কবি-লেখকদের দৃষ্টিতে এবারের বইমেলা

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
সালাহ উদ্দিন মাহমুদ সালাহ উদ্দিন মাহমুদ , লেখক ও সাংবাদিক
প্রকাশিত: ০৮:২৮ এএম, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০

বাঙালির প্রাণের উৎসব বইমেলার বিদায়ঘণ্টা বাজতে শুরু করেছে। লেখক-পাঠক-প্রকাশকের এ মিলনমেলার ইতি ঘটবে ২৯ ফেব্রুয়ারি। বলতে গেলে, সফলতার মধ্য দিয়েই শেষ হতে যাচ্ছে বিশাল এ আয়োজন। চমৎকার এ উৎসবকে কিভাবে দেখছেন কবি-লেখকরা। আসুন জেনে নেই তাদের কাছ থেকেই—

খ্যাতিমান শিশুসাহিত্যিক খালেক বিন জয়েন উদদীন বলেন, ‘এ বছর বইমেলা খুবই সুশৃঙ্খলভাবে হয়েছে। স্টল ও প্যাভিলিয়ন সাজানোও ভালো হয়েছে। কোনো ঝামেলা হয়নি। আর মুজিববর্ষকে সামনে রেখে এ বছরের বইমেলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বাংলা একাডেমিসহ অন্যান্য প্রকাশনী বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গবন্ধু বিষয়ক বই প্রকাশ করে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।’

নাট্যকার ও লেখক ইসাহাক খান বলেন, ‘এবারের মেলাটি একটু ভিন্ন রকম। মেলার পরিবেশ ও আয়োজন অন্যবারের চেয়ে ব্যতিক্রম। তাই বাংলা একাডেমি ধন্যবাদ পেতেই পারে। তবে পাঠকের আগ্রহ কম পরিলক্ষিত হয়েছে। তুলনামূলকভাবে কম বেচাকেনা হয়েছে। জনপ্রিয় লেখকদের বইয়ের কাটতির বাইরে সাধারণ লেখকদের বইয়ের কাটতির পরিমাণ খুব কম। দুঃখের বিষয়, মেলায় মৌসুমী প্রকাশকরা স্টল পেয়ে থাকেন; যারা সারাবছর বই করেন না। বইমেলার সময় কিছু লেখকের বই করে তারা মেলায় আসেন। আবার অনেকেই শুধু লেখক হওয়ার মানসিকতা নিয়েই বই বের করেন।’

fair

কবি ও প্রাবন্ধিক মোহাম্মদ নূরুল হক বলেন, ‘অন্য যেকোনো বারের চেয়ে এবারের মেলার পরিসর যেমন বেড়েছে, তেমনি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নও। মূলমঞ্চের পাশাপাশি ‘লেখক বলছি’ অনুষ্ঠানটি এবার আরও বড় পরিসরে হওয়ায় অধিকসংখ্যক লেখক-পাঠক একসঙ্গে একত্রিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। তারা নিজেদের মতবিনিময়ের সুযোগ পাচ্ছে। বিষয়টি ইতিবাচক। এবারের মেলার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ও ইতিবাচক দিক হলো লিটলম্যাগ কর্নারকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নিয়ে আসা। এতে পরিসর বড় হওয়ায় লিটলম্যাগকর্মী-লেখক-পাঠকরা স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরার সুযোগ পাচ্ছেন। আর একটি কথা, রাষ্ট্রে যেহেতু ধূমপান নিষিদ্ধ করা হয়নি, সেহেতু ধূমপায়ীদের জন্য ‘স্মোকিং জোন’ করা দরকার ছিল বলে মনে করি। তাহলে আর অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটার কোনো আশঙ্কা থাকতো না। এটুকু ছাড়া, এবারের বইমেলার সার্বিক পরিবেশ ভালোই বলতে হবে।’

গল্পকার, প্রাবন্ধিক ও ঔপন্যাসিক মোজাফ্ফর হোসেন বলেন, ‘আয়োজনের দিক থেকে অন্যবারের চেয়ে গোছানো। দৃষ্টিনন্দন। আর প্রকাশনার দিক থেকে মনে হয়েছে এবারের গ্রন্থমেলায় তরুণদের পাঠকপ্রিয়তা বেড়েছে। তরুণদের গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, গবেষণা—সব ক্ষেত্রেই এগিয়ে যাওয়ার বিষয়টি এবার চোখে পড়ার মতো। পাঠক এখন সাহিত্যে নতুন ধরনের কণ্ঠস্বর খুঁজছে।’

কবি, কথাশিল্পী ও অনুবাদক রাকিবুল রকি বলেন, ‘এবারের বইমেলার পরিসর আগের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। তাই এর নান্দনিক সৌন্দর্য চোখে পড়ার মতো। অন্যান্য বারের তুলনায় খাবারের স্টলও ছিল বেশি। কিছু দূর দূর চায়ের স্টল। ফলে ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে গেলে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগটা ভালো ছিল। এ জন্য বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ। এবার সাহিত্যের পাশাপাশি অন্যান্য বই, যেমন- মোটিভেশনাল, ধর্মীয় ইত্যাদি বইয়ের বিক্রি ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে তরুণ সাহিত্যিকদের বই বিক্রিও বেশ ভালো ছিল। সাহিত্যের বইয়ের তুলনায় অন্যান্য বইয়ের বিক্রিতে যারা হতাশা ব্যক্ত করেছেন, তাদের উদ্দেশে বলবো, ভালো বইয়ের কদর সব সময় ছিল। থাকবে। কিন্তু লিটলম্যাগ কর্নারে এবার ক্রেতার স্বল্পতা ছিল চোখে পড়ার মতো।’

fair

কথাশিল্পী ও উপস্থাপক ইকবাল খন্দকার বলেন, ‘এবারের বইমেলা নিঃসন্দেহে পরিকল্পিতভাবে সাজানো। তবে এ পরিকল্পনা সাধারণের জন্য কতটা হিতকর হয়েছে, সেটা একটি প্রশ্ন। আমি মনে করি, সাধারণ পাঠক বা দর্শনার্থী বিশেষ কোনো সুবিধা ভোগ করতে পারেননি। যেমন নম্বর ধরে স্টল খুঁজে পাওয়া—একদমই সম্ভব হয়নি। অর্থাৎ ১০ নম্বর স্টলের পর ১১ নম্বর স্টলটা কোথায়, সেটা খুঁজে পাওয়া দুঃসাধ্য ছিল। যদি তা-ই হয়, তাহলে নম্বরের কী দরকার? আবার টিএসসির পাশ দিয়ে যে গেট করা হয়েছে, সেটি অনেকের নজরেই পড়েনি বলে জানা গেছে। কারণ গেটটি সাধারণের নজরে ফেলার জন্য তেমন কোনো আয়োজন করা হয়নি। শুধু খোলা হয়েছে—এটুকুই। সব মিলিয়ে আমি বলবো, মেলাটি অবশ্যই পরিকল্পিত, তবে ততটা পাঠকবান্ধব নয়। আরও বলবো, মেলার পরিসর বাড়া মানেই ভালো মেলা নয়। প্রতিবছর যদি এভাবে পরিসর বাড়ানো হয়, তাহলে ক’ বছর পর মানুষ মেলায় যেতে ভয় পাবে হাঁটার ভয়ে। তাই পরিসর বাড়ানোর চেয়ে পরিকল্পনা বাড়ানোর প্রতি মনোযোগ দেওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। অবশ্যই ফলপ্রসূ পরিকল্পনা, পাঠকবান্ধব পরিকল্পনা।’

তরুণ লেখক কিঙ্কর আহসান বলেন, ‘বইমেলা গোছাতে গিয়ে আরও কিছুটা অগোছালো হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। কোন স্টল কোন দিকে সেটা বোঝা কঠিন ছিল। মেলায় খাবারের দোকানগুলো যেন জরুরি হয়ে উঠেছে। বেশি দামে সেখানে খাবার বিক্রি হচ্ছে। একটা বড় অংশের মানুষের জমায়েত দেখা গেছে খাবারের দোকানগুলোর চারপাশে। বইয়ের প্রয়োজনটা হওয়া উচিত সবচেয়ে বেশি। প্রকাশনার সংখ্যা বাড়িয়ে কিংবা খাবারের স্টল বাড়িয়ে পাঠকদের আনা যাবে না। ভালো বই, সঠিক প্রচারণা এবং পরিশ্রমী প্রকাশকদের সাথে মিলে সততার জায়গা থেকে মেলার জন্য কাজ করতে হবে। তবে আনন্দের খবর হচ্ছে, পাঠকরা প্রচুর বই কিনছে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের ভিড় বেড়েছে। পাঠকদের বইয়ের প্রতি আগ্রহ আছে বলে মনে হচ্ছে। আগামী বইমেলা গোছানো হোক। লাখো মানুষের ভিড় হোক শুধু বইকে ঘিরেই।’

fair

বই বিষয়ক ছোটকাগজ ‘এবং বই’র সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ বলেন, ‘এবারের মেলার পরিসর আগের চাইতে বেড়েছে। স্টল বিন্যাস সুন্দর ছিল। বিশেষত লিটল ম্যাগাজিন কর্নার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নিয়ে আসাটা একটি ভালো সিদ্ধান্ত বলে মনে করি। এরমধ্যে যে বিষয়টি বিরক্তিকর ছিল, তা হলো মেলায় ঢোকার সময় গায়ে হাত দিয়ে পুলিশের শরীর চেক করা। এক্ষেত্রে তারা ইলেক্ট্রনিক্স ডিভাইস ব্যবহার করতে পারতেন। পুলিশ জানতে চায়, সিগারেট বা দেয়াশলাই আছে কি-না? নিরাপত্তা বাহিনীর কাজ কি এসব দেখা? না-কি সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা? ভবিষ্যতে আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি এ বিষয়ে নজর দেবেন, এটা প্রত্যাশা করি।’

কবি ও সম্পাদক মীর হেলাল বলেন, ‘এবারের বইমেলা সার্থক মনে হয়েছে। জায়গার বিস্তৃতি ও নিরাপত্তায় সবাই খুশি। সুযোগ-সুবিধাও ছিল পর্যাপ্ত। প্রকাশনীর ছাড়িয়ে যাবার প্রতিযোগিতা চোখে পড়ার মতো। লিটলম্যাগ চত্বর মূলধারার সঙ্গে একিভূত হওয়ায় বাংলা একাডেমি প্রশংসা কুড়িয়েছে। এসব কারণেই এবারের মেলা বেশি টেনেছে। মানুষ বেশিবার গিয়েছে। এটাকে আমি জোয়ার বলবো।’

এসইউ/পিআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]