩০ শতাংশ হারে আয়কর দিতে হবে।

কমবে স্ল্যাব, বাড়বে হার

আগে বার্ষিক আয়ের ওপর করদাতাকে সাতটি স্ল্যাব বা স্তরে কর দিতে হতো। আগামী বাজেটে দিতে হবে ছয়টি স্ল্যাবে। একই সঙ্গে প্রতিটি স্ল্যাবে করহার ৫ শতাংশ করে বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে নিম্ন মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চ মধ্যবিত্ত ও ধনী- সবাইকেই বাড়তি হারে আয়কর দিতে হবে।

আরও পড়ুন
আসন্ন বাজেটে যেসব প্রস্তাব দিলেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা
‘ভ্যাট-কর ফাঁকির চর্চা অব্যাহত থাকলে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো সম্ভব হবে না’
দেশের বাণিজ্য ঘাটতি ১৯ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়- মো. মোস্তাকিম একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মাসে ৬০ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করেন। তার বার্ষিক আয় সাত লাখ ২০ হাজার টাকা। এ আয়ের এক-তৃতীয়াংশ অথবা পাঁচ লাখ টাকার মধ্যে যেটি কম, সেটি আয়কর অব্যাহতিপ্রাপ্ত। এখানে এক-তৃতীয়াংশ আয় দুই লাখ ৪০ হাজার টাকা, এ কারণে এটি অব্যাহতিপ্রাপ্ত। অর্থাৎ তাকে বাকি চার লাখ ৮০ হাজার টাকার ওপর আয়কর দিতে হয়।

বিদ্যমান কাঠামো অনুযায়ী, এই আয়ের জন্য তিনটি স্ল্যাবে কর প্রযোজ্য। প্রথম সাড়ে তিন লাখ টাকার জন্য কর হচ্ছে শূন্য। পরবর্তী ধাপে এক লাখ টাকায় ৫ শতাংশ হারে করের পরিমাণ পাঁচ হাজার টাকা। তারপরের ধাপে ৩০ হাজার টাকার জন্য ১০ শতাংশ হারে কর তিন হাজার টাকা। অর্থাৎ মো. মোস্তাকিমের মোট দেওয়া করের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে আট হাজার টাকা। বিনিয়োগ-সংক্রান্ত রেয়াত বাদ দিয়ে এ হিসাব করা হয়েছে।

মূল্যস্ফীতির চাপ আছে, সামনের দিনেও হয়তো থাকবে। এছাড়া যুদ্ধের কারণে নানান পণ্যের দাম বাড়ছে, অর্থনীতির গতিও কিছুটা স্লথ হচ্ছে। এসব কিছু বাজেটে চিন্তা করা উচিত।- সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান

কিন্তু আসন্ন অর্থবছরের বাজেটে করহার ও স্ল্যাব পরিবর্তনের ফলে এই করদাতাকে অতিরিক্ত প্রায় আড়াই হাজার টাকা আয়কর দিতে হবে। যদিও করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হয়েছে, তবে পরবর্তী ধাপে তিন লাখ পর্যন্ত টাকার ওপর করহার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। ফলে চার লাখ ৮০ হাজার টাকা আয়ের ক্ষেত্রে প্রথমে পৌনে চার লাখ টাকায় আয়কর শূন্য হলেও পরের ধাপের এক লাখ পাঁচ হাজার টাকায় তা দিতে হবে ১০ শতাংশ হারে। যার পরিমাণ ১০ হাজার ৫০০ টাকা।

তবে নতুন করদাতাদের জন্য কিছুটা ছাড় রাখা হয়েছে। প্রথমবার রিটার্ন জমা দেওয়া ব্যক্তিরা আয়ভেদে সর্বনিম্ন এক হাজার থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকার মধ্যে আয়কর দেওয়ার সুযোগ পাবেন। তাদের করভার কমানো এবং করভীতি দূর করতেই এই সুবিধা রাখা হয়েছে।

ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেইরাজধানীর আগারগাঁওয়ে এনবিআরের প্রধান কার্যালয় রাজস্ব ভবন/ফাইল ছবি

বাধ্যতামূলক ভ্যাট রিটার্ন জমা

এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, নতুন করে ৩০ লাখের মতো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ভ্যাটের আওতায় আনতে চায় সরকার। এ জন্য নতুন অর্থবছর থেকে আয়কর রিটার্নের মতো সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য অনলাইনে ভ্যাট রিটার্ন জমা বাধ্যতামূলক করা হতে পারে। পাশাপাশি ভ্যাট রিফান্ড প্রক্রিয়ার জটিলতা কমাতে নেওয়া হবে উদ্যোগ। তবে ভ্যাট রিফান্ড প্রক্রিয়ায় অনিয়মের দেখা মিললে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে শাস্তির আওতায় আনার কথা জানিয়েছেন এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান।

এছাড়া, ব্যক্তিগত গাড়ির নিবন্ধন বা নবায়নে সিসিভেদে অগ্রিম আয়কর দিতে হয় ২৫ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা। যা উৎসে কর হিসেবে কেটে রাখে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। নতুন বাজেটে এই হার বাড়তে পারে। সেই সঙ্গে উচ্চ সিসি বা দামী মোটরসাইকেলের ওপর বসতে পারে আগাম আয়কর। একইভাবে ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ বা হেলিকপ্টারেও বসতে পারে আয়কর।

আরও পড়ুন
এপ্রিল মাসের রপ্তানি আয়ে উল্লম্ফন টেকসই না সাময়িক?
বাংলাদেশের ৪৮% কর্মোপযোগী মানুষের কারিগরি প্রশিক্ষণ জরুরি
১৩ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির স্বপ্ন বুনছে প্যাকেজিং খাত

সীমা ৫ লাখ করার দাবি

মূল্যস্ফীতি এবং নিম্ন আয়ের মানুষের প্রকৃত আয় বিবেচনায় ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা পাঁচ লাখ টাকা করার দাবি তুলেছে ব্যবসা-সংক্রান্ত সংগঠনগুলো।

ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ড্রাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. আবদুর রহিম খান বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি এবং নিম্ন আয়ের মানুষের প্রকৃত আয় বিবেচনায় নিয়ে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়ের সীমা পাঁচ লাখ টাকা, সিনিয়র সিটিজেন ও নারীদের জন্য পাঁচ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ করহার ২৫ শতাংশ নির্ধারণ করার সুপারিশ করছি আমরা।’

অন্যদিকে, কর বিশেষজ্ঞ ও এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া জাগো নিউজকে বলেন, বিগত অন্তর্বর্তী সরকার আগামী দুই অর্থবছরের জন্য ব্যক্তিশ্রেণির করদাতার করমুক্ত আয়, করহার ও স্ল্যাব নির্ধারণ করে দিয়ে গেছে। এর ফলে আয় না বাড়লেও হিসাবের কারণে আগামী অর্থবছর থেকে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের বেশি কর দিতে হবে। তবে সরকার চাইলে এটি পরিবর্তনও করতে পারে।

ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেইনতুন করে ৩০ লাখের মতো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ভ্যাটের আওতায় আনতে চায় সরকার/ফাইল ছবি

এনবিআরের অবস্থান

সরকারের রাজস্ব আহরণের দায়িত্বে থাকা এনবিআর আগের সরকার ঘোষিত করমুক্ত আয়সীমা বহাল রাখতে চায়। সংস্থাটির আশঙ্কা, এই সীমা বাড়ানো হলে বড় একটি অংশ কর জালের বাইরে চলে যাবে। এছাড়া, বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হলে ‘কর অনিশ্চয়তা’ সংস্কৃতি চালু হতে পারে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী।

এনবিআরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা এ ব্যাপারে বলেন, করমুক্ত আয়সীমা একটি নিয়মের মধ্যে আছে। সেটি পরিবর্তন করার কোনো চাপ আপাতত নেই।

এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, মূল্যস্ফীতির চাপ আছে, সামনের দিনেও হয়তো থাকবে। এছাড়া যুদ্ধের কারণে নানান পণ্যের দাম বাড়ছে, অর্থনীতির গতিও কিছুটা স্লথ হচ্ছে। এসব কিছু বাজেটে চিন্তা করা উচিত।

তিনি মত দেন, কর আদায়ে সবচেয়ে গুরুত্ব দিতে হবে কর ফাঁকি রোধে। সৎ করদাতাদের শাস্তি দেওয়া ঠিক হবে না।

এসএম/একিউএফ/এমএমএআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।