সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বিশ্বে এগিয়ে চীন, দ্রুত এগোচ্ছে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র
বিশ্বজুড়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে সৌরবিদ্যুৎ এখন সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল খাত। বিশেষ করে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান, জার্মানি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে এসব দেশ ব্যাপক হারে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও স্থাপিত সক্ষমতা বাড়িয়েছে।
বর্তমানে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ দেশ চীন। ২০২৫ সালে দেশটি প্রায় ১ হাজার ১৭৫ টেরাওয়াট-ঘণ্টা সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। একই সময়ে চীনের সৌরবিদ্যুতের স্থাপিত সক্ষমতা ১ টেরাওয়াট অতিক্রম করেছে। সরকারি ভর্তুকি, সাশ্রয়ী সৌর প্যানেল উৎপাদন এবং বড় বিনিয়োগের কারণে দেশটি এ খাতে আধিপত্য বজায় রেখেছে।
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি বড় বড় সৌরপার্ক নির্মাণ করছে। একই সঙ্গে ভারত দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে এবং বর্তমানে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ হিসেবে উঠে এসেছে।
আরও পড়ুন
সৌর শক্তিতে রেকর্ড গড়ছে চীন
বিশ্বজুড়ে ক্রমেই বাড়ছে সৌরশক্তির ব্যবহার, বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়?
ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা-যুদ্ধের কারণে সৌর বিদ্যুতে মনোযোগ বাড়াচ্ছে চীন
জ্বালানি সংকটে পথ দেখাচ্ছে চীন, তিব্বতে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিপ্লব
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্যমতে, ভারত জাপানকে ছাড়িয়ে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হয়েছে।
এছাড়া জাপান ও জার্মানি দীর্ঘদিন ধরেই সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তি ও ব্যবহার সম্প্রসারণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে জার্মানি ইউরোপে নবায়নযোগ্য জ্বালানির রূপান্তরে পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিত। দেশটি সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়িয়ে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে।
উদীয়মান দেশগুলোর মধ্যে ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া ও স্পেন দ্রুত সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কারণে বিশ্বব্যাপী সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণ আরও বাড়বে।
তিব্বতে চীনের ‘তালাতান সৈার পার্ক’/ ছবি: এক্স থেকে সংগৃহীত
বিশ্বব্যাপী সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের সম্প্রসারণ কেন প্রয়োজন?
বিশ্বব্যাপী সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের সম্প্রসারণ এখন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন হয়ে উঠেছে। কারণ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকল্প নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সৌরবিদ্যুৎ পরিবেশবান্ধব হওয়ায় এটি কার্বন নিঃসরণ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লা, তেল ও গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। এসব জ্বালানি ব্যবহারের ফলে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হচ্ছে, যা বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে এ নির্গমন উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
আরও পড়ুন
কৃষি সেচ শতভাগ সোলারের আওতায় আনা হচ্ছে: কৃষিমন্ত্রী
জুনের মধ্যে সোলার নীতি, কমবে কর: বিদ্যুৎমন্ত্রী
১০ হাজার মেগাওয়াটের লক্ষ্য অর্জনে সহজ বিনিয়োগ পরিবেশ চান বিশেষজ্ঞরা
‘এত লোডশেডিং শেষ কবে হয়েছে ভুলে গিয়েছি’
এছাড়া সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি আমদানির প্রয়োজন হয় না। ফলে অনেক দেশ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করতে পারে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে সক্ষম হয়। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। এ চাহিদা পূরণে সৌরবিদ্যুৎ তুলনামূলক কম খরচে এবং দ্রুত স্থাপনযোগ্য একটি সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বে সৌর প্যানেলের দাম কমে আসা এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কারণে এখন আগের তুলনায় অনেক কম খরচে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। একই সঙ্গে বড় বড় সৌরপার্ক, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং ব্যাটারি সংরক্ষণ প্রযুক্তির উন্নয়ন এ খাত আরও এগিয়ে নিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক কার্বন নিরপেক্ষতার লক্ষ্য অর্জন করতে হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার কয়েকগুণ বাড়াতে হবে। এর মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তাই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প সম্প্রসারণে বড় বিনিয়োগ করছে।
আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংস্থা (আইআরইএনএ) জানিয়েছে, ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সক্ষমতা রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে এবং এর বড় অংশ এসেছে সৌরবিদ্যুৎ থেকে। শুধু ২০২৫ সালেই বিশ্বে প্রায় ৫১১ গিগাওয়াট নতুন সৌর সক্ষমতা যুক্ত হয়েছে।

সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বিভিন্ন দেশের পদক্ষেপ
চীন: বিশ্বে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বর্তমানে এগিয়ে রয়েছে চীন। গত এক দশকে দেশটি পরিকল্পিত বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং সরকারি সহায়তার মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ খাতে বৈশ্বিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের মোট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশই আসছে চীন থেকে।
চীনের জ্বালানি বিভাগ ও গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চীন প্রায় ১ হাজার ১৭৫ টেরাওয়াট-ঘণ্টা সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে, যা বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সময়ে দেশটির স্থাপিত সৌর সক্ষমতা এক টেরাওয়াট অতিক্রম করেছে। অর্থাৎ একক দেশ হিসেবে চীন এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় সৌরবিদ্যুতের বাজার ও উৎপাদক।
সৌরবিদ্যুৎ খাতে অগ্রগতির জন্য চীন দীর্ঘমেয়াদি ও বহুমুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। দেশটির সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দিয়ে সৌর প্রকল্পে কর ছাড়, সহজ ঋণ এবং ভর্তুকি দিয়েছে। ফলে সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়ে বড় বিনিয়োগ এসেছে। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়েছে।
আরও পড়ুন
ব্যাটারি আমদানির বিধিনিষেধ ও কাস্টমস জটিলতা সমাধানের দাবি বিকেএমইএ’র
কলাপাড়ায় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি
‘তীর্থের কাকের মতো চেয়ে থাকি কখন বিদ্যুৎ আসে’
বিদ্যুৎ চাহিদা অনেক বেড়েছে, জ্বালানি সংকটও অসহনীয় পর্যায়ে
বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ সৌর প্যানেল, সোলার সেল ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশ চীনে উৎপাদিত হয়। বড় পরিসরে উৎপাদনের কারণে সৌর প্রযুক্তির খরচ কমেছে এবং বিশ্ববাজারে চীনের আধিপত্য তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারাই চীনের সবচেয়ে বড় সাফল্যের একটি।
এছাড়া চীন মরুভূমি ও অনাবাদি এলাকাজুড়ে বড় বড় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করেছে। বিশেষ করে গোবি মরুভূমি অঞ্চলে বিশ্বের বৃহত্তম সৌরপার্কগুলোর কয়েকটি গড়ে তোলা হয়েছে। এসব প্রকল্প থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে দেশটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ট্রান্সমিশন লাইন ও স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তিতেও বড় বিনিয়োগ করেছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা ও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, আগামী বছরগুলোতেও বৈশ্বিক সৌরবিদ্যুৎ বাজারে চীনের প্রভাব আরও বাড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র: বিশ্বে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ যুক্তরাষ্ট্র। গত এক দশকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বড় বিনিয়োগ, সরকারি নীতিগত সহায়তা এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে দেশটি সৌরবিদ্যুৎ খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।
ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব এনার্জির (ডিওই) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র কয়েকশ টেরাওয়াট-ঘণ্টা সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে এবং দেশটির মোট স্থাপিত সৌর সক্ষমতা ২৫০ গিগাওয়াটের বেশি অতিক্রম করেছে। বিশেষ করে টেক্সাস, ক্যালিফোর্নিয়া, ফ্লোরিডা ও অ্যারিজোনার মতো অঙ্গরাজ্যগুলোতে বড় বড় সৌরপার্ক দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে।
সৌরবিদ্যুৎ খাতে অগ্রগতির জন্য যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন নীতিগত পদক্ষেপ নিয়েছে। দেশটির সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে কর ছাড়, বিনিয়োগ সহায়তা এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রকল্পে প্রণোদনা দিচ্ছে। বিশেষ করে ইনফ্লেশন রিডাকশন অ্যাক্ট (আইআরএ) আইনের মাধ্যমে সৌর ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ৭৮৩ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা ঘোষণা করা হয়েছে।
আরও পড়ুন
জ্বালানি সংকটের মধ্যে সোলার পণ্যের বিক্রি চাঙা
গরম পড়তেই চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে আইপিএস
ব্যাটারিচালিত রিকশা গলার কাঁটা, দিনে গিলছে ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ
নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় ভূমিকা রাখবে
এছাড়া দেশটি ইউটিলিটি-স্কেল সোলার প্রকল্পের পাশাপাশি ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থাও সম্প্রসারণ করছে। আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্পখাতে রুফটপ সোলার ব্যবহারে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ব্যাটারি সংরক্ষণ প্রযুক্তির উন্নয়নেও বড় বিনিয়োগ বাড়ানো হয়েছে, যাতে রাতে বা মেঘলা আবহাওয়ায়ও সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ২০৩৫ সালের মধ্যে বিদ্যুৎখাত প্রায় সম্পূর্ণ কার্বনমুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এ লক্ষ্য অর্জনে সৌরবিদ্যুৎকে অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
দেশটির জ্বালানি বিভাগ (ডিওই) বলছে, আগামী বছরগুলোতে নতুন বিদ্যুৎ সক্ষমতার বড় অংশই সৌর ও ব্যাটারি স্টোরেজ থেকে আসবে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা ও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মতে, আগামী দশকে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও প্রযুক্তি উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে গ্রিড আধুনিকায়ন, শক্তি সংরক্ষণ এবং দেশীয় সৌর প্যানেল উৎপাদন বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে দেশটি।

ভারত: বিশ্বে দ্রুত বর্ধনশীল সৌরবিদ্যুৎ বাজারগুলোর মধ্যে অন্যতম দেশ হলো ভারত। গত এক দশকে দেশটি নীতিগত সহায়তা, বড় আকারের বিনিয়োগ এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।
ভারত সরকারের লক্ষ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ভারত ৫০০ গিগাওয়াট অ-জীবাশ্ম জ্বালানি সক্ষমতা অর্জনের পথে এগোচ্ছে।
বর্তমানে ভারতের স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা ২০২৫ সালের হিসাবে ১০০ গিগাওয়াটের বেশি। সামগ্রিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা ২৫০ গিগাওয়াটের কাছাকাছি পৌঁছেছে, যার বড় অংশই সৌরবিদ্যুৎ থেকে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি রেকর্ড পরিমাণ নতুন সৌর প্রকল্প যুক্ত করছে, যেখানে এক বছরে প্রায় ৩০-৩৫ গিগাওয়াট পর্যন্ত নতুন সৌর ক্ষমতা সংযোজন হয়েছে।
সৌরবিদ্যুৎ খাতে অগ্রগতির জন্য ভারত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ন্যাশনাল সৌর মিশন চালু করা, বড় বড় সৌর পার্ক স্থাপন এবং বড় সোলার প্রকল্পে ব্যাপক বিনিয়োগ। পাশাপাশি আন্তঃরাজ্য বিদ্যুৎ পরিবহন (আইএসটিএস) ফি ছাড়, দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) এবং নিলামভিত্তিক প্রকল্প উন্নয়ন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়িয়েছে।
এছাড়া দেশটি স্থানীয় সৌর প্যানেলের উৎপাদন বাড়াতে বড় উদ্যোগ নিয়েছে। বর্তমানে ভারত নিজস্ব সোলার মডিউল উৎপাদন সক্ষমতা দ্রুত বাড়াচ্ছে, যাতে আমদানিনির্ভরতা কমে এবং খরচ নিয়ন্ত্রণে থাকে। সরকার দেশীয় উৎপাদন উৎসাহিত করতে বিভিন্ন প্রণোদনা ও নীতিসহায়তা দিচ্ছে, ফলে সৌর শিল্পে বড় আকারের বেসরকারি বিনিয়োগও বাড়ছে।
ভারতের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আরও উচ্চাভিলাষী। দেশটি ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০০ গিগাওয়াট অ-জীবাশ্ম বিদ্যুৎ সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যেখানে সৌরবিদ্যুৎ হবে প্রধান ভিত্তি। এই লক্ষ্য পূরণে প্রতি বছর বড় পরিসরে সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্প যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি গ্রিড আধুনিকায়ন, শক্তি সংরক্ষণ (ব্যাটারি স্টোরেজ) এবং গ্রিন হাইড্রোজেন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো হচ্ছে।
আরও পড়ুন
৫ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চায় সরকার
জ্বালানি সংকটে জড়িতদের ‘জ্বালানি অপরাধী’ হিসেবে দ্রুত বিচার করতে হবে
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত না করেই বিদ্যুৎ খাতে সাফল্য দেখানো হয়েছে
ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিং, স্থবির জনজীবন
জাপান: বিশ্বে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে জাপান। বিশেষ করে ২০১১ সালের ফুকুশিমা পারমাণবিক দুর্ঘটনার পর দেশটি জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ব্যাপক বিনিয়োগ শুরু করে। বর্তমানে জাপান বিশ্বের শীর্ষ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারকারী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম।
বর্তমানে জাপানের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি, যা গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশটির স্থাপিত সৌর সক্ষমতা ১০০ গিগাওয়াটের বেশি অতিক্রম করেছে এবং প্রতি বছর নতুন করে প্রায় ৫-৬ গিগাওয়াট সৌর ক্ষমতা যুক্ত হচ্ছে।
সৌরবিদ্যুৎ খাতে অগ্রগতির জন্য জাপান একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ফিড-ইন ট্যারিফ (এফআইটি) এবং ফিড-ইন প্রিমিয়াম (এফআইপি) নীতি, যার মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের নির্দিষ্ট দামে বিদ্যুৎ বিক্রির নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সরকার বড় আকারের প্রকল্প এবং বাণিজ্যিক খাতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে উৎসাহ দিচ্ছে।
এছাড়া জাপান সরকার আবাসিক ভবনে সৌর প্যানেল স্থাপন বাধ্যতামূলক করার মতো কঠোর নীতিও গ্রহণ করেছে। টোকিওসহ কিছু অঞ্চলে নতুন বাড়িতে সৌর প্যানেল স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে বড় ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে গ্রিন ট্রান্সফরমেশন নীতির মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে কর সুবিধা ও বিনিয়োগ সহায়তা বাড়ানো হয়েছে।
জাপানের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় সৌরবিদ্যুৎকে আরও বড় ভূমিকা দেওয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ১৪–১৬ শতাংশে উন্নীত করা এবং ২০৪০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ৪০–৫০ শতাংশে নিয়ে যাওয়া।
এছাড়া জাপান পরবর্তী প্রজন্মের প্রযুক্তি হিসেবে পেরোভস্কাইট সোলার সেল (এটি সিলিকন সোলার সেলের বিকল্প) এবং মহাকাশভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তি নিয়েও গবেষণা চালাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এনএস/এমএমএআর/এমএফএ