পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতায় আর্থিক খাতে জবাবদিহিতা ফেরাতে হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭:৫১ পিএম, ১৯ জানুয়ারি ২০২১

পুঁজিবাজারের বর্তমান অবস্থা বজায় রেখে বাজারকে স্ট্যাবল ও ভাইব্র্যান্ট রাখতে ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ফিরিয়ে আনা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক ও সাবেক প্রেসিডেন্ট মো. রকিবুর রহমান। মঙ্গলবার (১৯ জানুয়ারি) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি এ অভিমত দিয়েছেন।

রকিবুর রহমান বলেন, বাজারকে এগিয়ে নিতে হলে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজারে মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন ২৪ শতাংশ হোল্ড করে এবং সবচেয়ে বড় বিষয় হলো এই সফল প্রতিষ্ঠানের ফ্রি ফ্লোট শেয়ার অনেক বেশি। বিনিয়োগকারীদের হাতে সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ পর্যন্ত শেয়ার আছে। বাজারের গতিশীলতা ধরে রাখতে হলে ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

তিনি বলেন, ব্যাংকে যারা স্পন্সর/ডিরেক্টর আছেন তাদের বুঝতে হবে। তারা ব্যাংকের মালিক নয় তারা শেয়ারহোল্ডার। পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ থেকে এই সকল স্পন্সর/ডিরেক্টরদেরকে বেরিয়ে আসতে হবে। ব্যাংক ডিপোজিটরদের টাকায় চলে, সেসব পরিচালকের টাকায় চলে না। দুর্ভাগ্য হলেও সত্য যে, ব্যাংকের উদ্যোক্তা, পরিচালকেরা ২০০৯/২০১০ সালে কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম বাড়িয়ে, ১০ টাকার শেয়ার মার্কেটে ১৭০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেছেন এবং হাজার হাজার বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। আজ সেইসব শেয়ারের দাম ফেসভ্যালু ১০ টাকার নিচে।

‘উদ্যোক্তা, পরিচালকরা বলেন উনারা ব্যাংক ভালোভাবে পরিচালনা করছেন, যদি তা হয় সেসব উদ্যোক্তা পরিচালকগণ, যারা ১০ টাকার শেয়ার ১৭০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেছেন। তারা এখন শেয়ার বাই-ব্যাক করছেন না কেন? কারণ তারা ভালো করে জানেন তারা ব্যাংকের টাকা লুটপাট করে ব্যাংকের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছেন’ বলেন ডিএসইর এই পরিচালক।

তিন বলেন, অর্থমন্ত্রী পার্লামেন্টে বলেছিলেন— এক ব্যাংকের পরিচালক অন্য ব্যাংকের পরিচালকদের এবং তাদের নিয়ন্ত্রিত ম্যানেজমেন্টের সাথে নামে/ বেনামে ভুল তথ্য দিয়ে অথবা ভুয়া জমি দেখিয়ে/ জাল দলিল পত্র দাখিল করে সরকারি খাস জমি বন্ধক রেখে/ডোবা/খাল জলাশয় দেখিয়ে এক লক্ষ ৬০ হাজার কোটি টাকা লোপাট করেছে। ব্যাসেল-৩ পরিপালন করার অযুহাতে বছরের পর বছর শুধুমাত্র বোনাস শেয়ার ইস্যু করে নিজেদের শেয়ার সংখ্যা বাড়িয়েছে। অপরদিকে বেশি দামে শেয়ার কিনে বিনিয়োগকারী প্রচন্ডভাবে লোকসানের কবলে পড়েছেন।

তিনি আরও বলেন, ব্যাংক/আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছাড়া যে সকল কোম্পানির মৌলভিত্তি ভাল এবং ফ্রি ফ্লোট শেয়ার বেশি, বাজারে তাদের শেয়ারের দামও বিগত বছরগুলোতে অনেক কমে গিয়েছিল। কিন্তু ভাল ফান্ডামেন্টাল শেয়ার ধরে রাখতে পারলে কোনো অবস্থাতেই বিনিয়োগকারীকে লাভ দিতে না পারলেও লোকসান গুনতে হয় না। ইতিহাসের দিকে তাকালে তা স্পষ্ট হয়।

‘ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে বিএসইসিকে কঠোর অবস্থানে থাকতে হবে। যেকোনো অবস্থায় ব্যাংকগুলোতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দক্ষ ও সৎ ম্যানেজমেন্ট গড়ে তুলতে হবে এবং ব্যাংক পরিচালকদের বুঝাতে হবে এটা তার পারিবারিক প্রতিষ্ঠান না। ব্যাংক ডিপোজিটরদের ডিপোজিটের টাকায় চলে। এর মালিক সকল শেয়ারহোল্ডার। এখনও অনেক ব্যাংকের তথাকথিত স্পন্সর/ডাইরেক্টররা বাংকগুলোকে তাদের পারিবারিক সম্পত্তি মনে করেন, তারা এটা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছেন না। অনেক সময় তারা নিয়ম-নীতিরও তোয়াক্কা করেন না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায়, স্বতন্ত্র পরিচালকদের মতামতেরও তেমন গুরুত্ব দেয়া হয়না’ বলেন রকিবুর রহমান।

তিনি বলেন, অনেক ব্যাংক তাদের বোর্ড মিটিং/কমিটি মিটিং এর প্রসিডিংস মিনিটস আকারে রাখেন না, রেকর্ড করে রাখেন। রেকর্ড যেকোনো সময় ধ্বংস করা সম্ভব। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে বিএসইসি কমিশন/বাংলাদেশ ব্যাংক একটি বিশেষ উদ্যোগ নিবেন। যাতে করে ব্যাংকগুলো তাদের প্রতিটি মিটিংয়েল প্রসিডিংস মিনিটস আকারে রাখেন এবং তা সংরক্ষণ করেন। ব্যাংকের বর্তমান কার্যপরিচালনার প্রণালী, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, স্বতন্ত্র পরিচালকদের ব্যাংকে কনট্রিবিউশন, সব কিছুর দলিল হল বিভিন্ন মিটিংয়ের মিনিটস। যা আর্থিক খাতের সুশাসন আনয়নে বিশেষ গুরুত্ব বহন করবে।

রকিবুর রহমান বলেন, সকল বিনিয়োগকারী এবং প্রতিষ্ঠানের দুই শতাংশ শেয়ার আছে তাদের পরিচালনা পর্ষদে সহজে যুক্ত করতে হবে। স্পন্সর, ডাইরেক্টরদের কোনো ওজর বা আপত্তি চলবে না। কারণ আমরা বাস্তবে দেখি স্পন্সর ডাইরেক্টররা তাদের পছন্দমত পরিচালক নিয়োগ দিতে চান, এটা বন্ধ করতে হবে। যাদের দুই শতাংশ শেয়ার আছে তাদের অটোমেটিক্যালি বোর্ডে যুক্ত হওয়ার পথ করে দিতে হবে। এতে যদি বোর্ডের আকার বাড়ে তাতে কোনো অসুবিধার কারণ নেই।

তিনি আরও বলেন, স্বতন্ত্র পরিচালক এবং শেয়ারহোল্ডার পরিচালকদের যৌথ পরিচালনায় ব্যাংকগুলো দুরাবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। ব্যাংকের লুটপাট বন্ধ হবে। ব্যাংকের অব্যবস্থাপনা দূর হবে। ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ার প্রতি বিনিয়োগকারীর আস্থা বাড়বে। তাতে করে বাজার আরও ভাল ও বড় হবে। ব্যাংকের লেনদেন আরও বাড়বে। বর্তমানে যে সকল স্পন্সর/ডাইরেক্টরদের বিরুদ্ধে সামান্যতম অভিয়োগ আছে, যারা বিভিন্নভাবে ঋণখেলাপী হয়ে আছেন অথবা যারা অবৈধভাবে ব্যাংকের লুটপাট খাতে সহযোগিতা করেছেন, তাদেরকে অবশ্যই ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ থেকে সরিয়ে দিতে হবে।

‘বাংলাদেশ ব্যাংককে কঠোর আইনের মধ্যে থাকতে হবে। সবাইকে বুঝতে হবে ব্যাংক ব্যাবস্থা যত ভালো থাকবে দেশের অর্থনীতি তত ভাল থাকবে। পুঁজিবাজার ও ভাল থাকবে। এখনই উপযুক্ত সময় সবকিছু ঠিকঠাক করার। ঋণখেলাপীকে কঠোর আইনের আওতায় এনে টাকা আদায়ের ব্যবস্থা করতে হবে। জনগণের টাকা লোন করে যাতে কেউ পার পেয়ে না যায় সেদিকে বিশেষ নজরদারি বাড়িয়ে অর্থমন্ত্রী বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসিকে কঠোর অবস্থানে থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন’ বলেন ডিএসইর এই পরিচালক।

তিনি বলেন, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপীদের লাইফস্টাইলে হাত দিতে হবে। দেওলিয়া আইনের সংশোধন করে আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে। কাউকে জেল দিয়ে কোনো লাভ হবে না। লাইফস্টাইলে হাত দিলে দেখবেন অনেক টাকা পরিশোধ করে দিচ্ছে। কেউ আর নিজেকে দেওলিয়া ঘোষণা করবে না। দেওলিয়া ঘোষণার কারণে তার বাড়ি-গাড়ি কিছুই থাকেবে না, ছেলেমেয়েদের দামি স্কুলে পড়াতে পারবে না। প্লেনে চড়তে পারবে না। বিদেশে যেতে পারবে না। বড় বড় সরকারি-বেসরকারি পার্টিতে জয়েন করতে পারবে না। এই সকল ব্যবস্থা নিয়ে বিভিন্ন দেশ, চায়না, থাইল্যান্ড, ইংল্যান্ড, ইন্ডিয়া ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপী থেকে ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত টাকা আদায় করতে সক্ষম হয়েছে।

রকিবুর রহমান বলেন, আমরা একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিতামূলক ও গতিশীল পুঁজিবাজার দেখতে চাই। যে পুঁজিবাজারের মাধ্যমে ভাল শিল্পোদ্যোক্তারা বাজার থেকে টাকা তুলবে এবং তা শিল্প প্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণ, আবাসন, নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কাজে ব্যবহার করবে এবং দেশের শিল্প উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানে অবদান রাখবে। ব্যাংক ব্যবস্থাপনার উপর বাড়তি কোনো চাপ থাকবে না, দীর্ঘমেয়াদী শিল্প প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের জন্য। বর্তমান বাজারের গতিপ্রকৃতি দেখে আমরা বলতে পারি পুঁজিবাজারের উপর বিনিয়োগকারীর আস্থা ফিরে এসেছে।

তিনি আরও বলেন, যাদের হাতে টাকা আছে তারা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ শুরু করেছে। তারই প্রতিফলন আমরা এক্সচেঞ্জের লেনদেনে দেখতে পাচ্ছি। আগামী তিন বছরের মধ্যে দৈনিক লেনদেন ৫ হাজার কোটি টাকায় লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। শুধু ইক্যুইটি মার্কেটের উপর নির্ভর না হয়ে বিভিন্ন নতুন নতুন প্রডাক্ট বাজারে নিয়ে আসার জন্য বিএসইসি এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সেন্ট্রাল কাউন্টার পার্টি (সিসিপি) চালু হচ্ছে, দ্রুততার সাথে বিনিয়োগকারীদের ডেইলি সেটেলমেন্টসহ নতুন নতুন প্রডাক্টস, সুকুক ডেরিভেটিভস/ফিউচার চালু করার প্রচেষ্টা জোরেশোরে শুরু হয়েছে। এসএমই প্লাটফর্ম ডিএসই তৈরি করে ফেলেছে।

ডিএসইর এই পরিচালক বলেন, সরকারি ভাল ভাল শেয়ার বাজারে এনে বাজারের গভীরতা বাড়ানোর প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে। দেশীয় ভাল ভাল প্রাইভেট কোম্পানির শেয়ার এবং মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির শেয়ার বাজারে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সফল, সৎ ও দক্ষ উদ্যোক্তাদের পুঁজিবাজার থেকে টাকা সংগ্রহ করে নিয়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আগ্রহ বাড়ছে।

‘বাজারে বিনিয়োগকারীদের পার্টিসিপিসান বাড়ছে। প্রতিদিন নতুন নতুন বিনিয়োগকারী বাজারে আসছে। কোনো অবস্থাতে বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট হতে দেয়া যাবে না। বিএসইসি কমিশনকে কঠোর অবস্থানে থাকতে হবে। বিএসইসি যত কঠোর অবস্থানে থাকবে ততবেশি বাজার ভালো থাকবে’ বলেন রকিবুর রহমান।

এমএএস/এএএইচ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]