নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ

অন্তর্বর্তী সরকারের এক সিদ্ধান্তে থমকে যায় ৬ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ

মো. নাহিদ হাসান
মো. নাহিদ হাসান মো. নাহিদ হাসান , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:১৮ এএম, ২০ মে ২০২৬
বাতিল হওয়া প্রকল্পগুলোর বেশিরভাগই সৌরবিদ্যুতের/জাগো নিউজ গ্রাফিক্স

বিগত সরকারের আমলে বিদ্যুৎখাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বড় ধরনের বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের এক সিদ্ধান্তে থমকে যায় প্রায় ছয় বিলিয়ন ডলারের ৩১টি প্রকল্প। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে প্রকল্পগুলো আবার সচল করার চেষ্টা করছে।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে হাইকোর্টের একটি রায়ের ব্যাখ্যা সামনে এনে প্রকল্পের লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই) বাতিল করে অন্তর্বর্তী সরকার। এতে তিন হাজার ২৮৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনাময় প্রকল্পগুলো অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তৈরি হয় উদ্বেগ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বাতিল হওয়া প্রকল্পগুলোর বেশিরভাগই সৌর ও বায়ুভিত্তিক নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎকেন্দ্র। এসব প্রকল্পের উদ্যোক্তারা ইতোমধ্যে জমি অধিগ্রহণ, সম্ভাব্যতা যাচাই, পরিবেশগত সমীক্ষা, গ্রিড সংযোগ পরিকল্পনা ও বিদেশি অর্থায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছিলেন।

প্রকল্পের অনেক আইনগত বিষয় আছে। এই আইনগত বিষয়গুলো নিয়েই আমাদের সামনে এগোতে হবে। এখন পর্যন্ত আমরা কাজ করছি। আপাতত কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারিনি। আগে একটি সিদ্ধান্তে আসি, তারপর বলা যাবে। কারণ, এটির সঙ্গে অনেক কিছুই রিলেটেড। ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।-বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম

অন্তর্বর্তী সরকার এলওআই বাতিল করলে কয়েকটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান সম্ভাব্য বিনিয়োগ পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নেয়। বর্তমান সরকার এসব প্রকল্প পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এতে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে।

জানা যায়, ২০১০ সালের ‘কুইক এনহ্যান্সমেন্ট অব ইলেকট্রিসিটি অ্যান্ড এনার্জি সাপ্লাই (স্পেশাল প্রভিশন) অ্যাক্ট’র আওতায় ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩১টি নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প এলওআই পায়। এরপর অল্প সময়ের মধ্যেই প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন কার্যক্রমে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এগিয়ে নেওয়া হয় জমি কেনা, পরিবেশগত অনুমোদন, সম্ভাব্যতা যাচাই ও আন্তর্জাতিক অর্থায়ন নিশ্চিতকরণের প্রক্রিয়া।

আরও পড়ুন

সৌর বিদ্যুৎ: সম্ভাবনার আলো এবং জ্বালানি স্বনির্ভরতার পথরেখা
৫ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চায় সরকার
১০ হাজার ৬১২ কোটি টাকা খরচে তিন জেলায় হচ্ছে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র
জ্বালানি সংকটে পথ দেখাচ্ছে চীন, তিব্বতে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিপ্লব

মন্ত্রণালয় ও বিনিয়োগকারী সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশ অর্থায়ন বিদেশি কোম্পানি ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আসার কথা ছিল। পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হলে এসব প্রকল্প থেকে মোট তিন হাজার ২৮৭ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২ হাজার ৯৪২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ, ৩২০ মেগাওয়াট বায়ুবিদ্যুৎ এবং ২৫ মেগাওয়াট বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প।

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে নেতিবাচক বার্তা

প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের দাবি, ১৫টির বেশি প্রকল্পের উদ্যোক্তা ইতোমধ্যে শতভাগ জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন করেছেন। এছাড়া স্থানীয় প্রশাসনের অনুমোদন, ভূমি উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত প্রস্তুতির কাজও এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশি ঋণ, কারিগরি সহায়তা ও ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে প্রকল্প উন্নয়ন কার্যক্রমে বেসরকারি উদ্যোক্তারা ইতোমধ্যে প্রায় ২০ কোটি ডলার ব্যয় করেছেন।

এছাড়া পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য প্রায় ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রক্রিয়াধীন। এই অর্থায়নে চীন, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের বিভিন্ন বিনিয়োগকারী এবং উন্নয়ন অংশীদার যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকার সেগুলো বাতিল করে কম দামে, ন্যায্যমূল্যে যৌক্তিকভাবে দরপত্র আহ্বান করে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বিনিয়োগকারী সিলেকশন করবে বলে প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার সেটা পূরণ করতে পারেনি। বর্তমান সরকার যদি সেটা করতে পারে সেটাই প্রত্যাশার প্রতিফল ঘটবে।-ড. এম শামসুল আলম

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এলওআই বাতিলের সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নেতিবাচক বার্তা যায়। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতা ও চুক্তির নিশ্চয়তা নিয়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সম্ভাব্য বিনিয়োগ প্রত্যাহারের চিন্তাও শুরু করেছিল বলে জানা যায়।

বর্তমান সরকার ৩১টি নবায়নযোগ্য জ্বালানি (সৌর ও বায়ু) বিদ্যুৎ প্রকল্প আবার পুনর্মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রকল্পগুলো আবার চালু করা যায় কি না, তা যাচাই করতে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির নেতৃত্বে আছেন বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) চেয়ারম্যান। এসব প্রকল্পের বৈধতা, বর্তমান পরিস্থিতি ও বাস্তব সম্ভাবনা পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। প্রয়োজনে যেসব প্রকল্প বাস্তবায়নযোগ্য, সেগুলো আবার চালু করা হতে পারে।

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আদালতের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও ৩৭টি এলওআই বাতিল করা হয়েছে, যেখানে প্রকল্পগুলো চালু রাখা বা পুনরায় আলোচনা করার কথা ছিল। এতে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। সরকার এসব প্রকল্পের সম্মতিপত্র পুনর্বহালের উদ্যোগ নিয়েছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রকল্পের অনেক আইনগত বিষয় আছে। এই আইনগত বিষয়গুলো নিয়েই আমাদের সামনে এগোতে হবে। এখন পর্যন্ত আমরা কাজ করছি। আপাতত কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারিনি। আগে একটি সিদ্ধান্তে আসি, তারপর বলা যাবে। কারণ, এটির সঙ্গে অনেক কিছুই রিলেটেড। ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

সিদ্ধান্ত যেটাই আসুক, দ্রুততার সঙ্গেই নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রকৌশল অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. এম শামসুল আলম জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রথমত ট্যারিফ হলো মূল কনসার্ন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ৩১টি প্রকল্প বাতিল করা হয়। তখন জনগণ সেটাকে ভালোভাবে নিয়েছিল। কারণ আগের সরকারের সময় বেশি বেশি মূল্যে লুণ্ঠনমূলক ব্যয় ধরে কিছু প্রতিষ্ঠানকে আর্থিকভাবে লাভবান করা হয়েছিল।’

‘অন্তর্বর্তী সরকার সেগুলো বাতিল করে কম দামে, ন্যায্যমূল্যে যৌক্তিকভাবে দরপত্র আহ্বান করে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বিনিয়োগকারী সিলেকশন করবে বলে প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার সেটা পূরণ করতে পারেনি। বর্তমান সরকার যদি করতে পারে সেটাই প্রত্যাশার প্রতিফল ঘটবে। যাতে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে ট্যারিফ নির্ধারণ হবে’ বলেন ড. এম শামসুল আলম।

এনএস/এএসএ/এমএফএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।